
শেষ আপডেট: 12 February 2024 19:35
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বে সাড়া ফেলে দিয়েছে কার-টি সেল থেরাপি। ক্যানসার নির্মূল করতে এই চিকিৎসা পদ্ধতি বহুদিন ট্রায়ালে ছিল। দেশের ড্রাগ নিয়ামক সংস্থা সম্প্রতি কার-টি সেল থেরাপি বা চিমেরিক অ্যান্টিজেন রিসেপ্টর টি-সেল থেরাপিকে মান্যতা দিয়েছে। আর এই থেরাপি প্রয়োগের পরেই একের পর এক ক্যানসার রোগী সুস্থ হচ্ছেন। দিল্লির একজন চিকিৎসক এই পদ্ধতিতে ক্যানসার সারিয়েছেন। নাসিকের বাসিন্দা বছর নয়েকের একটি মেয়ে কার-টি সেল থেরাপিতে ক্রনিক লিম্ফোসাইট লিউকেমিয়া মুক্ত হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে নানারকম ওষুধপত্র, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি যা করতে পারেনি, তাই করে দেখাচ্ছে কার-টি সেল থেরাপি। কী এই থেরাপি? কীভাবে কাজ করছে?
কার-টি সেল থেরাপির প্রথম ট্রায়াল শুরু হয় ২০১৭ সালে। তখন গবেষণাস্তরেই ছিল এই থেরাপি। ধীরে ধীরে ইঁদুরের উপর ক্লিনিকাল ট্রায়ালে সাফল্যের পরে মানুষের উপর প্রয়োগ করা শুরু হয়। মুম্বইয়ের টাটা মেমোরিয়াল ক্যানসার সেন্টারে অভিজ্ঞ অনকোলজিস্টদের টিম এই থেরাপির প্রয়োগ করছেন। পরপর দু’জন ক্যানসার রোগী মারণ রোগ মুক্ত হয়েছেন।
শরীরের টি-কোষকেই বদলেই তৈরি হয়েছে ক্যানসার বধের অস্ত্র
ক্যানসার যখন হানা দেয় তখন শরীরের রোগ প্রতিরোধী কোষগুলিকে (Immune Cells)আগে দুর্বল করে ফেলে। রক্ত ও অস্থিমজ্জায় তৈরি বি-কোষ বা বি-লিম্ফোসাইট কোষ যা অ্যান্টিবডি তৈরি করে শরীরকে বাইরের রোগজীবাণু থেকে রক্ষা করে, তাদেরই আগে ঘায়েল করে। ক্যানসার কোষ থেকে প্রোটিন তৈরি হয় তাকে বলে অ্যান্টিজেন। এই অ্যান্টিজেন বি-কোষগুলিকে ধ্বংস করতে শুরু করে। অর্থাৎ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
বি-লিম্ফোসাইট কোষ লড়াইয়ে হারতে শুরু করলে তখন ময়দানে নামে টি-কোষ বা টি-লিম্ফোসাইট কোষ (T Cell)। তৈরি হয় হেমাটোপোয়েটিক স্টেম কোষ থেকে। অস্থি মজ্জায় (Bone Marrow)তৈরি হয় এই কোষ। এরপরে সটান চলে আসে থাইমাসে। সেখানেই বড় হয়। এই টি-কোষের কাজ হল রক্ষীর মতো। শরীরের ভেতরের সুরক্ষার দায়িত্ব এই কোষের। মানুষের জন্মের পর থেকে মৃত্যু অবধি, এই টি-কোষ শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বা ইমিউন সিস্টেমকে সচল রাখার চেষ্টা করে। অভ্যন্তরীণ রোগ প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজও এই কোষেরই। টি-কোষের আবার নিজস্ব রিসেপটর থাকে(TCR) । এই রিসেপটরের কাজ হয় ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা সংক্রামক প্যাথোজেনকে চিহ্নিত করে তাদের ধ্বংস করা। ক্যানসার কোষ থেকে যে অ্যান্টিজেন বের হয় তাকে চিহ্নিত করাও টি-কোষেরই কাজ। বিজ্ঞানীরা তাই টি-কোষকেই ক্যানসার বধের অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, রোগীর রক্ত থেকে টি-কোষ সংগ্রহ করে তার শক্তি বিশেষ উপায় বাড়ানো হয় ল্যাবরেটরিতে। জিনগত বদল ঘটিয়ে যে টি-কোষ তৈরি হয় তা আরও ঘাতক। এই টি-কোষ তখন নিজস্ব রিসেপ্টর তৈরি করে যার নাম চিমেরিক অ্য়ান্টিজেন রিসেপ্টর (CAR)। ক্যানসার কোষ থেকে বেরনো অ্যান্টিজেন এই রিসেপ্টর খপাৎ করে ধরতে পারে। তারপর চারদিক থেকে আক্রমণ করে নষ্ট করে দিতে পারে। বিজ্ঞানীরা এমন ঘাতক টি-কোষ তৈরি করার পরে ল্যাবরেটরিতে রেখে এর সংখ্যা বহুগুণে বাড়িয়ে নেন। তারপর সেটা প্রয়োগ করা হয় ক্যানসার রোগীর শরীরে। শরীরে ঢুকে সংখ্যায় আরও বাড়তে থাকে টি-কোষ। অনেক বেশি অ্যান্টিজেন রিসেপ্টর তৈরি করে। ফলে ক্যানসার যতই ছড়িয়ে পড়ুক না কেন, চারদিকে তাকে ঘিরে ফেলতে পারে জিনগতভাবে পরিবর্তিত ঘাতক টি-কোষ। নষ্ট করতে থাকে ক্যানসার কোষগুলিকে। ধীরে ধীরে রোগীর শরীর থেকে ক্যানসার নির্মূল হতে শুরু করে।
কার-টি সেল থেরাপি পুরোপুরি জেনেটিক পদ্ধতি। ইমিউনোথেরাপির একটি বিশেষ প্রক্রিয়া এটি। এই থেরাপিতে ভেতর থেকে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে ক্যানসার নির্মূলের চেষ্টা হচ্ছে। তাতে সাফল্যও এসেছে। আগামী দিনে এই থেরাপি কতটা কার্যকরী হয় সেটাই দেখার।