১৯৫৪ সালে কবি জীবনানন্দ দাশের ট্রাম দুর্ঘটনা আজও রহস্য। দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, নাকি ডায়াবেটিসজনিত হাইপোগ্লাইসেমিয়াই কি তাঁর মৃত্যুর কারণ? চিকিৎসা ও ইতিহাস মিলিয়ে বিশ্লেষণ।

জীবনানন্দ দাশ।
শেষ আপডেট: 22 October 2025 20:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সেদিনও বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নেমে আসছিল কলকাতার রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে। হাঁটাহাঁটি শেষে বাড়ি ফিরছিলেন কবি জীবনানন্দ দাশ। অন্যদিনের মতোই শান্ত ছিল চারপাশ। কিন্তু ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবরের সেই বিকেলটাই হয়ে উঠেছিল কালো তারিখ। কারণ, ঠিক সেদিনই ট্রামের ক্যাচারের নীচে ধরা পড়লেন বাংলার আধুনিক কবিতার এক কিংবদন্তি।
পাগলাঘণ্টি বাজিয়ে ছুটে এলেও, শেষমেশ ট্রামটি থামেনি, কিংবা থেমেও কবি বাঁচেননি। দোকানদার চুনিলাল দেব তাঁকে টেনে তুলেছিলেন রক্তে ভেজা অবস্থায়। এরপর—হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ, এবং এক অমীমাংসিত প্রশ্ন: জীবনানন্দ কি আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি এ কেবলই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা?
ঘটনার পর থেকেই বিতর্ক জারি। কেউ বলেন, জীবনানন্দের কবিতাতেই আত্মহত্যার পূর্বাভাস লুকিয়ে ছিল—“আট বছর আগে একদিন”-এর সেই পঙ্ক্তি, দিনলিপির নোটে আত্মহননের সম্ভাবনা, কিংবা তাঁর গোপন বিষণ্ণতা।
আবার অনেকে বলেন, এটি নিছকই তাঁর অন্যমনস্কতার ফল। “সতত সতর্ক থেকেও কেউ পড়ে যায় জলে”—এই লাইনটিই যেন তাঁর জীবনের প্রতীক। কিন্তু এই অন্যমনস্কতা কি নিছক মানসিক? নাকি এর পেছনে কাজ করেছিল শারীরবৃত্তীয় কোনো কারণ—যেমন হঠাৎ রক্তে শর্করা কমে যাওয়া, অর্থাৎ হাইপোগ্লাইসেমিয়া?
১৯৫০ সালের শুরু থেকে জীবনানন্দ দাশ ভুগছিলেন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, দুর্বল দৃষ্টি আর ক্রমশ ভাঙা স্বাস্থ্য নিয়ে। প্রতিদিন বিকেলে তিনি হাঁটতে বেরোতেন, চিকিৎসকের পরামর্শে। ইনসুলিন তখনও নেননি, মুখে খাওয়ার ওষুধই ছিল ভরসা।
সমস্যা হল, পঞ্চাশের দশকের চিকিৎসা বিজ্ঞান তখনও খুব প্রাথমিক স্তরে। ইনসুলিন আবিষ্কৃত হলেও মুখে খাওয়ার ওষুধ ছিল দুর্লভ। পশ্চিম জার্মানিতে ১৯৫০ সালে টলবুটামাইড নামে যে ওষুধ বাজারে আসে, সেটিই ছিল সালফোনিল ইউরিয়া শ্রেণির প্রথম ডায়াবেটিস ওষুধ। যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল, ভয়ানক হাইপোগ্লাইসেমিয়া। সহজ কথায়, সুগার ফল করা।
