ভোটের বাজারে হরেক পদের লড়াই! কলকাতার ‘সপ্তপদী’ রেস্তোরাঁ নিয়ে এল অভিনব নির্বাচনী মেনু। ‘সবুজ ডাব চিংড়ি’ থেকে ‘নিরপেক্ষ মাটন সিপাহী’—ভোজনরসিক বাঙালির জন্য রাজনীতির রসনার রসে জারিত খানাখাজনার বিস্তারিত পড়ুন।

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 9 April 2026 17:22
ভোটের মরসুমে প্রার্থীরা পথেপ্রবাসে। জনসংযোগ ধরে রাখতে কেউ ছাপোষা গৃহস্থের বাড়িতে পিঁড়ি পেতে খাচ্ছেন। কেউ বেলনচাকি হাতে রুটি বেলতে বসে পড়ছেন। মোট কথা, নির্বাচনের ময়দানে কেউ লোপ্পা ফুলটস মিস করতে নারাজ!
কিন্তু আমজনতা? তারা কী করবে… আগত প্রার্থীদের আদর-আপ্যায়ন ছাড়া? সাধারণ মানুষের হেঁসেলে ফাঁকা সিলিন্ডারের দীর্ঘশ্বাস আর তড়িঘড়ি ইন্ডাকশন কুকার কেনার তাড়না ছাড়া আর কি কিছু বেঁচেবর্তে আছে?

উত্তরের খোঁজেই হয়তো ভোটরঙ্গে আতপ্ত মহানগরীতে একগুচ্ছ স্পেশ্যাল মেনু আমদানি করল ‘সপ্তপদী’ রেস্তোরাঁ। এতদিন ভোজনরসিক বাঙালির ‘মনোমত’ পদ পরিবেশনের পর এবার ‘মনোনীত’ লিস্ট সাজানোর পালা। মোদ্দা উপকরণ সেই এক৷ কিন্তু রন্ধনে আর ব্যঞ্জনে ঈষৎ ভোটের ফোড়ন। সেই সঙ্গে নামকরণেও৷ পুরুষ্টু, কুড়মুড়ে চিকেন কাটলেট তো অনেকেই খেয়েছেন। কিন্তু ‘প্রচার-কেন্দ্রে চিকেন কাটলেট’? ফ্রেশ ভেটকির সুবাসে অ্যাপেটাইট খানিক বেশি আমোদিত!
ভোট মানে যুদ্ধ স্রেফ ব্যালট আর ইভিএমে নয়। লড়াই জমে ছড়ায়-তরজায়… রঙেও৷ বহুবর্ণী দেওয়াললিখনের চাইতে অকাট্য প্রমাণ আর কী-ই বা হতে পারে? সপ্তপদীর মেন্যুতেও কিন্তু তিন প্রধান শিবিরের প্রতিনিধি উপস্থিত। একদিকে সবুজে মোড়া ডাব চিংড়ি। অন্যদিকে কমলারঙা কাতলা কালিয়া। প্রথমটা মিঠে মিঠে৷ পরেরটা ঝাল ঝাল৷ আর এই দুইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে লাল লাল পমফ্রেট! সিপিএম-তৃণমূল-বিজেপির যে কেউ গিয়ে পছন্দসই আইটেম বেছে নিতে পারে। তবে ভাগাভাগি করে খেতে বসলে গোষ্ঠীসংঘর্ষের তুমুল সম্ভাবনা!

কিন্তু যদি নোটা-পন্থী হন? 'কোনও দল ভাল নয়' কিংবা 'সব দলই সমান পাজি'-র তত্ত্বে বিশ্বাসী… তখন? সপ্তপদী আপনাকেও হতাশ করবে না। আয়েশ করে কবজি ডুবিয়ে খেতে পারেন 'নিরপেক্ষ মাটন সিপাহী'। আবার নির্দল হিসেবে দাঁড়িয়ে দুর্নীতিমুক্ত ও শোষণহীন সমাজের বার্তা দিতে চাইলে 'প্রতিশ্রুতি ভরা ফুলকো লুচি' অর্ডার দিতেই হবে৷ কিংবা লড়াই নয়, ফলাফল দেখতেই উৎসুক যাঁরা, পালাবদল হবে কি হবে না—এই রোমাঞ্চে মজে, তাঁদের জন্য শেষপাতে 'এক্সিট পোলে চাটনি'।
ব্যালট বাক্সে ভোট, থালায় রায়
শুধু নামে মজা থাকলেই হবে না। খুঁতখুঁতে যাঁরা, তাঁদের নজরে রসনার পরীক্ষাতেও উত্তীর্ণ হতে হবে। সপ্তপদীর প্রতিটি পদ সেই টেস্টে নামছে প্রকৃত অর্থে। ‘ব্যালট বক্স ভাপা ইলিশ’ ১১০০ টাকা ঠিকই। কিন্তু খাঁটি ইলিশের সৌরভে সেই দাম নস্যি মনে হবে। ‘পাতের নেতা মাটন কষা’ আবার ঝাল-মশলায় রান্না। যাঁদের উত্তেজক ভাষণ শুনলেই রক্ত গরম হয়ে ওঠে, এই পদ তাঁদের চাই-ই-চাই! আপনি যদি রাজনৈতিক বক্তৃতায় বীতস্পৃহ হন, তাহলেও এক পিস মাটন আর এক চামচ গ্রেভি মুখে দিতে দেখতে পারেন। লক্ষ করবেন, বাড়ি ফিরে টেলিভিশনের ধুন্ধুমার সান্ধ্য-ডিবেটও কেমন রোমহর্ষক মনে হচ্ছে!
আর মিষ্টিপ্রিয় নিখাদ বাঙালির জন্য… যারা ধর্মেও আছে জিরাফেও আছে? ‘অপ্রতিদ্বন্দ্বী সুগন্ধী পায়েস’। সত্যিই অপ্রতিদ্বন্দ্বী! কারণ মিষ্টির রাজনীতিতে পায়েস বরাবর সর্বদলীয় সমর্থন পেয়ে এসেছে। এই মেন্যু কোনও দলের পক্ষে নয়, বিপক্ষেও নয়। বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির পক্ষে—এটুকুই।
খাবার টেবিল পোলিং বুথ
৪ এপ্রিল থেকে ৪ মে—পুরো এক মাস চলবে এই ‘ফুড ডেমোক্রেসি ফেস্টিভাল’। শুধু খাওয়া নয়, ভোটও দেওয়া যাবে। রেস্তোরাঁয় বসে বা ডিজিটাল মাধ্যমে প্রিয় পদকে সমর্থন জানাতে পারবেন। সবশেষে সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত পদটি পাবে ‘পিপলস চয়েস অফ বেঙ্গল’ তকমা। সেই পদ মরসুমি মেন্যু কার্ডে নয়, পাকাপাকিভাবে রেস্তোরাঁর হেঁশেলে জায়গা করে নেবে। সপ্তপদীর অন্যতম কর্ণধার রঞ্জন বিশ্বাসের কথায়, ‘বাংলা যখন নেতা বাছছে, আমরা মানুষকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি সেই জিনিস নির্বাচন করে নিতে, যা আসলে আমাদের এক করে…খাবার!’

কথাটা ভুল নয়। রাজনীতি ভেঙে দেয়। রসনা জোড়া লাগায়। বিজেপি আর সিপিএমের ঘরের মানুষ একটেবিলে বসে ইলিশ ভাগ করে খাচ্ছে—এমন ম্যাজিক শুধু বাংলার রান্নাঘরই করে দেখাতে পারে। এই খাদ্যোৎসব আসলে সেই সত্যের উদযাপন।
‘জনগণের রায়’: থালায়, ভোটবাক্সে নয়
মাসশেষে একটা পদ জিতবে। সেটা ‘ক্ষমতা’য় (পড়ুন ‘মেন্যু’তে) আসবে। গদি জুটবে না ঠিকই। কিন্তু রসনাতৃপ্ত বাঙালির মনে পাকা আসন জিতে নেবে যে কেউ। বাংলার ভোটের মরসুমে এমন উদ্যোগ হয়তো ছোট। কিন্তু ভাবনাটা বড়। যে সময় কথায় কথায় বিভাজন, সেই সময় দাঁড়িয়ে একটা রেস্তোরাঁ বলছে—‘এসো, একসঙ্গে বসো, পেটপুরে খাও। রাজনীতি পরে হবে!’
সপ্তপদীর ঠিকানা কলকাতা। কিন্তু এই জরুরি বার্তা সারা বাংলার জন্য।