
শেষ আপডেট: 22 November 2023 17:44
সেই ২০১৫ সালে নাসা বুক ঠুকে প্রমাণ করেছিল প্লুটোরও হৃদয় আছে। সে হৃদয় রঙিন। তাতে নানা রঙের খেলা। সে হৃদয় কখনও কোমল, আবার কখনও কঠিন। দিনে সেই হৃদয়ের উপর দিয়ে ফুরফুর করে হাওয়া বয়ে যায়। রাত নামলে আঁধার ঘনালে সে তখন কঠিন বরফ। এই হৃদয়ই ‘বামন গ্রহের’ প্রাণপাখি। হাওয়া বয়ে যায় তারই ইশারায়। ধুকপুকও নাকি করে সে। এই হৃদয় না থাকলে প্লুটোরও অস্তিত্ব থাকবে না। সৌরমণ্ডলের নবম গ্রহ প্লুটোর পাড়ায় উঁকি দিয়ে এমনটাই দেখল নাসার মহাকাশযান নিউ হরাইজনস। বামন গ্রহ প্লুটো এক রহস্য। সূর্য থেকে এত দূরে প্লুটো যে তার আকাশে উষ্ণতা মাইনাস ২০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সূর্যের আলো ওখানে পৌঁছয় না বললেই চলে। তবে জল আছে প্লুটোতে এটা নিশ্চিত করেছে নাসা। আর আছে বড় বড় নাইট্রোজেনের হিমবাহ, বরফ পাহাড়। রুক্ষ, এবড়োখেবড়ো পাহাড়-উপত্যকা আর বরফের খাঁজে খাঁজে ছড়িয়ে আছে ঢেউখেলানো বালিয়াড়ি। এইসব কিছু ছাপিয়েও যা চোখ টানে তা হল প্লুটোর হৃদয়। গোটা গ্রহের বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে এই হৃদয়। যাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘ফ্রোজেন হার্ট’ (Frozen Heart)। আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করে এই ফ্রোজেন হার্ট, আমেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের ‘জিওফিজিক্স রিসার্চ জার্নাল’-এ এই নতুন গবেষণার কথা সামনে এনেছেন নাসার বিজ্ঞানীরা।
সেই ২০১৫ সাল থেকে প্লুটোর উপর নজর রেখে বসে আছে নাসার নিউ হরাইজনস। এই মহাকাশযানের দৌলতেই বহু দূরে থাকা প্লুটোও এখন আমাদের প্রতিবেশী। নিউ হরাইজনস দেখিয়েছে দূর থেকে বামন গ্রহকে ধূসর-প্রাণহীন লাগলেও, সে কিন্তু মোটেও তেমনটা নয়। নানা রঙের খেলা এই গ্রহের আনাচেকানাচে। কোথাও গাঢ় লাল, কোথাও লাল-খয়েড়ির মিশেলে উজ্জ্বল রক্তাভ আভা। কোথাও আবার হালকা হলুদের ছিটে, ফ্যাকাসে নীল। এই সব রঙই মিলেমিশে এক হয়ে বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। এই রঙিন অঞ্চলকেই বিজ্ঞানীরা বলছেন প্লুটোর হৃদয়। রঙিন হলেও অবশ্য এই অংশে কোনও উষ্ণতা নেই। গোটাটাই কঠিন বরফ।
প্লুটোর রক্তিম হৃদয়
প্লুটোর হৃদয়ের নাম ‘টমবাও রিজিও’। ১৯৩০ সালে রাতের আকাশে প্লুটোর খোঁজ পেয়েছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লিব টমবাও। তিনি মারা গিয়েছেন ১৯৯৭ সালে। তাঁর চিতাভস্ম প্লুটোতে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল নাসার মহাকাশযান নিউ হরাইজনস। মহাকাশযানের পাঠানো তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, প্লুটোর হৃদয় বা টমবাও রিজিও তৈরি হয়েছে নাইট্রোজেন বরফ, কার্বন মনোক্সাইড বরফ আর মিথেন বরফ দিয়ে। ওই অংশে জল নেই। জল রয়েছে হৃদয়ের আশপাশে।
নাসার আমস রিসার্চ সেন্টারের মুখ্য গবেষক তানগাই বারট্র্যান্ড বলেছেন, নিউ হরাইজনসের পাঠানো ছবিতে প্লুটোর পিঠে ছোট-বড় নানা আকারের বরফ হয়ে থাকা জলাশয় দেখা গেছে। স্বাভাবিকভাবেই উঠে এসেছে প্লুটোয় প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনার প্রশ্নও। যদিও প্লুটোয় প্রাণ আছে কি না সে ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত নন বিজ্ঞানীরা। নিউ হরাইজনস দেখিয়েছে, প্লুটোর বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর থেকে প্রায় লক্ষ গুণ বেশি পাতলা। প্লুটোর বাতাস তৈরি হয়েছে নাইট্রোজেন, কার্বন মনোক্সাইড ও মিথেন দিয়ে। প্লুটোয় যখন দিন, এই বরফ-কঠিন নাইট্রোজেন হার্টের উপর বাষ্প জমা হয়। রাতে সেটা আবার কঠিন বরফ হয়ে যায়। তাপমাত্রার এই ফারাকের জন্যই আবহাওয়ার ধরনধারনও বদলে যায়।
প্লুটোর মিথেন বরফ
বিজ্ঞানীরা বলছেন, পশ্চিমী বায়ু তৈরি হয় প্লুটো-পৃষ্ঠের ২.৫ মাইল উপরে। এই হাওয়ার গতি পশ্চিম থেকে পূর্বে। পশ্চিমী ঝঞ্ঝা বয়ে চলে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক ধরে। প্লুটোতেই এই বিচিত্র আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি দেখা যায়।
আমাদের পৃথিবীতে যেমন বড় বড় হিমবাহ থেকে নদী তৈরি হয়, প্লুটোতে ঠিক তার উল্টো। বামন গ্রহের তাপমাত্রা অত্যন্ত কম হওয়ায় সেখানে সবসময়ই হিমশীতল শিরশিরানি ভাব। চলমান বা ভাসমান বড় বড় পাহাড় রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। সন্ধান মিলেছে হৈমশৈল বা গ্লেসিয়ারেরও। সুবিশাল সেইসব হিমশৈল থেকে বেরিয়ে আসছে নাইট্রোজেন বরফ। জায়গায় জায়গায় সেইসব বরফ জমে পাহাড় তৈরি করেছে। এমনকি প্লটোর হৃদয়ের উপরও দাঁড়িয়ে আছে সুবিশাল পর্বতশ্রেণি। যাদের উচ্চতা কম করেও ৩৫০০ মিটারের মতো। প্লুটোর হৃদয়ের বাম প্রকোষ্ঠের কাছে এই বরফ পাহাড়গুলো দাঁড়িয়ে আছে এক সমতলভূমির উপরে যার নাম ‘স্পুটনিক প্লেনাম’ বা ‘স্পুটনিক প্ল্যানিসিয়া।’
প্লুটোর পৃষ্ঠে হিমশৈল
বিজ্ঞানীরা বলছেন প্রতিনিয়ত ভূস্তরের পরিবর্তন হচ্ছে প্লুটোতে। সরে সরে যাচ্ছে পাহাড়, সমতলভূমি। নাইট্রোজেন বরফের ঘনত্বের চেয়ে জল জমে গিয়ে হওয়া বরফের ঘনত্ব অনেকটাই কম। নাইট্রোজেনের হিমবাহগুলো ওই জল জমাট বেঁধে তৈরি হওয়া পাহাড়গুলোকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে যাচ্ছে।