জল ছাড়া দুই থেকে তিন দিনের বেশি টিকে থাকা অসম্ভব। শরন্যার ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল আরও চ্যালেঞ্জিং। কারণ তাঁর কাছে থাকা জলের পরিমাণ ছিল যৎসামান্য।

শেষ আপডেট: 10 April 2026 17:22
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কেরল থেকে কর্নাটক—ঘন জঙ্গলের অন্তরালে গত কয়েক দিন ধরে যে খবরটি শিরোনামে ছিল, তা হল আইটি কর্মী শরন্যার নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। কোডাগুর বা কুর্গ (Coorg)-এর মাদিকেরি অরণ্যে ট্রেকিংয়ে গিয়ে পথ হারিয়েছিলেন এই তরুণী। খাবার নেই, সম্বল বলতে ছিল মাত্র ৫০০ মিলিলিটার বা হাফ লিটার জল। সেই সম্বলটুকুকে আঁকড়েই দীর্ঘ ৭২ ঘণ্টারও বেশি সময় আদিম অরণ্যে যমে-মানুষে লড়াই করে ফিরে এসেছেন শরন্যা। তাঁর এই ‘মিরাকল’ প্রত্যাবর্তন চিকিৎসা বিজ্ঞানের সামনে একটি পুরনো প্রশ্নকে নতুন করে উসকে দিয়েছে—শুধু জল খেয়ে কি সত্যিই বেঁচে থাকা সম্ভব? আর শরীরই বা কীভাবে প্রতিকূলতায় সাড়া দেয়?
কঠিন সময়ে জল সম্বল
শরন্যার এই লড়াই বলছে, খাদ্যের চেয়েও জল মানুষের জীবনধারণের জন্য অনেক বেশি জরুরি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, খাবার ছাড়া একজন সুস্থ মানুষ কয়েক সপ্তাহ দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু জল ছাড়া দুই থেকে তিন দিনের বেশি টিকে থাকা অসম্ভব। শরন্যার ক্ষেত্রে বিষয়টি ছিল আরও চ্যালেঞ্জিং। কারণ তাঁর কাছে থাকা জলের পরিমাণ ছিল যৎসামান্য। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জঙ্গলের ঠান্ডা আবহাওয়া এবং পথ হারানোর পর শরন্যা সম্ভবত খুব বেশি শারীরিক পরিশ্রম করেননি, ফলে অনেকটাই শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন, যা তাঁর শরীরে জলের চাহিদা কমিয়ে দিয়েছিল। চিকিৎসকদের ভাষায়, এই পরিস্থিতি একজনকে জীবন ও মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দেয়।
PubMed-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, খাবার ও জল—দুটোই না পেলে মানুষ সাধারণত ৮ থেকে ২১ দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। তবে যদি শুধু খাবারের অভাব হয় এবং জল পাওয়া যায়, তাহলে একজন মানুষ প্রায় দু’মাস পর্যন্তও বেঁচে থাকতে পারেন। যদিও এই সময়কাল নির্ভর করে ব্যক্তির বয়স, শারীরিক অবস্থা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর। এছাড়া শরন্যার ক্ষেত্রে জলের পরিমানও ছিল কম, তাই শারীরিক সমস্যার সম্ভাবনা ছিল অনেক বেশি।
খাবার না খেয়ে থাকলে শরীরের ভেতর কী ঘটে?
মানুষের শরীর আদতে একটি নিপুণ যন্ত্র। খাবার না পেলে সে নিজের সঞ্চিত ভাণ্ডারে হাত দেয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, উপোসের প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে শরীরের গ্লুকোজ শেষ হয়ে যায়। তখন লিভার এবং পেশিতে জমে থাকা গ্লাইকোজেন ভেঙে গ্লুকোজ তৈরি হতে থাকে। এরপরের ধাপে শরীর যখন দেখে আর চিনি পাওয়া যাচ্ছে না, তখন সে সঞ্চিত চর্বি বা ফ্যাট পোড়াতে শুরু করে। এই বিশেষ প্রক্রিয়াকে বলা হয় ‘কিটোসিস’। চর্বি পুড়িয়ে তৈরি হওয়া কিটোন তখন মস্তিষ্কের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। এই বিশেষ ক্ষমতার গুণেই মানুষ না খেয়েও বেশ কিছু দিন লড়াই চালিয়ে যেতে পারে।
জলের গুরুত্ব ও বিপদ
শরন্যা মাত্র ৫০০ মিলি জল দিয়ে চার দিন পার করেছেন। হায়দ্রাবাদের প্রখ্যাত নিউরোলজিস্ট সুধীর কুমারের মতে, সীমিত জল নিয়ে ৭২ ঘণ্টা বেঁচে থাকা চিকিৎসাবিজ্ঞানে সম্ভব, তবে তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। জল না থাকলে শরীর দ্রুত শুকিয়ে যেতে শুরু করে (Dehydration), যা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল করে দিতে পারে। তবে জঙ্গলের প্রাকৃতিক জলের উৎস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিপদ কম নয়। না ফুটিয়ে বা না ছেঁকে ওই জল খেলে ব্যাক্টেরিয়া বা ভাইরাসের সংক্রমণে হিতে বিপরীত হতে পারে।
মনের জোরই আসল
শুধু কিটোন আর গ্লুকোজের হিসাব দিয়ে এই অবিশ্বাস্য লড়াইকে ব্যাখ্যা করা যায় না। শরন্যার বেঁচে ফেরার পিছনে ছিল তাঁর অদম্য জেদ এবং মানসিক স্থিতিশীলতা। খাবার না থাকলে শরীর ভেঙে পড়ার আগে মন ভেঙে পড়ে। কিন্তু শরন্যা সেই মানসিক প্রতিকূলতাকেও জয় করেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাইকিং বা ট্রেকিংয়ের মতো রোমাঞ্চকর অভিযানে ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবারের চেয়েও শরীরকে হাইড্রেটেড রাখা বেশি জরুরি। শরন্যার এই অরণ্য-অভিযান আমাদের শিখিয়ে দিল, জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে জলের ভূমিকা কতটা?