সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ধারাবাহিকভাবে এটাই প্রমাণ করছে, বাড়তে থাকা মানসিক চাপ ও ঘুমের ব্যাঘাত শরীরে ইনসুলিনের কাজ করার ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। দীর্ঘ সময় ধরে এই অবস্থা চললে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 18 February 2026 12:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বছরের পর বছর ধরে আমরা শুনে এসেছি ডায়াবেটিস ধরে পড়েছে মানেই সেখানে সব দোষ জাঙ্ক ফুড আর জিনগত কারণের। কথাটা সেই অর্থে ভুল নয়, কিন্তু সম্পূর্ণ সত্যিও নয়। সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ধারাবাহিকভাবে এটাই প্রমাণ করছে, বাড়তে থাকা মানসিক চাপ (chronic stress) ও ঘুমের ব্যাঘাত (sleep deprivation) শরীরে ইনসুলিনের কাজ (insulin resistance) করার ক্ষমতাকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ফলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি হচ্ছে (Stress and sleep impact on blood sugar)।
বেঙ্গালুরু অ্যাস্টার হোয়াইটফিল্ডের এন্ডোক্রাইনোলজি এবং ডায়াবেটোলজির লিড কনসালট্যান্ট নরেন্দ্র বিএস বলছেন, যেগুলোকে আমরা অনেক সময় ‘ছোটখাট অসুবিধা’ বলে উড়িয়ে দিই, স্ট্রেস আর ঘুমের অভাব, সেগুলো শুধু মেজাজেই প্রভাব ফেলে না, টাইপ ২ ডায়াবেটিসেরও ঝুঁকি (type 2 diabetes risk) বাড়ায়। আর যাঁদের ইতিমধ্যেই ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ (blood sugar control) আরও কঠিন করে তোলে।
কীভাবে ঘটে এই প্রভাব?
শরীর যখন কোনও বিপদের ইঙ্গিত পায় বা স্ট্রেস অনুভব করে, তখন তার প্রধান স্ট্রেস সিস্টেম হাইপোথ্যালামিক-পিটুইটারি-অ্যাড্রিনাল (HPA) অ্যাক্সিস এবং সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই সময় কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো হরমোন ক্ষরিত হয়। এই হরমোনগুলো দ্রুত শক্তি জোগাতে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। হঠাৎ বিপদের পরিস্থিতিতে এটা শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় যখন লাগাতার অফিসের কাজের চাপ, দীর্ঘদিন কারও দেখভালের সঙ্গে যুক্ত থাকার মতো মানসিক চাপ, বা অ্যাংজাইটির মতো পরিস্থিতিতে স্ট্রেস আর ক্ষণিকের জন্য নয় বরং দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয়।
ক্রনিক স্ট্রেসে শরীরের কোষগুলোর ইনসুলিনের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে যায়। ফলে ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করতে পারে না, পাল্লা দিয়ে গ্লুকোজও জমতে থাকে রক্তে। দীর্ঘ সময় ধরে এই অবস্থা চললে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বাড়ে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায় - এমনটাই বলছে বহু গবেষণা পর্যালোচনা।
ক্রমাগত ঘুমের ব্যাঘাত - নীরব কিন্তু বড় শত্রু
স্ট্রেসের পাশাপাশি আরেকটি বড় সমস্যা হল ঘুমের অভাব। কম ঘুম, বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়া বা অনিয়মিত ঘুম - সবই শরীরের গ্লুকোজ সহনশীলতা ও ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমিয়ে দেয়। কখনও কখনও মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এর প্রভাব দেখা যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, আংশিক ঘুম কম হলেও ফাস্টিং গ্লুকোজ ও ইনসুলিনের মাত্রা বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে HbA1c বাড়ে এবং টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
সহজ কথায়, ঘুম ভাল না হলে খাবার থেকে আসা শর্করাকে সামলাতে দক্ষতার অভাব তৈরি হয় শরীরে।
এখানে একটা ক্রমাগত সাইকেল চলে -
এই দুই মিলিয়েই জীবনযাত্রায় অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসের প্রবণতা বাড়ে। তাছাড়া রাত জেগে খাওয়াদাওয়া, শরীরচর্চা এড়িয়ে চলা, অতিরিক্ত ক্যাফেইন বা অ্যালকোহলের উপর নির্ভরতা - এসবই আবার ব্লাড সুগারকে অস্থির করে।
ভারতের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন শহুরে জীবনযাত্রা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও অপর্যাপ্ত ঘুম এখন ডায়াবেটিস বৃদ্ধির বড় কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম।
সমাধানের পথে কী বলছে গবেষণা?
দুটি গুরুত্বপূর্ণ আশার কথা রয়েছে -
১. পরিবর্তন সম্ভব
ঘুমের সঠিক হাইজিন বজায় রাখা ও স্ট্রেস কমালে ইনসুলিন সংবেদনশীলতা ও গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা উন্নত হয়। ঘুমের একটা সঠিক সাইকেলের উপর করা গবেষণায় গ্লুকোজ মেটাবলিজমে ইতিবাচক ফল মিলেছে। স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামে ফাস্টিং গ্লুকোজ ও HbA1c কমেছে।
২. চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্পষ্ট ধারণা রয়েছে
ডায়াবেটিস চিকিৎসায় এখন ঘুমের মান যাচাই ও ডিপ্রেশন-অ্যাংজাইটির মূল্যায়নও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
করণীয় কী?
চিকিৎসকদের ভূমিকা
ডায়াবেটিস চিকিৎসায় ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ে আলোচনা জরুরি। অনিদ্রা, মুড ডিজঅর্ডার বা দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস থাকলে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো উচিত। লাইফস্টাইল পরিবর্তন, মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা ও ওষুধ - এই তিনের কম্বিনেশন সবচেয়ে কার্যকর ফল দেয়।
ঘুমের উন্নতি, স্ট্রেস কমানো ও শারীরিক সক্রিয়তা - এই ছোট পরিবর্তনগুলোই গ্লাইসেমিক নিয়ন্ত্রণে বড় পার্থক্য আনতে পারে।
ব্লাড সুগার শুধু ল্যাব রিপোর্টের একটি সংখ্যা নয়। এটি জীবনযাত্রা, শরীরের জৈবিক প্রক্রিয়া এবং মানসিক অবস্থার প্রতিফলন। ডায়েট ও ওষুধ গুরুত্বপূর্ণ, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু ঘুম ও স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে এমন একটি বড় কারণকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, যেটি দীর্ঘদিন অবহেলিত থেকেছে, তবু বদলানো সম্ভব।