গবেষকদের মতে, ভারতে রোটাভাইরাস টিকার ব্যবহার বাড়ার ফলে ওই ভাইরাসের প্রকোপ আগের চেয়ে কমেছে। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই যখন একটি ভাইরাসের দাপট কমে, তখন অন্য কোনও ভাইরাস সেই জায়গা দখল করে নেয়। এক্ষেত্রে অ্যাডিনোভাইরাস-এফ ঠিক সেই কাজটিই করছে।

শিশুদের ডায়ারিয়া হলে কী করবেন?
শেষ আপডেট: 13 April 2026 16:26
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিশ্বজুড়ে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুদের অসুস্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হল ডায়রিয়া(Diarrhea)। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ১৭০ কোটি শিশু এই রোগে আক্রান্ত হয়। ভারতেও এই চিত্রটা বেশ উদ্বেগজনক। সম্প্রতি আইসিএমআর-ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ ইন ব্যাকটিরিয়াল ইনফেকশনস (ICMR-NIRBI)- এর একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এক নতুন আশঙ্কার কথা। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, রোটাভাইরাসকে টক্কর দিয়ে এখন শিশুদের পেটের রোগের প্রধান কারণ হয়ে উঠছে হিউম্যান অ্যাডিনোভাইরাস-এফ (HAdV-F)।
কেন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা?
গবেষকদের মতে, ভারতে রোটাভাইরাস টিকার ব্যবহার বাড়ার ফলে ওই ভাইরাসের প্রকোপ আগের চেয়ে কমেছে। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মেই যখন একটি ভাইরাসের দাপট কমে, তখন অন্য কোনও ভাইরাস সেই জায়গা দখল করে নেয়। এক্ষেত্রে অ্যাডিনোভাইরাস-এফ ঠিক সেই কাজটিই করছে। কলকাতার একটি হাসপাতালে ১,২৮৩ জন শিশুর মলের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, ডায়রিয়ার জন্য দায়ী প্রধান তিনটি ভাইরাস হল, রোটাভাইরাস: ২৩.৪৬%, হিউম্যান অ্যাডিনোভাইরাস-এফ: ১০.৬৮%, নোরোভাইরাস: ৯.১২%।
কলকাতার ইনস্টিটিউট অফ চাইল্ড হেলথ-এর শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. অগ্নিমিতা গিরি জানিয়েছেন, রাজ্যে বর্তমানে শিশুদের রোটা ভাইরাসের টিকা দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে রোটা ভাইরাল ইনফেকশনের সম্ভাবনা কমলেও চরিত্র বদল করে অ্যাডিনোভাইরাস সংক্রমণ শিশুদের মধ্যে বাড়ছে। এই ভাইরাসের মিউটেশনের কারণেই মূলত শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা নিয়ে অভিভাবকদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, "শিশুদের বারবার মলত্যাগ বা ডায়রিয়া হলে যাতে শরীর কোনওভাবেই জলশূন্য না হয়ে যায়, সেদিকে কড়া নজর রাখতে হবে; প্রয়োজনে মেডিসিন শপ থেকে ওআরএস (ORS) এনে শিশুকে খাওয়াতে হবে অথবা বাড়িতেই নুন-চিনির জল বানিয়ে বারবার পর্যাপ্ত পরিমাণে দিতে হবে। এর পাশাপাশি ফোটানো জল ঠান্ডা করে পান করানো এবং ডালের জল বা সেদ্ধ সবজির জল দেওয়া যেতে পারে; এমনকি ব্রেস্ট ফিডিং করা শিশুদের ক্ষেত্রেও ডায়রিয়া হলে ওআরএস দেওয়া প্রয়োজন। খেয়াল রাখতে হবে শিশু বমি করছে কি না এবং দিনে অন্তত ৬-৮ বার প্রস্রাব করছে কি না; যদি প্রস্রাবের পরিমাণ এর চেয়ে কমে যায়, তবে বুঝতে হবে শিশু ডিহাইড্রেশনের শিকার হচ্ছে। এছাড়া খিদে কমে যাওয়া, জিভ শুকিয়ে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত ঘুম ও ক্লান্তিভাব দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।"
সবচেয়ে ঝুঁকিতে কারা?
আইসিএমআর-এর বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, সব বয়সের শিশুরা আক্রান্ত হলেও ৬ মাস থেকে ২৪ মাস বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ৬ থেকে ১২ মাস বয়সী শিশুরা এই ভাইরাসের প্রকোপে পড়ে। এর প্রধান কারণ হল এই বয়সে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন সিস্টেম সম্পূর্ণ তৈরি হয় না, ফলে তারা খুব সহজেই সংক্রমণের কবলে পড়ে।
ভাইরাসের চারিত্রিক বদল ও নতুন ভ্যারিয়েন্ট
গবেষক দলের প্রধান বিজ্ঞানী ডঃ মমতা চাওলা সরকার জানিয়েছেন, গবেষণায় অ্যাডিনোভাইরাস-এফ-এর (টাইপ ৪০ এবং ৪১) মধ্যে ব্যাপক জেনেটিক বৈচিত্র্য দেখা গেছে। শুধু তাই নয়, এই ভাইরাসের একটি নতুন ভ্যারিয়েন্ট বা রূপও শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। এই নতুন রূপটির প্রোটিন কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন এসেছে, যার ফলে এটি আগের চেয়ে বেশি সংক্রামক হতে পারে এবং রোগের তীব্রতা বাড়িয়ে দিতে পারে। এমনকি ভবিষ্যতে এই ভাইরাসের টিকা তৈরির ক্ষেত্রেও এই চারিত্রিক বদল বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আবহাওয়া ও পরিবেশের ভূমিকা
গবেষণায় দেখা গেছে, গরম এবং আর্দ্রতা বাড়লে এই ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বর্ষাকালে এই সংক্রমণের হার কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে শিশুদের এই ডায়রিয়া হওয়ার সরাসরি যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।
আগামীর সতর্কতা: মেনে চলুন
বিজ্ঞানীদের মতে, শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে এখন থেকেই নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। তাঁদের পরামর্শ: