Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ! মেদিনীপুরের তৃণমূল প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের দাবি বিজেপির‘১৫ বছরের অচলাবস্থা কাটানোর সুবর্ণ সুযোগ!’ নববর্ষের শুভেচ্ছাবার্তায় তৃণমূল সরকারকে তোপ মোদীরঅভিষেক পত্নীকে টার্গেট করছে কমিশন! হোয়াটসঅ্যাপে চলছে নেতাদের হেনস্থার ছক? সরাসরি কমিশনকে চিঠি তৃণমূলেরIPL 2026: আজ আদৌ খেলবেন তো? ‘চোটগ্রস্ত’ বিরাটের অনুশীলনের ভিডিও দেখে ছড়াল উদ্বেগনৌকাডুবিতে ১৫ জনের মৃত্যু, বৃদ্ধার প্রাণ বাঁচাল ইনস্টা রিল, ফোনের নেশাই এনে দিল নতুন জীবন!‘ভূত বাংলা’-তে যিশু সেনগুপ্তর আয় নিয়ে হইচই! ফাঁস হল অঙ্কপদ খোয়ানোর পর এবার নিরাপত্তা! রাঘব চাড্ডার Z+ সুরক্ষা তুলে নিল পাঞ্জাব সরকার, তুঙ্গে জল্পনাফাঁকা স্টেডিয়ামে পিএসএলের আড়ালে ভারতের জ্বালানি সঙ্কট! নকভির ‘যুক্তি’তে হতভম্ব সাংবাদিকভোটের রেজাল্টে পর ফের ডিএ মামলার শুনানি শুনবে সুপ্রিম কোর্ট! ৬০০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, জানাল রাজ্যহরমুজ প্রণালীতে ট্রাম্পের দাপট! মার্কিন যুদ্ধজাহাজের বাধায় ফিরল বিদেশী ট্যাঙ্কার

৪১ বছর পরেও ক্ষত দগদগে, বিষবাতাসে সেদিন ভেসে এসেছিল মৃত্যুদূত, এক রাতেই পাল্টেছিল ভোপালের ভাগ্য

সেই রাতে কেউ ঘুমোতে পারেনি। আর যারা ঘুমিয়ে ছিল, তাদের অনেকেরই ঘুম আর কোনওদিন ভাঙেনি (41 years of bhopal tragedy)।

৪১ বছর পরেও ক্ষত দগদগে, বিষবাতাসে সেদিন ভেসে এসেছিল মৃত্যুদূত, এক রাতেই পাল্টেছিল ভোপালের ভাগ্য

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস

পৃথা ঘোষ

শেষ আপডেট: 3 December 2025 17:59

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ১৯৮৪-র শীতে ভোপালে (Bhopal) সেই রাতটা ছিল একেবারে অন্যরকম - সেই রাতে কেউ ঘুমোতে পারেনি। আর যারা ঘুমিয়ে ছিল, তাদের অনেকেই ঘুম আর কোনওদিন ভাঙেনি। এক রাতেই মৃত্যুদূত নেমে এসেছিল রাস্তায়, ঘরে, উঠোনে -  কেড়ে নিয়েছিল প্রাণবায়ুটুকু (41 years of Bhopal tragedy)।

২ ডিসেম্বর মধ্যরাত পেরনোর পর ভোপাল দেখেছিল এক অদৃশ্য আতঙ্ক। চোখ জ্বালা, গলা জ্বালা, নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, আর তার সঙ্গে একটা তীব্র, জ্বালাময় গন্ধ - যা আগে কখনও কেউ টের পায়নি (deadly gas leak in Bhopal)। পরদিন ভোরে ধোঁয়ার আস্ত পর্দা জাঁকিয়ে বসেছিল গোটা শহরের বুকের ওপর (Bhopal gas tragedy)।

কীটনাশক কারখানা - ভোপালের মৃত্যুফাঁদ (Worst industrial disaster in India's history)

