সেই সময়কার বিয়ের ভিডিও মানেই সিঁদুরদানের মুহূর্তে একটি নির্দিষ্ট গান অবধারিত আশা ভোঁসলের কণ্ঠে সেই চিরন্তন সুর।

শেষ আপডেট: 12 April 2026 16:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো: নব্বইয়ের দশকের বাঙালি বিয়ে মানেই ছিল এক অন্যরকম রোমাঞ্চ। ড্রোন শট, প্রি-ওয়েডিং শ্যুট বা সিনেমাটিক এডিটিংয়ের জমানা তখন ভাবাই যেত না। বিশাল সব ভিডিও ক্যামেরা কাঁধে নিয়ে ভিডিওগ্রাফারদের উপস্থিতিই ছিল আভিজাত্যের লক্ষণ। আর সেই সময়কার বিয়ের ভিডিও মানেই সিঁদুরদানের মুহূর্তে একটি নির্দিষ্ট গান অবধারিত— আশা ভোঁসলের (Asha Bhosle songs) কণ্ঠে সেই চিরন্তন সুর।
“কত না ভাগ্যে আমার, এ জীবন ধন্য হল, সিঁথির এই একটু সিঁদুরে, সবকিছু বদলে গেল। / যে মালাটি কণ্ঠে পেলাম, সে তো নয় শুধু মনিহার। এ আমার পরম পাওয়া, জীবনের সেরা উপহার।…”— এই লাইনগুলো কেবল সিনেমার গান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছিল এক প্রজন্মের আবেগ। নব্বইয়ের দশকে বাঙালি মধ্যবিত্তের বিয়ের অ্যালবামে সিঁদুরদানের দৃশ্য মানেই ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে উঠত এই গান। নতুন জীবনের শুরুতে নববধূর কপালে রাঙা সিঁদুর আর নেপথ্যে আশার দরদী কণ্ঠ— এই মেলবন্ধন যেন বিয়ের মুহূর্তটিকে এক স্বর্গীয় রূপ দিত।
১৯৯০ সালে মুক্তি পেয়েছিল দিলীপ মুখোপাধ্যায় পরিচালিক ছবি ব্যবধান। ছবিটির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন অমল রায় ঘটক। আর গানগুলি লিখেছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। গানের সুর দিয়েছিলেন বিখ্যাত সুরকার অজয় দাস।
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গান লেখার কায়দা ছিল ভারি অদ্ভুত। ছোট ছোট চিরকুটে গানের কথা লিখতেন পুলকবাবু। ব্যবধান ছবির গান লেখা ও সুর দেওয়ার সবটাই হয়েছিল দিলীপ মুখোপাধ্যায়ের লেকপ্লেসের বাড়িতে। যার সাক্ষী ছিলেন অমল রায় ঘটক।

পরে অমরবাবুই জানিয়েছিলেন, “কত না ভাগ্যে আমার—গানটির দৃশ্যায়ন কেমন হবে, নায়িকা মুনমুন সেনকে কীভাবে কোন ফ্রেমে ধরা হবে তা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলে দিচ্ছিলেন দিলীপ মুখোপাধ্যায়। হঠাৎ পুলকদা বললেন, আচ্ছা এটা গানের কথা হলে কেমন হয়?—কত না ভাগ্যে আমার এ জীবন ধন্য হল'। শুনেই প্রযোজক অমর নান বাহ বাহ করে ওঠেন। দিলীপদাও বললেন 'ভাল ভাল। তারপর! পুলকদা পরের লাইন লিখলেন—'সিঁথির এই একটু সিঁদুরে সবকিছু বদলে গেল”। সেদিনই হারমোনিয়ামে বসে গানটিতে সুর দেন সুরকার অজয় দাস।
অমরবাবু আরও জানিয়েছিলেন, “গানটি পুরো তৈরি হয়ে গেলে দিলীপদা চেঁচিয়ে উঠে বলেন, 'ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট ক্লাস!'
'ব্যবধান' ছবির গান রেকর্ডিংয়ের জন্য আশা ভোঁসলের কলকাতায় আসার গল্পও ছিল চমকপ্রদ। বিখ্যাত ইভেন্ট অর্গানাইজার তোচন ঘোষ আশা ভোঁসলের (Asha Bhonsle) সঙ্গে দিলীপ মুখোপাধ্যায় ও অজয় দাসের যোগাযোগ করিয়ে দিয়েছিলেন। তার পর অজয় দাসের সুরে সুখেন দাসের অজস্র ছবিতে সুপারহিট গান গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলে। কিন্তু 'ব্যবধান'-এর গানের জন্য কোনও ক্যাসেট আশা ভোঁসলেকে মুম্বইতে পাঠানো যাচ্ছিল না। কারণ, তাঁর সঙ্গে যোগাযোগই করা যাচ্ছিল না।

যাই হোক কিছুদিন পর কলকাতায় আসেন আশা ভোঁসলে। কলকাতায় এক বেলার জন্য এসে মাত্র কয়েক ঘণ্টায় বেহালার জেমস লং সরণির 'অডিও সাউন্ড স্টুডিও'তে 'ব্যবধান'-এর দুটো গান তুলে রেকর্ড করেন আশা ভোঁসলে। কোনও রিহার্সাল করার সুযোগও ছিল না। স্টুডিওতেই আধ ঘণ্টায় গানটি তুলে রেকর্ড করেন আশা ভোঁসলে। ব্যবধান ছবিতে তাঁর গাওয়া এই গান ছিল সুপার ডুপার হিট।
তবে আশা ভোঁসলের বাংলা উচ্চারণ নিয়ে একটা কাণ্ড ঘটে গেছিল স্টুডিওতে। অমরবাবুই জানান, আশা ভোঁসলেকে বাংলা গানগুলো ইংরাজি হরফে লিখে দিতে হত। বাংলা উনি পড়তে পারতেন না। যে লোকটি গানের কথা ইংরাজিতে লিখেছিলেন তিনি 'বদলে গেল' কথাটি ইংরাজি হরফে লিখেছিলেন 'Badle Gelo'। লেখা উচিত ছিল 'Bodle Gelo’। তাতেই উচ্চারণে বিপত্তি ঘটে যায়। মাত্র আধ ঘণ্টায় তাঁকে দিয়ে 'বদলে গেল' সঠিক উচ্চারণটা করানো যায়নি। রেকর্ডিং-এ ওইটুকু খুঁত থেকে যায়।