এই ধরনের যক্ষ্মা সাধারণত লিম্ফ নোড বা গ্রন্থি, ফুসফুসের আবরণ (Pleura), মেরুদণ্ড এবং পেটে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে যাদের এইচআইভি (HIV), ডায়াবেটিস বা আগে টিবি হওয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অনেক বেশি।

আজ বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস
শেষ আপডেট: 24 March 2026 14:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: যক্ষ্মা বা টিবি মানেই শুধু ফুসফুসের রোগ—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। আমরা অনেকেই জানি না যে শরীরের হাড়, গ্রন্থি (Lymph Node), এমনকি মস্তিষ্কও এই মারণ জীবাণুর কবলে পড়তে পারে।
ফুসফুসের বাইরেও থাবা বসায় টিবি: আড়ালে থাকা বিপদ
ভারতে বর্তমানে যক্ষ্মা বা টিবি পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মোট টিবি আক্রান্তের প্রায় ২০ থেকে ৩৬ শতাংশই এখন ‘এক্সট্রাপালমোনারি টিবি’ (EPTB) বা ফুসফুস বহির্ভূত যক্ষ্মায় আক্রান্ত, যার প্রকোপ কলকাতার মতো শহরগুলোতে তুলনামূলক বেশি। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, শহরাঞ্চলগুলোতে এই হার ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।
এই ধরনের যক্ষ্মা সাধারণত লিম্ফ নোড বা গ্রন্থি, ফুসফুসের আবরণ (Pleura), মেরুদণ্ড এবং পেটে বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে যাদের এইচআইভি (HIV), ডায়াবেটিস বা আগে টিবি হওয়ার ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি অনেক বেশি। আরও চিন্তার বিষয় হলো, প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ক্ষেত্রে এই রোগীদের শরীরে কিছু সাধারণ ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে, যা চিকিৎসা প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে। বিশেষ করে শিশু ও মহিলাদের মধ্যে এক্সট্রাপালমোনারি টিবি হওয়ার প্রবণতা বেশি।
২০২৫-এর World Health Organization (WHO) রিপোর্ট বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১২ লক্ষ শিশু যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলেও রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার অভাবে থেকে যাচ্ছে প্রায় ৪৩ শতাংশ।
১. লিম্ফ নোড টিবি (Lymph Node TB)
শরীরের লিম্ফ নোড বা গ্রন্থি ফুলে যাওয়া এই ধরনের টিবির প্রধান লক্ষণ। এতে ঘাড় বা বগলের কাছে ব্যথাহীন ফোলা ভাব দেখা যায়। যেহেতু এতে ব্যথা থাকে না, তাই রোগীরা অনেক সময় এটাকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু অবহেলা করলে এই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
২. হাড় ও মেরুদণ্ডের টিবি (Bone TB)
এতে পিঠে ব্যথা হতে পারে, যা সাধারণ ব্যথা নয়। মেরুদণ্ড বা হাড়ের টিবি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক এবং দীর্ঘমেয়াদী।
উপসর্গ: দীর্ঘদিনের পিঠের ব্যথা (যা সাধারণ মাসল পেইন মনে হতে পারে), জ্বর, ওজন কমে যাওয়া এবং অরুচি। সময়মতো চিকিৎসা না হলে মেরুদণ্ড বেঁকে যেতে পারে বা প্যারালাইসিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। হাড়ের টিবির চিকিৎসা সাধারণ টিবির তুলনায় দীর্ঘ হয় (প্রায় ৯ মাস থেকে ১ বছর)।
৩. মস্তিষ্কের টিবি (Brain TB)
এটি বিরল হলেও অত্যন্ত প্রাণঘাতী। একে ‘টিবি মেনিনজাইটিস’ বলা হয় এবং এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক ধরনের টিবির মধ্যে একটি।
এই ধরনের ক্ষেত্রে রোগীর প্রচণ্ড মাথাব্যথা, খিঁচুনি, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া এবং আচরণে অসংলগ্নতা দেখা দিতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগের ঝুঁকি বেশি। শুরুতে সাধারণ ভাইরাল জ্বর মনে হলেও দ্রুত চিকিৎসা না করালে এটি মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি বা মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
কেন এই রোগ ধরা পড়তে দেরি হয়?
