
শেষ আপডেট: 21 March 2023 14:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ডাউন সিন্ড্রোম (Down Syndrome)। একটা শিশুর জন্মের পরেই একরাশ হতাশা, একটা গোটা জীবনভর কষ্ট বয়ে আনে এই রোগ। মুখের হাসি মিলিয়ে যায় মুখেই। তারপর সেই শিশুর বেড়ে ওঠার প্রতিটা ধাপে ধাপে থাকে জটিলতা, সংগ্রাম। আজকের দিনটা সেই রোগে আক্রান্তদের উৎসর্গ করা হয়। আজ বিশ্ব ডাউন সিন্ড্রোম দিবস (World Down Syndrome Day)।
কিন্তু কেন বিশ্ব ডাউন সিন্ড্রোম দিবস পালনের জন্য বেছে নেওয়া হল আজকের দিনটাকেই (Health)? ২১ মার্চ তারিখের মধ্যে কী এমন বিশেষত্ব আছে যে অন্য কোনওদিনকে এই রোগের জন্য চিহ্নিত করা গেল না?

আসলে আজকের তারিখটা ডাউন সিন্ড্রোমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। এদিন তারই ব্যাখ্যা দিয়েছেন অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশ্যালিটি হসপিটালের ফিটাল মেডিসিন স্পেশ্যালিস্ট ডক্টর কাঞ্চন মুখার্জী। তিনি বলেন, এই তারিখের মধ্যেই অসুখের ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে।
ডক্টর মুখার্জী বলেন, ডাউন সিন্ড্রোম জন্মগত রোগ। একুশতম ক্রোমোজোম জোড়ে দুটির বদলে যদি তিনটি ক্রোমোজোম থাকে, তখন তাকে বলে ট্রাইসমি ২১ বা ডাউন সিন্ড্রোম। আন্তর্জাতিকভাবেই এই রোগের সচেতনতার প্রতীক নীল-হলুদ রঙ। আজকের দিনটাতে বিশ্বজুড়েই চিকিৎসকরা ডাউন সিন্ড্রোম নিয়ে জনসচেতনতা প্রসারের কথা বলেন।

এই উদ্দেশেই আজ, ২১ মার্চ রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত হয়েছিল এক বিশেষ অনুষ্ঠান। 'সেন্ট্রাল কলকাতা ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ফর পারসনস উইথ ডাউন সিনড্রোম'-এর তরফে আলোচনা, নাচ, গানে জমে উঠেছিল প্রেক্ষাগৃহ। প্রধান অতিথি ছিলেন মার্কিন কনসাল জেনারেল মেলিন্ডা পাভেক।

তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন ডক্টর মুখার্জী। তাঁর কথায়, আজ ওরা কী কী পারে না সেটা আলোচনা করার দিন নয়। আমিও তো অনেক কিছু পারি না। আজ ওদের দিন। ওরা কী কী পারে সেগুলো জানার চেষ্টা করার দিন। ওদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। ওরা খেলতে পারে, গাইতে পারে, হাসতে পারে, হাসাতে পারে। ওদের ভালবাসতে হবে, তাহলেই ওরাও আপনাকে ভালবাসবে। আসলে ওরা অনেক কিছু পারে। সকলের নজরে আসুক ওরা। শুধু আজ কেন? সারা বছর।

যারা সমাজের আর পাঁচজনের মতো নয়, যারা একটু ছকভাঙা, আজ তাদের দিন। তাদের জন্যে আজ বাকিরাও যদি খানিক ছক ভাঙে, তো ক্ষতি কী? ডক্টর মুখার্জী আজ সকলকে রঙবেরঙের মোজা পরার পরামর্শ দিয়েছেন। দুই পায়ে দুই আলাদা রঙের মোজা পরতে বলেছেন তিনি। তাঁর কথায়, আজ #LotsOfSocks campaign এর দিন। রঙ মিলান্তি ছকের বাইরে বেরিয়ে যারা একটুখানি অন্যরকম আজ তাদের আপন করে নিন।

ডক্টর মুখার্জী আরও বলছেন, চিকিৎসা শাস্ত্রের নিরিখে ডাউন সিনড্রোম এখন যথেষ্ট প্রতিরোধযোগ্য। প্রয়োজনীয় সচেতনতা এবং কিঞ্চিত সামর্থ থাকলে বেশির ভাগ গর্ভবতীই আজকাল এই টেস্ট করিয়ে নেন। তবু এখনও প্রতি আটশো শিশুর মধ্যে একজন এই রোগ নিয়ে জন্মায়। ভারতে প্রতি বছর প্রায় ত্রিশ হাজার বাচ্চার জন্ম হয় ডাউন সিনড্রোম নিয়ে। এর জন্যে শিশুটি তো বটেই তার মা বাবাও বিন্দুমাত্র দায়ী নন। এ ঘটনা ঘটে প্রাকৃতিক কারণেই। তাহলে তাদের নিয়ে সমাজে কেন এত ঢাকঢাক গুড়গুড়। পরম আদরে এই বাচ্চাদের বাইরে আনুন। সবার সঙ্গে মিশতে দিন। ওরাও সবার মত করে বড় হোক।

