এবার নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে বাড়তি কৌতূহল তৈরি হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি ঘিরে। দাবি করেছেন তিনি আটটি যুদ্ধ থামিয়েছেন। এই কারণে নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁকেই দেওয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি এই সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কারে জন্য বিবেচিত না হন তাহলে তিনি তো বটেই, মুখ পুড়বে তাঁর হয়ে তদ্বির করা করা দেশ ও ব্যক্তিদের।

শেষ আপডেট: 8 October 2025 14:30
দ্য ওয়াল ব্যুরো: এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কার কে পাবেন? আগামী শুক্রবার বিকালের মধ্যে তা স্পষ্ট হয়ে যাবে। নরওয়ের নোবেল কমিটি শুক্রবার স্থানীয় সময় বেলা এগারোটায় বিজয়ী নাম ঘোষণা করবে।
এবার নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে বাড়তি কৌতূহল তৈরি হয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি ঘিরে। দাবি করেছেন তিনি আটটি যুদ্ধ থামিয়েছেন। এই কারণে নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁকেই দেওয়া উচিত। শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট যদি এই সম্মানজনক আন্তর্জাতিক পুরস্কারে জন্য বিবেচিত না হন তাহলে তিনি তো বটেই, মুখ পুড়বে তাঁর হয়ে তদ্বির করা করা দেশ ও ব্যক্তিদের। সেই তালিকায় এক নম্বরে আছে পাকিস্তান ও সে দেশের সেনাপ্রধান আসিম মুনির। পাকিস্তান সরকার নোবেল কমিটিকে চিঠি পাঠিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই পুরস্কার দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।
এ বছর ৩৩৮ জন ব্যক্তি ও সংস্থার নাম নোবেল শান্তি পুরস্কারে জন্য কমিটির কাছে বিবেচনাধীন। মনোনীতদের চূড়ান্ত তালিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম আছে কিনা সেটা জানা যাবে একমাত্র পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম বিবেচিত হলে। কারণ মনোনীতদের তালিকা ৫০ বছর পর্যন্ত গোপন রাখে নোবেল কমিটি। আন্তর্জাতিক মহলে এখন প্রশ্ন, মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনা কতটা? ওয়াকিবহাল মহল বলছে, সম্ভাবনা তেমন একটা নেই। কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন, বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার যে নজিরগুলিকে নোবেল কমিটি বিবেচনায় নেয় ট্রাম্প তার অনেকগুলির বিপরীতে হেঁটেছেন। তিনি আটটি যুদ্ধ থামানোর কৃতিত্ব দাবি করছেন। যদিও তার মধ্যে ভারত-পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সংঘাত নিয়ে নয়া দিল্লির বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারত এই ব্যাপারে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে এক শতাংশ কৃতিত্ব দিতে রাজি নয়।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিষয়ে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিদের বক্তব্য, এই পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্প নিজের পায়ে কুড়ুল মেরেছেন। নোবেল শান্তি পুরস্কারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য বিবেচ্য বিষয়গুলির মধ্যে আছে আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া। দ্বিতীয়বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বিশ্ব বোঝাপড়াকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করেছেন। তিনি এমনকী কানাডাকে আমেরিকার একটি প্রদেশ করে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতি বিশ্ব শান্তির পক্ষে প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করেছে। বহু দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মুখে। তৃতীয় দুনিয়ার দেশগুলিকে আমেরিকার সহায়তা প্রধান বন্ধ করে দিয়েছেন তিনি। এমনকী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকেও অনুমোদন দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে আমেরিকা। অনেকে মনে করছেন নিজের দেশেও ট্রাম্পের ভূমিকা শান্তির পরিপন্থী। তিনি গভর্নরদের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই মার্কিন প্রদেশগুলিতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করেছেন। এটা আমেরিকার ফেডারেল ব্যবস্থার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তাঁর সময়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতাও পদে পদে বিঘ্নিত হচ্ছে।
এই বিষয়গুলিকে বিবেচনায় রেখে ইঙ্গিত পূর্ণ মন্তব্য করেছেন নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদানকারী পাঁচ সদস্যের কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াতনে ফ্রিডনেস। তিনি বলেছেন আমরা পুরস্কারের জন্য কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে তাঁর সামগ্রিক ভূমিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করি। একটি বা দুটি ক্ষেত্রে ভূমিকা-বিচার্য হয় না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামগ্রিক ভূমিকা বিশ্ব শান্তির পক্ষে অনুকূল কিনা সেটা দেখা হয়। অনেকে মনে করছেন ট্রাম্পের আচার-আচরণ, কথাবার্তাও তাঁর এই পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। তিনি কথায় কথায় বিভিন্ন দেশ এবং রাষ্ট্র নেতাদের হুমকি দিচ্ছেন।
অসলো পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান নিনা গ্রেগারের বক্তব্য, ট্রাম্পের অনেক নীতিই আলফ্রেড নোবেলের উইলে লেখা উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। তা হল, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ভ্রাতৃত্ব ও নিরস্ত্রীকরণে উৎসাহিত করা।’
নোবেল কমিটি সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০২৪ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে সংঘাতময় বছর। বিশ্বের নানা প্রান্ত যুদ্ধে বিপর্যস্ত। শুধু প্যালেস্টাইন নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কোটি কোটি মানুষ অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে। যুদ্ধের কারণে এমন অনেক দেশের অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে যারা সংঘাতে লিপ্ত নয়।
অনেকে মনে করছেন, ২০০৮ এ যে বিশ্ব মন্দা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল পৃথিবী এখন সেই অবস্থার মধ্যে পড়ে গিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বার্থপরের মত আমেরিকা ফার্স্ট নীতি নিয়ে মার্কিন মিত্র দেশগুলির ওপরেও নানা ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করেছেন। অনেক আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতি এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা। জানা যাচ্ছে নোবেল কমিটির বিবেচনায় এবার বেশ কিছু সংগঠনের নাম আছে, যারা যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ ও পুনর্গঠনের কাজ করছে। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, সুজানের ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’। এই সংগঠনের সদস্যরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত মানষের পাশে দাঁড়িয়েছেন।
বিশ্বব্যাপী সংবাদমাধ্যমের অধিকার হরণের বিষয়টিও এবার নোবেল শান্তি কমিটির বিবেচনায় আছে বলে একাধিক সূত্র মনে করছে। সেই কারণে 'কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস' কিংবা 'রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স'-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেওয়া হতে পারে। এই দুই প্রতিষ্ঠানের কথা বিবেচনায় রাখতে গিয়ে নোবেল কমিটির আলোচনায় প্যালেস্টাইনে ইসরাইলের হামলায় শতাধিক সাংবাদিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয় বলে বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন।