চেলসির ট্রান্সফরমেশনে জেমস অমূল্য সম্পদ। রাইট ব্যাকে তিনি ক্লাস, মাঝমাঠে ‘ইমপ্যাক্ট’। আর এই ইমপ্যাক্ট যদি ধরে রাখতে পারেন, ইংল্যান্ড টিমে তাঁর কদর কিন্তু আরও বেড়ে যাবে।

রিস জেমস
শেষ আপডেট: 1 December 2025 13:25
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কেরিয়ারের শুরুতে আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার। তারপর রাইট ব্যাকে। চেলসিতে টমাস টুখেল যখন ৩-৪-৩ ফর্মুলায় দল সাজালেন, তরুণ ডিফেন্ডার সরে গেলেন উইং ব্যাক পজিশনে৷ এরপর পেপ গুয়ার্দিওলা-প্রাণিত ইনিভার্টেজ ফুলব্যাক বলে যে নতুন বস্তু প্রিমিয়ার লিগে এল, সেখানেও স্বচ্ছন্দে উড়ে বেড়ালেন তিনি। রিস জেমস। চেলসির অধিনায়ক৷ ক্লাবেরই অ্যাকাডেমি গ্র্যাজুয়েট৷ চোট-আঘাতে বারবার কেরিয়ার হোঁচট খেয়েছে। কিন্তু তিনি নিজে থমকাননি! অধুনা এনজো মারেসকা তাঁকে মাঝমাঠে ডবল পিভট হিসেবে মোইসেস কাইসেদোর পাশে খেলাচ্ছেন৷ আর সবাইকে চমকে দিয়ে ফি-সপ্তাহে দশে দশ পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে চলেছেন জেমস!
বারবার জায়গা বদলের পরেও জমি হারাননি৷ যার নতুন নমুনা দেখা গেল কাল রাতে, স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে৷ লন্ডন ডার্বি৷ প্রতিপক্ষ আর্সেনাল৷ প্রিমিয়ার লিগের ফার্স্ট বয়, আপাতত৷ চ্যাম্পিয়নস লিগের অপরাজিত৷ তাদের বিরুদ্ধে এক ঘণ্টা দশ জনে খেলল চেলসি৷ কাইসেদো লাল কার্ড দেখে ময়দান ছাড়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, খুব সহজে তিন পয়েন্ট ছিনিয়ে বাড়ি ফিরবে মিকেল আর্তেতার ছেলেরা! কিন্তু দিনের শেষে স্কোরলাইন যে ১-১-ই রইল, তার প্রধান কারণ একজন: রিস জেমস! জীবনপণ পরিশ্রম, অদ্ভুত ইন্টারসেপশন, ট্যাকল, পজেশন দখল, ফরোয়ার্ড পাস, শর্ট পাস, রোটেশন—সব মিলিয়ে মিডফিল্ড মাস্টারক্লাস পেশ করলেন ইংরেজ ফুটবলার।
ঘরের মাঠে দাঁড়িয়ে জেমস (Reece James) যেন মনে করিয়ে দিলেন—পজিশন শুধু কাগজে লেখা, খেলাটা চলে মনের জোরে আর ফুটবলের বুদ্ধিতে। সারাজীবন রাইট ব্যাক, উইং ব্যাক হয়ে খেলার পর হঠাৎ তাঁকে মাঝমাঠে নামিয়ে দিয়েছেন কোচ মারেসকা (Enzo Maresca)। তাও আবার এমন একটি ম্যাচে, যেখানে সামনে আর্সেনাল (Arsenal)। ম্যাচের রং বদলে যেতে পারে মাত্র একচুল ভুলে।

কিন্তু জেমস ভুল করার বান্দাই নন! কাইসেদো (Moises Caicedo) লাল কার্ড দেখে বেরিয়ে যাওয়ার পর যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা একক দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণে রাখলেন। ডিফেন্সে দাঁড়ালেন যখন, তখন ঠান্ডা মাথায় ট্যাকল; মাঝমাঠে এলে ছড়িয়ে দিলেন পাসিং; সামনে এগোনোর সময় শরীর ঠেলে জায়গা বার করলেন। এক কথায়—একক ফুটবলারের হাজারো রূপের একত্র প্রদর্শনী!
তারপরই এল তাঁর গোল-তৈরির মুহূর্ত। বিরতির পরই জেমস ক্রস ভাসালেন জোয়াও পেদ্রোকে (Joao Pedro) লক্ষ্য করে। লাফিয়ে উঠে ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড বল টার্গেটে রাখলেন। গোল এল না—তা আরেক প্রসঙ্গ। কিন্তু আর্সেনাল রক্ষণে ভয় ধরল। চেলসি পেল কর্নার। নিলেন জেমস। আরও একখানা নিখুঁত বল। পাঠালেন ট্রেভো চালোবার (Trevoh Chalobah) মাথায়! এল ম্যাচের প্রথম গোল, লিডে চেলসি। দশ জনে খেলেও মারেসকার টিম যে এক পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারল—এর অন্যতম কৃতিত্ব জেমসের।