শহরের বুকেই ছিল ইউনিয়ন কার্বাইড ইন্ডিয়া লিমিটেড (Union Carbide India Limited) -এর কীটনাশক কারখানা। বহুদিন ধরেই নিরাপত্তাহীনতা, অব্যবস্থা আর যন্ত্রপাতির জীর্ণ দশা নিয়ে নানা অভিযোগ ছিল। কিন্তু সেই রাতেই ঘটে গিয়েছিল ভয়ঙ্করতম ভুল।

কারখানার এক বিশাল ট্যাঙ্ক, E-610, যেখানে রাখা ছিল মিথাইল আইসোসায়ানেট (Methyl isocyanate - MIC), তাতেই নাকি ঢুকে গিয়েছিল জল। তার ফলে যে রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তা মুহূর্তের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। তীব্র তাপ উৎপন্ন হতে থাকা, আর তার চাপ সামলাতে না পেরে রাত ১২টা ৪০ মিনিট নাগাদ বিকল হয়ে পড়ে সেফটি ভালভ - সেখান থেকেই লেখা শুরু হয় ভোপালের একের পর এক মৃত্যুর দিনলিপি। যখন বোঝা যায়, ঠিক কী সমস্যা হয়েছে, ততক্ষণে অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে। বিশেষ কিছু করার ছিল না।

শহরের ওপর নেমে আসে বিষাক্ত গ্যাসের মেঘ

ট্যাঙ্ক থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাস শহরের বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র কয়েক মিনিটেই সোনাচর চৌক থেকে কমলা পার্ক - প্রাণ বাঁচানোর জন্য চিৎকার, ইতস্তত দৌড়, আর যন্ত্রণার চিহ্ন চারদিকে।

রাস্তার ওপর পড়ে থাকা মানুষের চোখ ঝাপসা, ফুসফুস ফুলে গেছে, শরীর কাঁপছে। অনেকেই বুঝতেও পারেননি কী হচ্ছে।
কেউ ভাবছে ভূমিকম্প হয়েছে, কেউ ভয় পাচ্ছে বোধ হয় যুদ্ধ লেগেছে। বাচ্চাদের কাঁদতে কাঁদতে গলা শুকিয়ে গেছে।
অনেকে ঘর ছেড়ে পালিয়েছে, কিন্তু বিষাক্ত গ্যাস তাদেরও যে রেহাই দিয়েছে, এমন নয়।

হাসপাতালগুলোতে নরকদৃশ্য

ভোরের আলো ফুটতেই ভোপালের হাসপাতালগুলি হয়ে উঠেছিল মৃত্যুর আঁতুড়ঘর। ডাক্তাররা শুরুতে বুঝতেই পারেননি কোন রোগ, কীভাবেই বা চিকিৎসা করতে হবে।

এত মানুষকে একসঙ্গে শ্বাসকষ্টে ছটফট করতে দেখে চিকিৎসকরা অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। কেউ স্যালাইন দিচ্ছে, কেউ চোখ ধুয়ে দিচ্ছে - সবই যেন ব্যর্থতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেই রাতেই হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান। অনেকের মৃত্যু হয় ঘুমের মধ্যেই।

সরকারের দাবি বনাম ঘটনার বাস্তবতা

প্রথমে রাজ্য সরকারের মত ছিল, মৃত্যুর সংখ্যা খুবই কম দেখ, শাসকের চোখে যেন বিপর্যয়টা মাত্র কয়েকশোর ঘটনা। কিন্তু রাস্তা, হাসপাতাল, মর্গ, এমনকি নর্দমায় পড়ে থাকা মৃতদেহের সারি প্রমাণ করছিল মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে ভোপাল।

পরে রাজ্য সরকার হিসেব দেয়, সেই রাতের দুর্ঘটনায় হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, আরও লক্ষাধিক স্থায়ী শারীরিক ক্ষতির শিকার হয়েছেন।

গোপনীয়তা, আতঙ্ক ও কারখানা কর্তৃপক্ষের ভূমিকা

ইউনিয়ন কার্বাইডের কর্মীরা প্রথমে পরিস্থিতি অস্বীকার করেছিল। বলা হয়েছিল, “গ্যাস লিক হয়নি।” গোটা শহর যখন একটুখানি খোলা বাতাসে শ্বাস নেওয়ার জন্য ছটফট করছে, তখনও স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি কোথা থেকে গ্যাস এসেছে, কোন রাসায়নিক ছড়িয়েছে, কীভাবে চিকিৎসা করতে হবে।

