Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
প্রথম পর্বে দেখা হবে না রাম-রাবণের! ‘রামায়ণ’ নিয়ে ভক্তদের মন ভেঙে দিলেন ‘টক্সিক’ যশনববর্ষ উদযাপনের মাঝেও মনখারাপ! দিনের শুরুটা কীভাবে কাটালেন ঋতুপর্ণা?গীতা ও চণ্ডীতে যেভাবে নিজের স্বরূপ প্রকাশ করেছেন ভগবান৭ শতাংশ ফ্যাট, ৫০ শতাংশ পেশি! যে ডায়েট মেনে চলার কারণে রোনাল্ডো এখনও যন্ত্রের মতো সচলগুগল এখন অতীত, AI দেখে ওষুধ খাচ্ছেন মানুষ! বেশিরভাগ রোগ চিনতে না পেরে জটিলতা বাড়াচ্ছে চ্যাটবট 'ডাহা মিথ্যে তথ্য দিয়েছে রাজ্য', সুপ্রিম কোর্টে ডিএ মামলার শুনানি পিছতেই ক্ষুব্ধ ভাস্কর ঘোষBasic Life Support: চলন্ত ট্রেনে ত্রাতা সহযাত্রীই! সিপিআরে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরলেন মহিলামহিলা বিল পেশ হলে রাজ্য অচলের ডাক স্ট্যালিনের, কেন্দ্রের সিদ্ধান্তকে কেন ষড়যন্ত্র বলছে ডিএমকে আজ চ্যাম্পিয়নস লিগের মহারণ! উদ্দীপ্ত এমিরেটসের কতটা ফায়দা নিতে পারবে আর্সেনাল? দ্রুত রোগা হওয়ার ইনজেকশন শেষ করে দিচ্ছে লিভার-কিডনি? ভুয়ো ওষুধ নিয়ে সতর্ক করলেন চিকিৎসকরা

কচ্ছের গ্রামে ৪০০ বছর পুরনো শিল্পের নীরব লড়াই, কী এমন কাজ, যা জানে দেশের মাত্র একটি পরিবার?

কচ্ছের নিরোনা গ্রামের ৪০০ বছর পুরনো শিল্প আজ সংকটে। দেশের একমাত্র পরিবার জানে এই কাজ। বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে যেকোনও দিন।

কচ্ছের গ্রামে ৪০০ বছর পুরনো শিল্পের নীরব লড়াই, কী এমন কাজ, যা জানে দেশের মাত্র একটি পরিবার?

রোগানের কাজে ব্যস্ত শিল্পী

শেষ আপডেট: 28 November 2025 17:45

গার্গী দাস

কচ্ছের সাদা মরুভূমির (White Desert) গা-ছমছমে বিস্তৃতির মাঝে, নিরোনা (Nirona) নামে এক ছোট্ট গ্রাম। জনসংখ্যা ৩০০ ছুঁইছুঁই। মাটির বাড়িগুলোর গা দেখলে গ্রীষ্ণের ঝাঁ ঝাঁ রোদের কথা মনে পড়তে বাধ্য। মাঝে সরু অলিগলি টুক করে নিয়ে চলে যেতে পারে পুরুলিয়ার কোনও ছোট্ট গ্রাম বা বীরভূমে আদিবাসীদের আস্থানায়। আর প্রতিটি মোড় ঘুরলেই চোখে পড়বে শিল্প। ৪০০ বছরের রোগান আর্ট (Rogan Art)।

এই গ্রামটির পরিচিতি বহু শতাব্দীর। শিল্পের হাত ধরেই, সেই পরিচিতিকে জীবন-মরণ লড়াইয়ের মধ্যেও টিকিয়ে রেখেছে 'খাতরি'রা। রোগান আর্ট আজ সমগ্র ভারতের অন্যতম বিরল, জটিল ও বিপন্ন হস্তশিল্প। খাতরি পরিবারের হাতেগোনা সদস্য ছাড়া এ শিল্পকলা আর কেউ জানে না।

শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের জন্ম পারস্যে (Persia)

‘রোগান’ শব্দের উৎস পারস্য ভাষা 'অর্থ, তেল-ভিত্তিক'। ৪০০ বছর আগে পারস্য থেকে এই শিল্প আসে কচ্ছের নিরোনা গ্রামে। এখানকার প্রকৃতি, সংস্কৃতি আর লোকচিত্রে মিশে যায় রোগানের রঙ।

অন্যান্য কাপড়ের শিল্প যেখানে সূচিকর্ম বা বুননকে গুরুত্ব দেয়, সেখানে রোগান সম্পূর্ণ হাতে আঁকা, বিনা স্কেচে, বিনা তুলির ব্যবহারে।

রঙ তৈরি হয় একেবারে নিজস্ব পদ্ধতিতে। ক্যাস্টর অয়েল (Castor Oil) টানা ১২–১৪ ঘণ্টা সেদ্ধ করে জেলির মতো আঠালো করা হয়। তাতে মেশানো হয় প্রাকৃতিক রং, লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, সাদা। আঁকার জন্য ব্যবহৃত হয় না তুলি, ব্যবহৃত হয় একটি ধাতব ছুঁচ (Metal Stylus / Kalam)। শিল্পী ওই ছুঁচকে আঠালো রঙে ডুবিয়ে রঙ সুতোর মতো পাতলা করা হয়। তার পর নামান কাপড়ের ওপর আঙুল, তালু আর হাতের কায়দায় নকশা গড়া হয়।

প্রথমে নকশার অর্ধেক অংশ আঁকা হয়। তার পর কাপড় ভাঁজ করে সেই নকশার নিখুঁত প্রতিচ্ছবি তৈরি করা হয়, যাকে রোগানের মিরর টেকনিক (Mirror Technique) বলা হয়। পরে খালি চোখে প্রায় অসম্ভব সব সূক্ষ্ম ডিটেল হাতে ভরাট করেন শিল্পীরা।

রাজকীয় পোশাক থেকে জাদুঘর, রোগানের পথচলা

একসময় রাজপরিবারের পোশাক, কনের শাড়ি, বিছানার চাদর, এ সবই ছিল রোগানের জায়গা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পটি অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার মুখে।

সস্তা মেশিনের কাপড় বাজার দখল করে নিলে ১৯৮০-র দশকে 'রোগান আর্ট' বাঁচানোর কেউ ছিল না। সেই সময়েই খাতরি পরিবারের আবদুল গফুর খাতরি (Abdul Gafur Khatri) এগিয়ে আসেন। পদ্মশ্রী (Padma Shri), পাঁচটি জাতীয় পুরস্কার (National Awards), আটটি রাজ্য পুরস্কারপ্রাপ্ত গফুর এখন রোগানের প্রাণ। তিনি নিজেই স্বীকার করেন, ১৯৮৪ সালে দাদুর ডাকে মুম্বই থেকে ফিরে না এলে হয়তো আজ রোগান ইতিহাস হয়ে যেত।

এক পরিবারের কাঁধে টিকে থাকা শিল্প

আজ পুরো ভারতে শুধু একটাই পরিবার রোগান নিয়ে কাজ করে, নিরোনার এই খাতরিরা। আট প্রজন্ম ধরে তারা রক্ষক এই শিল্পের। গফুর বলেন, “রোগানের অর্থই তেল (Oil)। এই শিল্প আমাদের গল্প, পরিবেশ, মাটির গন্ধ, সবকিছুর সঙ্গে জড়িত।”

আগে রোগানে কেবল পুরুষরাই কাজ করতেন। এখন খাতরিরা নারী-পুরুষ সবাইকে শেখাচ্ছেন। তাঁর ছেলে, মেয়ে, এমনকি গ্রামবাসীরাও আজ রোগানে দক্ষ। সম্প্রতি রোগান পেয়েছে GI ট্যাগ (Geographical Indication Tag), যা এই শিল্পের পরিচয়কে আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। আর বাড়িয়েছে খাতরি-সহ গোটা নিরোনা গ্রামের মনোবল।



রঙের সেই বিস্ময় দেখায় কী ভাবে?

গফুরের ডেমো দেখলে বোঝা যায় রোগান কতটা কঠিন। হাতে রঙ নিয়ে, ছুঁচে ডুবিয়ে, হাওয়ায় পাক খাইয়ে, কাগজ না ছুঁয়েও সুতোর মতো রঙ কাপড়ে নামান তিনি। পেখম মেলে থাকা ময়ূর (Peacock), গাছ, জ্যামিতিক নকশা, ফুল, লোকচিত্র, কোনওটাই আঁকা নয়, সবটাই হাতের খেলা।

রান উৎসব (Rann Utsav) ও রোগান

এই খাতরিরা ছাড়া রোগানকে যা বাঁচিয়ে রেখেছে, তা হল কচ্ছের মহোৎসব, রান (Rann Utsav)। এই নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, চার মাসের উৎসবে লক্ষ লক্ষ মানুষ আসেন। শিল্পীরা এই সময়ই সারাবছরের আয় করে নেন। ইভোক এক্সপেরিয়েন্সেস-এর সিওও ভাবিক শেঠ বলেছিলেন, “দুনিয়া থেকে মানুষ আসেন। শিল্পীকে সামনে থেকে দেখতে চান। সরাসরি শিল্পীর কাছ থেকে কেনেন। স্থানীয় অর্থনীতির জন্য এটা বড় পাওয়া।”

আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় রোগানের উত্থান

রোগান আজ শুধু গ্রাম বা রাজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। নিউ ইয়র্ক ফ্যাশন উইক (New York Fashion Week) থেকে ওবামাকে রোগান উপহার দেওয়া, সবই এই শিল্পকে পালটেছে ধীরে ধীরে। শাড়ি, ওড়না, স্টোল, ব্যাগ, ওয়াল আর্ট—সব জায়গাতেই রোগান আধুনিক ডিজাইনের সঙ্গে নতুন জায়গা খুঁজে নিচ্ছে।

কেন বাঁচিয়ে রাখতে হবে এই শিল্পকে?

ফাস্ট-ফ্যাশনের যুগে, এক টুকরো রোগান শিল্প ভারতীয় সময়ের স্লো-ব্রিদিং সৌন্দর্য। এখানে প্রতিটি রঙের ছিটেয় আছে শ্রম (Handwork), প্রতিটি নকশায় আছে ঐটিহ্য (Heritage), প্রতিটি ভাঁজে আছে কচ্ছের লোকসংস্কৃতি (Folk Art)।

রোগানের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে-

* স্বীকৃতি (Recognition)
* পর্যাপ্ত পারিশ্রমিক (Fair Wages)
* ডিজাইনের আধুনিকীকরণ (Design Adaptation)
* বাজার সম্প্রসারণের ওপর।

গফুরের কথায়, তাঁরা চেষ্টা করছেন যাতে এই শিল্প যাতে জাদুঘরের বদলে বাড়িতে, পোশাকে, জীবনে জায়গা পায়।

নিরোনার ঘরোয়া উঠোনে তৈরি ইতিহাস

দু’এক কামরার স্টুডিও। দেওয়ালে ঝোলানো রঙিন নকশা। মাঝে টেবিল ভরে রং আর তেলের পাত্র। কিছু দূরে বসে উত্তরাধিকার বানিয়ে চলেছেন গফুর। এক পাশে তাঁর ছেলে, অন্য পাশে গ্রামের মেয়েরা। দেখলে মনে হয় শিল্পের সঙ্গে বেঁচে থাকার, টিকে থাকার এ এক খোলা পাঠশালা।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রোগান আর্ট (Rogan Art) নিরোনার বুকেই বেঁচে আছে, একটা পরিবারের একাগ্রতা, অধ্যবসায় আর শিল্পের প্রতি প্রেমের টানে।

বিশ্বায়নের দৌড়ে অনেক শিল্পই হারিয়ে যায়। তবে নিরোনার খোলা হাওয়া, সূর্যাস্ত, ক্যাস্টর অয়েলের ঘ্রাণে ভাসা উঠোনে রোগান যেন আজও ফিসফিস করে বলে যায়,  “শিল্প বাঁচে, যদি মানুষ তাকে বাঁচিয়ে রাখে।”


```