মন্ত্রপাঠ, পূজা আর চিকিৎসার আড়ালে যৌন হেনস্থা, একের পর এক সামনে আসছে গডম্যান কাণ্ড।

প্রতীকী ছবি
শেষ আপডেট: 31 March 2026 20:17
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতের আধ্যাত্মিক জগতের এক অন্ধকার অধ্যায় হল ‘ভণ্ড বাবা’ (Godman Abuse)। বিশ্বাস আর অন্ধভক্তির সুযোগ নিয়ে কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবন ছারখার করে দেওয়া হয়, নাসিকের অশোক খরাতের (Ashok Kharat) ঘটনাটি যেন সেই বীভৎস বাস্তবতাকে আরও একবার আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিল।
নাসিকের তথাকথিত ‘গডম্যান’ অশোক খরাতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল শিউরে ওঠার মতো নয়, বরং তা মানবিকতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে নারীদের ধর্ষণ, অন্তঃসত্ত্বা মহিলার ওপর যৌন নির্যাতন এবং জোরপূর্বক গর্ভপাত করানোর মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমনকি খুনের অভিযোগও উঠেছে তাঁর নামে। তদন্ত শুরু হওয়ার মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যে পুলিশের কাছে ৫০টিরও বেশি ফোন এসেছে, যেখানে মহিলারা যৌন হেনস্থা, তোলাবাজি এবং আপত্তিকর ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ জানিয়েছেন।
কেন এতদিন মুখ খোলেননি নির্যাতিতারা?
প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এত বছর ধরে কেন সবাই চুপ ছিলেন? উত্তরটি লুকিয়ে আছে এই ভণ্ড বাবাদের কাজ করার কৌশলে। এরা মানুষের অসহায়ত্ব এবং কুসংস্কারকে পুঁজি করে এক ধরনের মানসিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি করে। ধর্মের নামে এমন এক পরিবেশ তৈরি করা হয় যেখানে ‘পূর্ণ আত্মসমর্পণ’ ছাড়া আর কোনও পথ থাকে না। ফলে অন্যায়ের শিকার হয়েও অনেকে ভয়ে বা সামাজিক লজ্জায় মুখ খুলতে পারেন না।
ইন্ডিয়া টুডে-র কাছে নিজেদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ‘নিরু’ এবং ‘দীপিকা’ (নাম পরিবর্তিত)। নিরুর কাহিনীর দিকে নজর রাখা যাক। ২০ বছর বয়সে দীর্ঘদিনের অসুস্থতা থেকে মুক্তি পেতে নিরু এক বাবার আশ্রয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে একদিন এক মন্দিরে নিয়ে গিয়ে তাঁর সামনেই অন্য এক মহিলার শ্লীলতাহানি করেন সেই ভণ্ড বাবা। নিরু কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে বাঁচেন। কিন্তু বাড়ি ফিরে যখন তিনি তাঁর মাকে সব জানান, তখন বাড়ির লোকেদের নীরবতা তাঁকে সবচেয়ে বেশি অবাক করেছিল। ১০ বছর কেটে গেলেও আজও সেই স্মৃতি তাঁকে তাড়া করে বেড়ায়, ভিড়ের মধ্যে গেলেই তিনি আতঙ্কে কেঁপে ওঠেন।
দীপিকার অভিজ্ঞতাও ভয়াবহ। ২৯ বছর বয়সে দীপিকার বাবা তাঁকে এক ‘শিষ্য’ বাবার কাছে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসার নামে ঘরের দরজা বন্ধ করে তাঁর শ্লীলতাহানি করা হয়। বাইরে বাবা বসে থাকা সত্ত্বেও সেই ভণ্ড ব্যক্তি কোনও ভয় পায়নি। দীপিকা এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন যে, পরে নিজেকে সুস্থ বলে দাবি করেন যাতে আর কোনওদিন সেখানে যেতে না হয়।
নাসিক মামলার তদন্তে দেখা গেছে, এক নির্যাতিতা দীর্ঘ তিন বছর ধরে এই অত্যাচার সহ্য করেছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্মীয় আচার, দৈব শক্তি এবং ওষুধের মাধ্যমে ওই মহিলাকে মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছিলেন। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বারবার তাঁর ওপর যৌন হামলা চালানো হয়।
নাসিকের অশোক খরাতের মতো ভণ্ড জেল খাটলেও, সমাজে এমন আরও অনেক ‘বাবা’ ঘুরে বেড়াচ্ছেন। তাঁদের আসল শক্তি কোনও অলৌকিক ক্ষমতা নয়, বরং আমাদের অন্ধবিশ্বাস এবং প্রশ্ন না করার অভ্যাস। মানুষ যখনই বিপদ বা অসুখে দিশেহারা হয়, এই ভণ্ডরা সেই সুযোগটাই নেয়। যতক্ষণ আমরা অলৌকিক গল্পের মোহ কাটিয়ে যুক্তি দিয়ে বিচার করতে না শিখব, ততক্ষণ এই শোষণের চক্র চলতেই থাকবে। এই অন্ধকার থেকে বাঁচার একটাই রাস্তা, সেটা হল অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস নিয়ে রুখে দাঁড়ানো।