MIC-এর বিপদ সম্পর্কে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল, কিন্তু সেগুলি পাত্তা পায়নি।
কিছু পরে জানা যায় অন্য তথ্য। কারখানারই এক কর্মীর কথায়, আগের রাতেই যন্ত্রপাতির সমস্যার কথা রিপোর্ট করা হয়েছিল, কিন্তু বড় কর্তারা গুরুত্ব দেননি।

বেঁচে থাকা মানুষের মুখে সেই অভিশপ্ত রাতের বর্ণনা

ভোপালের মানুষের অভিজ্ঞতা বলে দিচ্ছিল এই যেন জীবনের শেষ যুদ্ধক্ষেত্র। কেউ তখন সবে রাতের শোয়ে সিনেমা দেখে ফিরেছেন, কেউ আবার পরিবার-পরিজন ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়েছিলেন ভোপাল ছেড়ে। কেউ পরিবারকে খুঁজতে এসেছিলেন, পরে সরকারি সূত্র মারফত লাগানো পোস্টার দেখে জানতে পেরেছিলেন তাঁর পরিবারের কেউ ার বেঁচে নেই।

পরবর্তী সময়: মামলা, ক্ষতিপূরণ আর অবহেলার ছায়া

দুর্ঘটনার পর তদন্ত শুরু হয়। নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ - সব ক্ষেত্রেই বিপুল গাফিলতির প্রমাণ মেলে। ইউনিয়ন কার্বাইড কর্তৃপক্ষ বলছিল, “এটা দুর্ঘটনা, কেউ চাইনি এমন হোক।” কিন্তু হাজার হাজার ভোপালবাসীর প্রশ্ন, “যদি কেউ না চেয়েই থাকেন, তাহলে সতর্কতা কোথায় ছিল?” তার কোনও উত্তর মেলেনি।

আজও সেই অভিশাপ থেকে বেরতে পারেনি ভোপাল

আজও বহু মানুষ এর বিষাক্ত পরিণতির বোঝা বয়ে নিয়ে চলেছেন। ৮১ বছরের শকুন্তলা দেবী আজও কারও সাহায্য ছাড়া হাঁটতে পারেন না। কিছুক্ষণ পরপর শ্বাস নিতে না পারার কষ্টে কাশির দমক ওঠে। তাঁর ছেলে প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন, কিন্তু ফোলা, কালো হয়ে যাওয়া পা নিয়ে বেশি হাঁটাচলা করতে পারেন না তিনি।

দ্রৌপদী সাহুর এবং তাঁর দুই সন্তান সেদিন প্রাণে বেঁচে গেলেও অ্যাজমা আর ঝাপসা দৃষ্টিশক্তি তাঁদের সঙ্গী। ৬০ বছরের তারাবাঈ স্বামীকে হারিয়েছেন গ্যাস দুর্ঘটনার প্রকোপে হওয়া পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় বহু বছর ভোগার পর। তিনি নিজেও অ্যাজমাতে ভুগছেন, কোনও সাহায্য ছাড়া হাঁটাচলার ক্ষমতা প্রায় নেই বললেই চলে।

কারও অনেক চেষ্টাতেও দৃষ্টিশক্তি ফেরেনি, কেউ দীর্ঘস্থায়ী মাথা যন্ত্রণা, পেট ফুলে থাকার সমস্যা নিয়ে কোনও রকমে জীবনধারণ করছেন।

ক্ষতিপূরণ, মামলা, রাজনৈতিক চাপ - সব মিলিয়ে ভোপালের গ্যাস ট্র্যাজেডি হয়ে ওঠে ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিল্প-দুর্ঘটনাগুলির মধ্যে একটি। মৃত্যুর মিছিল দেখেছিল ভোপাল, যে অভিশাপ থেকে আজও বেরোতে পারেনি এই শহর।


```