ফুসফুসের টিবি সংক্রামক হলেও, হাড় বা গ্রন্থির টিবি সাধারণত একজন থেকে অন্যজনের মধ্যে ছড়ায় না। তবে এর নির্ণয় পদ্ধতি তুলনামূলকভাবে জটিল।
কাশি না থাকায় কফ পরীক্ষার সুযোগ থাকে না। উপসর্গগুলো অনেক সময় ক্যানসার বা অটো-ইমিউন রোগের সঙ্গে মিলে যায়। অনেক ক্ষেত্রে সিটি স্ক্যান বা বায়োপসি ছাড়া ফুসফুস বহির্ভূত টিবি ধরা পড়ে না।
কলকাতার অন্যতম পালমোনোলজিস্ট ডা. দেবরাজ যশের কথায়, “যক্ষ্মা বা টিবি এমন একটি সংক্রমণ, যা কোনও ভেদাভেদ মানে না—যে কোনও বয়সে, যে কারও হতে পারে। এই রোগের একাধিক ধরন রয়েছে, যার মধ্যে ফুসফুসের টিবি সবচেয়ে বেশি সংক্রামক। রোগ নির্ণয়ের জন্য সাধারণত মান্টু টেস্ট ও কফে জীবাণু পরীক্ষা করা হয়। তবে সব ক্ষেত্রে কফ পরীক্ষায় জীবাণু ধরা পড়ে না—বিশেষত সংক্রমণ কম থাকলে। তাই শুধুমাত্র কফ টেস্ট নেগেটিভ হলেই টিবি হয়নি, এমনটা বলা যায় না। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্রঙ্কোস্কোপি, ইবিইউএস (Endobronchial Ultrasound), কিংবা বুকে জল জমলে সেই তরলের পরীক্ষাও করা হয়। অন্যদিকে, পেটের টিবি নির্ণয়ে আল্ট্রাসাউন্ড এবং মস্তিষ্কে টিবির ক্ষেত্রে এমআরআই ও সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড পরীক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। মান্টু টেস্ট পজিটিভ মানেই সক্রিয় টিবি—এ ধারণাও ভুল; এর অর্থ কেবল শরীরে জীবাণুর উপস্থিতি, উপসর্গ নাও থাকতে পারে।”
চিকিৎসার বিষয়ে ডা. যশ জানান, “যক্ষ্মা সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য রোগ—সরকারি বা বেসরকারি, যে কোনও জায়গাতেই চিকিৎসা সম্ভব। তবে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হল নিয়ম মেনে পুরো কোর্সের ওষুধ খাওয়া। মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি আরও বলেন, ফুসফুসের টিবি ছাড়া অন্যান্য ধরনের টিবি সাধারণত সংক্রামক নয়। লাং টিবির ক্ষেত্রেও রোগীকে প্রথম তিন সপ্তাহ আলাদা ঘরে থাকলেই যথেষ্ট; অযথা বাসনপত্র বা ব্যক্তিগত জিনিসপত্র আলাদা করার মতো বাড়তি চাপ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।”
বিশেষ পরামর্শ
যদি আপনার বা পরিচিত কারও নিচের লক্ষণগুলো দেখা দেয়, তবে দেরি করবেন না—
টিবি শুধু ফুসফুসের রোগ নয়, এটি একটি পদ্ধতিগত সংক্রমণ। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার পূর্ণ কোর্স সম্পন্ন করলে এক্সট্রাপালমোনারি টিবি থেকেও সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সম্ভব। ‘টিবি মুক্ত ভারত’ গড়তে সচেতনতাই আমাদের প্রথম অস্ত্র।