চল্লিশের দশকে ডাউন সিনড্রোম নিয়ে জন্মালে তাদের গড় আয়ু হত মাত্র বারো বছর। আধুনিক চিকিৎসা, উন্নত পুষ্টি এবং সার্বিক সাপোর্ট সিস্টেমের কল্যাণে এখন সেটা ষাট বছর। তবু সমাজে রয়েছে তাদের নিয়ে নানা ধরনের দুর্ভাগ্যজনক এবং অবৈজ্ঞানিক মিথ। ওরা খেলতে পারে, গাইতে পারে, হাসতে পারে, হাসাতে পারে। ভাই, বোন, বন্ধু বান্ধবদের ওপর কোনো কুপ্রভাব ফেলে না। কোমল স্বভাবের হলেও ওদেরও রাগ, দুঃখ, অভিমান হয়। অনেকেই লেখাপড়া শিখে নিজের কেরিয়ার গড়ে। অফিসে কাজ করে। কলকাতাতেই এমন একাধিক ক্যাফে রয়েছে যেগুলি সার্বিক ভাবে ওরা চালায়। ওদের ভালোবাসুন, দেখবেন ওরাও আপনাকে ভালবাসায় ভরিয়ে দিচ্ছে।

ডাউন সিন্ড্রোম সচেতনতায় রাষ্ট্রপুঞ্জের এবছরের থিম হল, 'উইথ আস, নট ফর আস', যার অর্থ হল, 'আমাদের সঙ্গে, আমাদের জন্য নয়'। অর্থাৎ, ডাউন সিনড্রোম আক্রান্তরা বিশ্বজুড়ে বার্তা দিচ্ছেন, তাঁদের সঙ্গে থাকার জন্য, তাঁদের জন্য আলাদা কিছু করার প্রয়োজন নেই। অর্থাৎ সেই অন্তর্ভুক্তি, বা ইনক্লুশনের কথাই বলছেন তাঁরা। ডক্টর মুখার্জী এ বিষয়ে বলছেন, 'এই স্লোগানে নিহিত রয়েছে মানবাধিকারের মন্ত্র, সমানাধিকারের দাবি। এর মোকাবিলায় ব্যক্তি বা সরকারের তরফে চিরাচরিত চ্যারিটি মডেল বা মহানুভবতার মনোভাব বদলে এবার সময় এসেছে ওদেরকে সঙ্গে নিয়ে চলার। গৃহীত সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার বদলে সব সিদ্ধান্তের অংশীদার করে নিতে হবে ওদের। নিজের কথা নিজে বলা তথা নিজের প্রয়োজন নিজে ব্যক্ত করার নামই তো সেলফ অ্যাডভোকেসি। ওদের সেই পরিসর দিতে হবে। শারীরিক কিছু পার্থক্য আছে বলে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ওরা বাদ পড়তে পারে না। ওদের জন্যে নয়, ওদের সঙ্গে নিয়ে চলতে হবে।'

গত বছরেও এই দিবসের থিম ছিল, '#InclusionMeans'। ডক্টর মুখার্জী বলেন, শিক্ষায় 'Inclusion' মানে আলাদা শিক্ষাব্যবস্থা নয়। মূলস্রোতেই ওদের অন্তর্ভুক্তিকরণ সম্ভব। স্বাস্থ্যক্ষেত্রেও তাই। আর পাঁচজনের যদি সুস্থভাবে বাঁচার অধিকার থাকে, চিকিৎসার অধিকার থাকে তাহলে ওদেরও সেটা আছে। অফিস-কাছারিতেও ওদের পদোন্নতির সুযোগ দেওয়া দরকার বলে মনে করেছেন ডক্টর মুখার্জী। শারীরিক কিছু পার্থক্য আছে বলে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ওদের যেন বাদ না দেওয়া হয়। সমাজের মূল ধারায় ওদের মেলাতে পারলে তবেই এই দিবস সফল হবে, বলেন ডক্টর মুখার্জী।
ADHD: বাচ্চা খুব দুরন্ত, একদম মনোযোগ নেই, অস্থির ভাব? বকাঝকা করবেন না