মায়ের রক্তে শর্করা বেশি থাকলে শিশুর মস্তিষ্কে নানা স্নায়বিক ত্রুটির (Neurological Defects) ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ ও সতর্কতা জানুন।

প্রেগন্যান্সিতে ডায়াবেটিস হলে সাবধান হন
শেষ আপডেট: 24 February 2026 12:29
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গর্ভাবস্থায় (Pregnancy) রক্তে শর্করার মাত্রা বা ডায়াবেটিস (Diabetes) শুধু মায়ের শরীরের জন্যই বিপজ্জনক নয়, এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে গর্ভস্থ সন্তানের উপরেও। চিকিৎসকদের মতে, মা যদি ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন, তবে ভবিষ্যতে সন্তানের এপিলেপসি বা খিঁচুনির ঝুঁকি প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। তবে আশার কথা হলো, সঠিক নিয়ন্ত্রণে থাকলে এই ঝুঁকি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।
কী বলছে সাম্প্রতিক গবেষণা?
২০২৬ সালের একটি বড় সমীক্ষায় প্রায় ২৩ লক্ষ সদ্যোজাতর (New Born baby) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে, মায়ের শরীরের অতিরিক্ত শর্করা (Hyperglycemia) সরাসরি শিশুর মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। তবে জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস বা গর্ভাবস্থায় ধরা পড়া সুগারের ক্ষেত্রেও ঝুঁকি থেকে যায়।
মস্তিষ্ক ও গ্লুকোজের যোগসূত্র
এই বিষয়ে কলকাতার এনআরএস (NRS) হাসপাতালের গাইনোকোলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক ডা. রুণা বল জানান, গর্ভাবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে ভ্রূণের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতায় প্রভাব পড়তে পারে। এটি হওয়ার কারণ হলো, মায়ের শরীরে দীর্ঘদিন উচ্চ শর্করা থাকলে তা প্লাসেন্টা পেরিয়ে ভ্রূণের শরীরে প্রবেশ করে। বিশেষ করে গর্ভধারণের আগে থেকেই যদি মায়ের ডায়াবেটিস থাকে, তবে ভ্রূণের শরীরে ইনসুলিনের মাত্রা বেড়ে যায়, যা মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে—বিশেষত যখন শর্করার মাত্রার ওঠানামা বেশি হয়।
তাঁর কথায়, “উচ্চ রক্তশর্করা মস্তিষ্কের গঠনে সূক্ষ্ম পরিবর্তন আনতে পারে, যা ভবিষ্যতে খিঁচুনির প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়”। এছাড়া ডায়াবেটিসজনিত প্রদাহ (Inflammation) ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেসও ভ্রূণের মস্তিষ্কের বিকাশে বিঘ্ন ঘটায়।
কোন কোন সমস্যার আশঙ্কা বাড়ে?
'নারায়ণা হেলথ সিটি'-র সিনিয়র কনসালট্যান্ট ও পেডিয়াট্রিক নিউরোলজিস্ট ডা. মিনাল কেকাতপুরে জানান, টাইপ-১ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়েদের সন্তানদের ক্ষেত্রে স্নায়ুজনিত সমস্যার আপেক্ষিক ঝুঁকি ৩০–৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, “উচ্চ রক্তশর্করা প্লাসেন্টায় প্রো-ইনফ্ল্যামেটরি পরিবেশ তৈরি করে। এই প্রদাহ শিশুর মস্তিষ্কে অতিরিক্ত উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, যা এপিলেপসির মূল কারণ। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যাঁদের সন্তানধারণের আগে থেকেই ডায়াবেটিস থাকে, তাঁদের ভ্রূণের ক্ষেত্রে এই সম্ভাবনা প্রবল”।
গাইনোকোলজিস্ট ডা. রুণা বল আরও ব্যাখ্যা করে জানান যে, সাধারণত গর্ভাবস্থার প্রথম ৮ সপ্তাহের মধ্যেই শিশুর মস্তিষ্কের মূল বিকাশ সম্পন্ন হয়। এই সময়টায় যদি মায়ের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস থাকে, তবে নবাগত শিশুর মস্তিষ্কে কুপ্রভাব পড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
এর ফলে যে সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে:
সাধারণত গর্ভাবস্থার ২০-২৫ সপ্তাহের দিকে জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস ধরা পড়ে, যখন ভ্রূণের মস্তিষ্কের অনেকটা বিকাশ হয়ে যায়। তাই এই ক্ষেত্রে ঝুঁকি কিছুটা কম থাকলেও পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হওয়ার উপায় নেই।
জন্মের পরেও বিপদ কম নয়
চিকিৎসকদের মতে, ডায়াবেটিক মায়েদের সন্তানদের জন্মের ঠিক পরেই রক্তে শর্করা হঠাৎ কমে যাওয়ার প্রবণতা থাকে, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে 'হাইপোগ্লাইসেমিয়া' বলা হয়। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ এর থেকেও শিশুর খিঁচুনি শুরু হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে।
সুরক্ষার উপায়: ভয় নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
সন্তান ও মা—উভয়কেই সুস্থ রাখতে বিশেষজ্ঞরা তিনটি বিষয়ের ওপর জোর দিচ্ছেন:
১. পরিকল্পনা: গর্ভধারণের আগেই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।
২. স্ক্রিনিং: গর্ভাবস্থার ১৮-২০ সপ্তাহে রুটিন 'অ্যানোমালি স্ক্যান' এবং প্রয়োজনে ভ্রূণের এমআরআই বা সিএনএস আল্ট্রাসাউন্ড করা উচিত।
৩. নজরদারি: নিয়মিত গ্লুকোজ মনিটরিং, সঠিক ডায়েট চার্ট এবং চিকিৎসকের পরামর্শমতো ইনসুলিন থেরাপি গ্রহণ করা।