ভাঙা সম্পর্কই নতুন শুরুর দরজা! দ্বিতীয় ভালবাসায় সুখ খুঁজছে মিলেনিয়াল-জেন জি...

ছবি: দ্য ওয়াল
শেষ আপডেট: 28 March 2026 15:00
'যাকগে ছাড়ো, সব ভাল হয় শেষটা ভাল হলে
একটা দরজা বন্ধ যদি আর একটা ঠিক খোলে...'
ভাঙা আয়নার টুকরোয় নতুন করে নিজের মুখ দেখেছেন কখনও? যখন চারপাশের সবকিছু চুরমার হয়ে যায়, তখন মনে হয় জীবনটা বুঝি ওখানেই শেষ! এক সময় আমাদের সমাজে বিচ্ছেদ বা ডিভোর্স মানেই ছিল একরাশ অন্ধকার আর লোকলজ্জার ভয়। কিন্তু আজ সেই দিন বদলেছে। এখন বিচ্ছেদ মানে কেবল একটা সম্পর্কের শেষ নয়, বরং নিজেকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার একটা শুরু। যেটায় আগের 'ভুল'গুলোকে অনায়াসে 'ঠিক' করে ফেলা যায়।
আজকাল কেউই আর লোকলজ্জার ভয়ে দমবন্ধ করা কোনও সম্পর্কে পচে মরতে রাজি নন। এখনকার মিলেনিয়াল বা জেন-জি তরুণ-তরুণীরা নিজেকে খুশি রাখায় বেশি বিশ্বাসী। তাঁরা বুঝেছে, যে হাতটা ধরলে শান্তি পাওয়া যায় না, সেই হাতটা ছেড়ে দিয়ে একলা হাঁটাই সম্মানের। 'রিবোউন্স' নামের একটি অ্যাপের সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিচ্ছেদের কঠিন পথ পেরিয়ে আসা মানুষগুলো যখন আবার নতুন করে ভালবাসার স্বপ্ন দেখছেন। কেউই থেমে নেই, তাঁদের ফেলে আসা জীবন নিয়ে।

২৭ থেকে ৪০ বছর বয়সি হাজার হাজার মানুষের জীবনের গল্প বলছে, দ্বিতীয়বার ঘর বাঁধার আগে তাঁরা এখন অনেক বেশি সচেতন। প্রত্যেকেই জানেন, ভালবাসা মানে কেবল এক ছাদের নীচে থাকা নয়, বরং একে অপরের সম্মান রক্ষা করা। প্রথম বিয়েতে হয়তো অনেকেই সঙ্গীর অবহেলাকে 'কাজের চাপ' বলে মেনে নিয়েছিলেন। অন্তত সমীক্ষা সেটাই বলছে। অবহেলাকে 'স্বাভাবিক' বলে মেনে নিয়েছিলেন ৪৪ শতাংশ নারী আর ৩২ শতাংশ পুরুষ। কিন্তু আজকের প্রজন্ম মেনে নিতে কিংবা মানিয়ে নিতে নারাজ।
‘মানিয়ে নেওয়া’ই সব নয়!
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালবাসা থাকলেই একটা সংসার টেকে না। টাকা-পয়সা কিংবা একে অপরের প্রতি সম্মান থাকাটাও খুব জরুরি। সঙ্গী যদি কথায় কথায় ছোট করে, ব্যঙ্গ করে বা সমস্ত কথা লুকিয়ে রাখে, তবে সেই সম্পর্কটা প্রায় শেষের পথেই। আগে হয়তো অনেকেই ভাবতেন ‘মানিয়ে নেওয়া’ই সব, কিন্তু আজকের প্রজন্ম আর এসব মুখ বুজে সহ্য করতে রাজি নয়। তারা খুব সহজভাবে বিশ্বাস করে যে, নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে সুখী হওয়া সম্ভব নয়। তাই নিজের শান্তি আর সম্মানকেই তারা এখন সবকিছুর ওপরে রাখছে।
আসলে জীবন তো হার না মানার এক গল্প। তিরিশের কোঠায় থাকা একজন ডিভোর্সি আজ আর সমাজের চোখে 'অভাগা' বা 'বোঝা' নন। বরং তিনি একজন সাহসী ব্যক্তি, যিনি নিজের মূল্য বোঝেন। এই দ্বিতীয় ইনিংস তাই কেবল একটা নতুন বিয়ের গল্প নয়, এটা নিজেকে নতুন করে ভালবাসা। কারণ দিনশেষে, প্রতিটি সূর্যাস্তই তো একটা নতুন ভোরের ইঙ্গিত দেয়।

‘হ্যাপি এন্ডিং’ কতটা জরুরী?
আসলে আমাদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় যে, গল্পের শেষে রাজপুত্র আর রাজকন্যা ‘সুখে শান্তিতে বাস করছে’। কিন্তু জীবন তো আর রূপকথার বই নয় যে, শেষটা সবসময় মনের মতো হবে। তাই প্রশ্নটা থেকেই যায়, ‘হ্যাপি এন্ডিং’ কি সত্যিই খুব জরুরি?
বিশেষজ্ঞরা কিন্তু উত্তরে 'না' বলছেন। কারণ, অনেক সময় একটা তিক্ত সম্পর্কে জোর জবরদস্তিতে ‘হ্যাপি এন্ডিং’ করতে গিয়ে আমরা নিজেদের বর্তমানটাই বিষিয়ে তুলি। নিজেকেই একবার প্রশ্ন করুন, দিনের পর দিন অশান্তি, অবহেলা আর অসম্মান সহ্য করে একটা ভাঙা ঘরকে জোড়া লাগিয়ে রাখাকে কি আদেও আপনি ‘সুখ’ বলবেন?
জীবনের কোনও কোনও মোড়ে ‘এন্ডিং’ বা 'শেষ'টা যদি একটু তেতোও হয়, তাতে ক্ষতি নেই। যদি সেই শেষটা আপনাকে একলা চলার সাহস দেয়, যদি সেই বিচ্ছেদ আপনাকে নতুন করে নিজের প্রতি বিশ্বাস করতে শেখায়, তবে সেটাই আপনার সবথেকে বড় পাওনা। জোর করে টেনে নিয়ে যাওয়া সম্পর্কের চেয়ে সম্মানের সঙ্গে সরে আসা অনেক বেশি জরুরি।
এখানে একটা বিষয় মনে রাখার আছে, জীবন আসলে কোনও সিনেমা নয় যে, ঠিক আড়াই ঘণ্টায় সব 'পারফেক্ট' হয়ে যাবে। কখনও কখনও একটা গল্পের অকাল সমাপ্তিই একটা নতুন এবং সুন্দর শুরুর ইঙ্গিত দেয়। তাই ‘হ্যাপি এন্ডিং’-এর চেয়েও বেশি জরুরি আপনি দিন শেষে কতটা 'হ্যাপি' আছেন, সেটা বোঝা।

'লাইফ ইজ অল অ্যাবাউট সেকেন্ড চান্সেস...'
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনের দ্বিতীয় ইনিংস আসলে কোনও হারা ম্যাচ জেতার লড়াই নয়, বরং নিজের মাঠটাকে নতুন করে চিনে নেওয়ার আরও একটা সুযোগ। দ্বিতীয় ইনিংস কেন সুন্দর হয় জানেন? কারণ এখানে আর অতিরিক্ত আবেগ নেই, আছে নিজেকে বাঁচিয়ে চলা, আর পরিস্থিতি বুঝে চলার একটা চাহিদা। কার জন্য কতটা জায়গা ছাড়তে হয়, কোথায় নিজেকে গুটিয়ে নিতে হয়, সবটাই এখনকার 'ফার্স্ট ইনিংস' খেলে আসা মিলেনিয়াল বা জেন-জি তরুণ-তরুণীরা জানেন।
হয়তো চারপাশ থেকে এখনও কিছু বাঁকা চাউনি গিলে খায়, সমাজ এখনও ফিসফাস করে। কিন্তু তাতে কী? যাঁদের একবার ঘর ভেঙেছে, তাঁরা জানেন কীভাবে দ্বিতীয় ইনিংসে নিজের জীবনটাকে গুছিয়ে নেবেন। তাই হয়তো গানে গানেও উঠে এসেছে সেই একই লাইন-
'নিজেকে ভালবাসো তুমি এবার
নিজেকে ভালবাসো তুমি এবার....'