এই পারফরম্যান্সের আড়ালে কি শুধুই অনুশীলন? বড় কারণ কিন্তু চেলসির নতুন মেডিক্যাল সিস্টেম। গত দুই বছর ধরে যেভাবে জেমসকে (Reece James) যত্ন করে খেলানো হয়েছে, বিশ্রাম নির্দিষ্ট করা হয়েছে, ট্রেনিং ও ম্যাচের লোড মাপা হয়েছে—তা যেন এদিন ময়দানে পুরস্কারের মতো ফিরে এল। অনেকেই ভুলে গেছেন—চেলসি অধিনায়ক এক বছর খেলেছিলেন ‘ওয়ান ম্যাচ আ উইক’ নিয়ম মেনে, চোটের ঝুঁকি কমাতে। এখন সেই তিনিই সপ্তাহে দুই-তিনটা ম্যাচ খেলছেন!
চেলসি পারফরম্যান্স ডিরেক্টর ব্রাইস ক্যাভানাগ (Bryce Cavanagh) আর মেডিক্যাল ডিরেক্টর ক্রেইগ রবার্টসের (Craig Roberts) নতুন পরিকল্পনা এতটাই নিখুঁত কাজ করেছে, যে জেমস নিজেই বিবিসি-কে বলেছেন—‘আমাকে টিকিয়ে রাখার জন্য আড়ালে অনেকে দিনরাত এক করে কাজ করছেন!’
যদিও শুধু শারীরিক পরিবর্তন নয়—নেতৃত্বেও জেমস বদলে গিয়েছেন। মারেসকা দায়িত্ব নেওয়ার সময় অধিনায়কের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে খুশি হননি। সরাসরি বলেছিলেন—‘আরও আবেগ দরকার!’ কোচের কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে নিজেকে পালটে ফেলেছেন জেমস। এখন তিনি নীরবে টিম ম্যানেজ করেন: কারো কাঁধে হাত রাখা, কাউকে পাশে ডেকে বলা, হাফটাইমে পুরো দলকে সার্কেলে দাঁড় করানো—ছোট ছোট অভ্যাসই তো বড় দলের ভিত তৈরি করে!

পাশাপাশি সিনিয়র খেলোয়াড় হিসেবেও জেমস যেন নয়া অবতারে! ব্রাজিলিয়ান তরুণ এস্তেভাও-কে (Estevao Willian) সাইডলাইনে দাঁড়িয়ে আগ্রাসী খেলার মর্ম শেখাচ্ছেন, লকার রুমে দলকে ধরে রাখছেন, কঠিন সময়ে টিম ডিনার আয়োজন করছেন—এগুলো অধিনায়কের কাজ, এবং তিনি ঠান্ডা মাথায় করছেনও!
এবার আসা যাক আসল প্রশ্নে—রিস কি স্থায়ীভাবে চেলসির মিডফিল্ডার বনে যাবেন? জবাব দেওয়া কঠিন। তিনি স্বাভাবিকভাবে একজন রাইট ব্যাক। বিস্ফোরক রান আর মারাত্মক ক্রস মূল শক্তি। মাঝমাঠে খেলা মানে বেশি দৌড়, বেশি চাপ, বেশি পজিশনাল দায়িত্ব। যে কারণে গেম ম্যানেজম্যান্ট জরুরি। মারেসকাও স্বীকার করেছেন—‘লিডস ম্যাচে রিসকে হয়তো বিশ্রাম দিতে হবে।’
তবে একথা নিশ্চিত—চেলসির ট্রান্সফরমেশনে জেমস অমূল্য সম্পদ। রাইট ব্যাকে তিনি ক্লাস, মাঝমাঠে ‘ইমপ্যাক্ট’। আর এই ইমপ্যাক্ট যদি ধরে রাখতে পারেন, ইংল্যান্ড (England) টিমে তাঁর কদর কিন্তু আরও বেড়ে যাবে। জাতীয় দলের কোচ টমাস টুখেল (Thomas Tuchel) যখন জেমসকে ক্যাম্পে ডাকলেন, সেটা শুধু অতীতের সুখস্মৃতি নয়—ভবিষ্যতের বিনিয়োগও বটে!