একটা শিশু প্রথম “মা” বা “বাবা” বলার আগেই তার মস্তিষ্ক অনেক কাজ সেরে ফেলে। জীবনের প্রথম তিন বছর—এই সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ আপডেট: 26 March 2026 15:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাড়ির এক কোণে বসে ছোট্ট বাচ্চাটা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ স্থির, আঙুল থেমে—কিন্তু শব্দ নেই। এই দৃশ্য এখন খুব চেনা। আর এই চেনা ছবির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক নীরব বিপদ।
চিকিৎসকেরা বলছেন, এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শিশু দেরিতে কথা বলতে শুরু করছে। আর এই বাড়ন্ত সমস্যার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে অতিরিক্ত স্ক্রিনটাইম।
কারণ শিশু কথা বলতে শেখে শুধু কানে শুনে নয়, দেখে, নকল করে, প্রতিক্রিয়া দিয়ে। মা হাসলে সে হাসে, কেউ শব্দ করলে সে অনুকরণ করে। এই ছোট ছোট কথোপকথনই তার ভাষার ভিত গড়ে দেয়। কিন্তু যদি সেই জায়গাটা স্ক্রিন নিয়ে নেয়, তখন সমস্যা শুরু হয়।
মোবাইল, টিভি বা ট্যাব—এসব এখন অনেক বাড়িতেই শিশুকে শান্ত রাখার সহজ উপায়। কাঁদলেই ফোন ধরিয়ে দেওয়া, খাওয়ানোর সময় ভিডিও চালানো, এসব যেন অভ্যাস হয়ে গেছে।
কিন্তু সমস্যা হল, স্ক্রিন একমুখী। শিশু সেখানে শুধু দেখে, কিন্তু কোনও প্রতিক্রিয়া পায় না। ফলে তার মস্তিষ্ক কথোপকথনের অভিজ্ঞতা শেখে না, যা ভাষা শেখার জন্য সবচেয়ে জরুরি।
এমনকি পেছনে টিভি চললেও তা শিশুর মনোযোগে প্রভাব ফেলে, ভাষা শেখার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।
শিশুর বয়স অনুযায়ী কিছু স্বাভাবিক মাইলস্টোন থাকে। এক বছর বয়সে সে কিছু শব্দের মতো আওয়াজ করবে, নিজের নাম চিনবে। ১৮ মাসে কয়েকটা আস্ত শব্দ বলবে। দু'বছরে ছোট ছোট বাক্য গড়ে তুলতে শুরু করবে।
যদি এসব না হয়, চোখে চোখ রেখে কথা না বলে, বা শুধু ইশারায় বোঝাতে চায়—তাহলে সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে।
আজকের শহুরে জীবনে নিউক্লিয়ার পরিবার, ব্যস্ততা আর হাতের কাছে গ্যাজেট— সব মিলিয়ে স্ক্রিনটাইম এখন প্রায় প্রতিদিনের সঙ্গী।
অনেকেই ভাবেন, “এডুকেশনাল ভিডিও” দেখলে ক্ষতি নেই। কিন্তু বাস্তবটা একটু আলাদা। ভিডিও থেকে কিছু শেখা যায় ঠিকই, কিন্তু ভাষা শেখা শুধু শব্দ নয়, এটা সম্পর্ক, অনুভূতি আর প্রতিক্রিয়ার খেলা। যা স্ক্রিন দিতে পারে না।
তাই এই জায়গাটায় আরও সচেতনতা প্রয়োজন। দু'বছরের কমবয়সি শিশুদের ক্ষেত্রে স্ক্রিন পুরোপুরি এড়িয়ে চলাই ভাল, প্রয়োজন হলে শুধু ভিডিও কল। দু'বছরের বেশি হলে, দিনে এক ঘণ্টার বেশি নয়—তাও বাবা-মায়ের সঙ্গে বসে।
খাওয়ার সময়, খেলার সময়, ঘুমের আগে— এই সময়গুলো স্ক্রিনমুক্ত রাখাই সবচেয়ে জরুরি। সবচেয়ে বড় কথা, শিশুরা যা দেখে, তাই শেখে। তাই বড়দেরও নিজের অভ্যাসে বদল আনতে হবে।
সেইসঙ্গে, যদি মনে হয় শিশুর কথা বলায় দেরি হচ্ছে, তাহলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পেডিয়াট্রিশিয়ান বা স্পিচ থেরাপিস্টের সাহায্য যত তাড়াতাড়ি নেওয়া যায়, ততই ফল ভাল হয়।
শিশুরা শব্দ শুধু শোনে না, তারা সেটা অনুভব করে, জবাব দেয়, সম্পর্ক গড়ে তোলে। স্ক্রিনে যতই আওয়াজ থাক, দৃশ্য থাক, বর্ণনা থাক, স্ক্রিন কখনওই সেই সম্পর্কের জায়গা নিতে পারে না।
তাই শিশুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি, স্ক্রিনটা সরিয়ে রাখা, আর শিশুর চোখে চোখ রেখে অনর্গল কথা বলা, তাকে বলতে দেওয়া।