জীবনানন্দ যে ডায়াবেটিসের ওষুধ খেতেন, তা জানা যায় ভূমেন্দ্র গুহর ‘আলেখ্য জীবনানন্দ’ গ্রন্থ থেকে। এর আগে দুর্ঘটনার পর শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে চিকিৎসকরা বলেন, তাঁর “বহুমূত্র রোগ” (ডায়াবেটিস) বেড়ে গেছে, এখন ইনসুলিন লাগবে। মানে এর আগপর্যন্ত তিনি “বড়িটড়ি” খেতেন। এবং সেই বড়িটি যে টলবুটামাইড হতে পারে, তা অনুমান করা অযৌক্তিক নয়।
তখনকার চিকিৎসায় রোগীকে প্রায় অনাহারে রাখা হতো, বিশেষত শর্করা একেবারে বন্ধ করে। এতে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ত, মানসিক ভারসাম্য নষ্ট হতো। জানা যায়, শেষ দিকে জীবনানন্দের স্বাস্থ্য এতটাই ভেঙে গিয়েছিল যে চুল পড়ে টাক হচ্ছিল। শর্করা না পেলে শরীর চর্বি ভাঙতে শুরু করে, তাতে রক্তে জমে কিটো অ্যাসিড, মস্তিষ্কের ভারসাম্য নষ্ট হয়, বিভ্রান্তি দেখা দেয়।
ডায়াবেটিসের ওষুধ, অনাহার, আর দীর্ঘ হাঁটার অভ্যাস—এই তিনের যোগফল কি ১৪ অক্টোবরের বিকেলে তাঁকে বিপজ্জনক হাইপোগ্লাইসেমিয়ার দিকে ঠেলে দেয়নি?
দুর্ঘটনার ঠিক আগে দু’দিন ধরে তাঁর আচরণ অস্বাভাবিক ছিল বলে জানা যায়। ১১ ও ১২ অক্টোবর পরপর দু'দিন নাকি তিনি বিকেলে ভাই অশোকানন্দের বাড়িতে গিয়ে বারবার জানতে চেয়েছিলেন—“দেশপ্রিয় পার্কে কেউ ট্রামের নীচে পড়েছে কিনা?”
এর পরেই, ১৪ অক্টোবর, যখন দু'হাতে চারটি ডাব নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন, তখনই ট্রামের ধাক্কা! তাহলে সবটাই কি পূর্বপরিকল্পিত? কিন্তু পরিকল্পনা করে আত্মহত্যা করতে কেউ কি ডাব হাতে রাস্তায় হাঁটে? নাকি তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল, পা মাটি চিনতে পারেনি, মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিলেন রক্তে শর্করা কমে যাওয়ায়?
দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে ভর্তি হলে চিকিৎসকরা বলেন, রক্ত পরীক্ষা হবে পরেরদিন সকালে। কারণ রাতে তা করার কোনও ব্যবস্থা নেই, এমনকি পিজি হাসপাতালেও না। তাই আজও নিশ্চিত করে বলা যায় না, সেদিন সত্যিই তাঁর হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়েছিল কিনা।
তবু সমস্ত ইঙ্গিতই বলে, জীবনানন্দের শেষ বিকেলটি কেবল এক কবির দুঃখের নয়—বরং এক ডায়াবেটিস রোগীর নিঃশব্দ জৈব সংকটের প্রতিচ্ছবি।
জীবনানন্দ কি মৃত্যু বেছে নিয়েছিলেন, নাকি মৃত্যু তাঁকে বেছে নিয়েছিল এক হাইপোগ্লাইসেমিক বিভ্রান্তির মুহূর্তে? উত্তর জানা নেই। তবে বাংলা সাহিত্যের ও বাঙালির এক অপূরণীয় ক্ষতি নিশ্চিত হয়ে গেছে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় একবার লিখেছিলেন—“এক হেমন্ত রাতে নিয়তিতাড়িত যে ট্রাম রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ের ঘাস চিরে এগিয়ে আসে, সে আজ ইতিহাসযান।”
হয়তো তাই! হয়তো জীবনানন্দের মৃত্যু কেবল এক দুর্ঘটনা নয়, বরং চিকিৎসা ইতিহাসের অনুচ্চারিত একটি ক্লিনিক্যাল রহস্য।