স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত নতুন ইউনিভার্সাল ন্যাজাল স্প্রে ভ্যাকসিন একইসাথে করোনা, ইনফ্লুয়েঞ্জা, নিউমোনিয়া ও অ্যালার্জি থেকে সুরক্ষা দেবে। ইঁদুরের ওপর সফল পরীক্ষার পর এবার মানবদেহে ট্রায়ালের প্রস্তুতি। বিস্তারিত পড়ুন।

নাকের স্প্রে-তেই একধিক রোগের মুক্তি
শেষ আপডেট: 24 February 2026 18:06
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বয়স্কদের বছরে একটা নির্দিষ্ট সময়ে ফ্লু, নিউমোনিয়া কিংবা করোনার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য টিকা বা প্রতিরোধক নিতে হয়। না হলে দূষণ ও আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে এই ধরনের ভাইরাল বা ব্যাকটেরিয়াল অসুখের বিরুদ্ধে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বয়স্কদের জন্য টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এসব টিকা একবার নিলেই হয় না—প্রতিবছর লাগে বুস্টার ডোজ। নাহলে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা কমে যায়।
বারবার ইঞ্জেকশন নিতে কারই বা ভাল লাগে! কেউ আবার ভুলেই যান কত মাস বা বছর পরে বুস্টার নিতে হবে। নানা কারণে টিকা নিলেও অনেক সময় প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিকমতো তৈরি হয় না। এই ঝক্কির কথা মাথায় রেখেই চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। স্ট্যানফোর্ড মেডিসিনের গবেষকরা এমন এক ‘ইউনিভার্সাল’ বা সর্বজনীন ন্যাজাল স্প্রে ভ্যাকসিন তৈরি করেছেন, যা একাই লড়বে করোনা, ইনফ্লুয়েঞ্জা এমনকি নিউমোনিয়ার মতো ঘাতক ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধেও।
কী এই ‘ম্যাজিক’ ভ্যাকসিন?
গত ২৩ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান পত্রিকা ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে অধ্যাপক বালি পুলেন্দ্রন ও তাঁর দল এই নতুন ভ্যাকসিনের কথা জানিয়েছেন। বর্তমানের টিকাগুলো নির্দিষ্ট ভাইরাসের (যেমন করোনার সময়ে ওমিক্রন, ডেল্টা বা অন্যান্য ভ্যারিয়েন্ট) বিরুদ্ধে কাজ করে। কিন্তু ভাইরাস যদি নিজের রূপ বদলে ফেলে (মিউটেশন), তবে সেই টিকা আগের মতো কার্যকর নাও থাকতে পারে।
স্ট্যানফোর্ডের এই নতুন ভ্যাকসিন কিন্তু ভাইরাসের রূপ পরিবর্তন নিয়ে একেবারেই চিন্তিত নয়। এটি শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ‘ইনেট ইমিউনিটি’ (Innate Immunity)-কে ফুসফুসের ভেতরে মাসের পর মাস ‘হাই অ্যালার্ট’-এ রেখে দেয়। ফলে যে ভাইরাসই ঢুকুক না কেন, ফুসফুসের অতন্দ্র প্রহরী কোষগুলো তাকে চিনে নিয়ে দ্রুত ধ্বংস করে দিতে পারে।
গবেষণায় মিলেছে সাফল্য
ইঁদুরের ওপর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই ন্যাজাল স্প্রে নেওয়ার পর তাদের ফুসফুসে ভাইরাসের মাত্রা প্রায় ৭০০ গুণ কমে গিয়েছে। শুধু ভাইরাস নয়, এটি যক্ষ্মা বা নিউমোনিয়ার মতো বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়া এবং এমনকি ধুলোবালি থেকে হওয়া অ্যালার্জির হাত থেকেও সুরক্ষা দিয়েছে।
বিজ্ঞানীদের দাবি, মানুষের ক্ষেত্রেও যদি একই ফল মেলে, তবে বছরে একবার বা দু’বার নাকে স্প্রে নিলেই কেল্লাফতে!
এদেশের মানুষের কাছেও হতে পারে গেমচেঞ্জার
১. জলবায়ু ও জনঘনত্ব: পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের মতো জনবহুল এলাকায় বায়ুবাহিত রোগ দ্রুত ছড়ায়। বিশেষ করে কলকাতা বা তার পার্শ্ববর্তী ঘিঞ্জি শহরগুলোতে ইনফ্লুয়েঞ্জা বা অ্যালার্জি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। করোনার সময়ও এইসব জনবহুল এলাকাতেই সংক্রমণ বেশি হয়েছিল। এই ইউনিভার্সাল ভ্যাকসিন প্রতিটি মানুষের নাকে একটি সুরক্ষাকবচ তৈরি করতে পারে, যা ভাইরাসকে শরীরে ঢুকতেই বাধা দেবে।
২. প্রবীণদের সুরক্ষা: এ রাজ্যে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। বার্ধক্যের কারণে অনেকের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে সাধারণ সর্দি-কাশি থেকেও মারাত্মক নিউমোনিয়ার ঝুঁকি থাকে। এই ভ্যাকসিন প্রবীণদের ফুসফুসকে প্রাকৃতিকভাবে শক্তিশালী করে তুলতে পারে।
৩. অ্যালার্জি ও দূষণ: কলকাতা বা দিল্লির মতো শহরের বাতাসে ধূলিকণা ও দূষণ বেশি। ফলে ঘরে ঘরে অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের রোগী। স্ট্যানফোর্ডের এই ভ্যাকসিন অ্যালার্জেন বা ধুলোবালির বিরুদ্ধেও সুরক্ষা দিতে পারে, যা আমাদের দেশের মানুষের কাছে আশীর্বাদ হতে পারে।
৪. লজিস্টিক সুবিধা: ইঞ্জেকশনের তুলনায় ন্যাজাল স্প্রে সংরক্ষণ ও সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া অনেক সহজ। এতে সিরিঞ্জ বা পেশাদার নার্সের ওপর নির্ভরতা কমবে, ফলে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের কাছেও স্বাস্থ্যপরিষেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
গবেষকদের মতে, এই টিকা সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য বাজারে আসতে হয়তো আরও কয়েক বছর সময় লাগবে। স্ট্যানফোর্ডের পুলেন্দ্রনস ল্যাবের গবেষক হাইবো ঝ্যাং-এর কথায়,
“কল্পনা করুন, শীতের শুরুতে আপনি নাকে একটি স্প্রে নিলেন—আর সারা বছরের জন্য ঠান্ডা লাগা, ফ্লু, কোভিড বা নিউমোনিয়ার চিন্তা থেকে মুক্ত থাকলেন। এমন হলে ক্ষতি কী!”
চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই উদ্ভাবন সফল হলে বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে এক নতুন বিপ্লব আসতে পারে—এমনটাই আশাবাদী বিশেষজ্ঞ মহল।