Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
হয় গ্রেফতার, নয় কৈফিয়ত! অমীমাংসিত পরোয়ানা নিয়ে কলকাতার থানাগুলোকে নির্দেশ লালবাজারের‘মমতা দুর্নীতিগ্রস্ত! বাংলায় শুধু সিন্ডিকেট চলে, কাজই বেকারের সংখ্যা বাড়ানো’, মালদহে রাহুল‘আমার মতো নয়’! সন্দেহের বশে ৬ বছরের ছেলেকে নদীতে ফেলে খুন, দেহ ভেসে উঠতেই ফাঁস বাবার কীর্তিপেট ঠান্ডা আর হজমে কামাল! গরমে নিয়মিত ঘোল খেলে শরীরে ঠিক কী পরিবর্তন আসে?সাবধান! ২০৫০ সালের মধ্যে ২ কোটি মানুষের লিভার শেষ করবে 'ফ্যাটি লিভার'! ল্যানসেটের গবেষণায় উদ্বেগ বাড়ছে‘মমতাই বিজেপি-কে রাস্তা করে দিয়েছেন, আজ প্রিয়জি থাকলে তিনিই মুখ্যমন্ত্রী হতেন’, রায়গঞ্জের জনসভায় রাহুল'রাবণ হরণ করেছিল সীতাকে, বিজেপি কেড়েছে আপনাদের অধিকার', রাম-রাবণ তত্ত্বে মোদীকে বেনজির আক্রমণ মমতার!মধ্যপ্রদেশে কুকুর বন্ধ্যাত্বকরণ প্রকল্পে দুর্নীতি! ফরমালিনে চোবানো ৭৯৫টি যৌনাঙ্গ উদ্ধার করল পুলিশমাত্র ৪৯৯ টাকায় রাজকীয় থালি! দুই বাংলার সেরা স্বাদ নিয়ে হাজির ‘দ্য ইয়েলো টার্টল’‘জীর্ণ পুরাতন যাক ভেসে যাক’, নতুন বছরে ফিরে আসার শপথ! চেন্নাই-কলকাতা দ্বৈরথে শেষ হাসি হাসবে কে?

উত্তমকুমারই বাংলায় প্রথম গণেশ পুজো শুরু করেন, সতীশ ময়রার লাড্ডু যেত তাঁর পুজোয়

উত্তমকুমার ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন গণেশের বড় ভক্ত। তাঁর এবং সুপ্রিয়াদেবীর সেই গণেশ নিত্যপুজো পেত বাড়িতে। শুধু তাই নয়, দিন শুরু হওয়ার আগে স্নান করে শুচিবস্ত্র পরে প্রতিদিন গণেশ পুজো করতেন মহানায়ক। 

উত্তমকুমারই বাংলায় প্রথম গণেশ পুজো শুরু করেন, সতীশ ময়রার লাড্ডু যেত তাঁর পুজোয়

গ্রাফিক্স -দিব্যেন্দু দাস

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: 27 August 2025 13:34

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

'বন্দ দেব গজানন বিঘ্ন বিনাশন।
নমঃ প্রভু মহাকায় মহেশ নন্দন।।
সর্ববিঘ্ন নাশ হয় তোমার শরণে।
অগ্রেতে তোমার পূজা করিনু যতনে।।' 

বাঙালিরা নাকি হালফিলে নকল করেছে মহারাষ্ট্রের গণেশ চতুর্থী উৎসবকে (Ganesh Chaturthi), এমন কথা হামেশাই শোনা যায়। আসলে গণেশ পুজো বলতে বাঙালির কাছে ছিল পয়লা বৈশাখের হালখাতার উৎসব। মাঘ মাসে গণেশ পুজোর তিথি বাংলা ক্যালেন্ডারে চিরকাল থাকলেও সে পুজো কোনকালেই কোথাও সাড়ম্বরে তো দূর, অনাড়ম্বরেও পালিত হতে দেখা যায়নি। যদিও মহারাষ্ট্রে বরাবরই গণেশ চতুর্থী বাঙালির দুর্গোৎসবের মতোই বড় করে পালন করা হয়। সেই পুজোই হাল আমলে কলকাতা ছাপিয়ে পৌঁছে গিয়েছে গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে। তবে অনেকেই জানেন না, বাংলা তথা কলকাতায় গণেশ চতুর্থীতে প্রথম সাড়ম্বরে পুজো করার প্রথা চালু করেন যিনি, তিনি মহানায়ক উত্তমকুমার (Uttam Kumar Ganesh Puja)। বাঙালির গণেশ চতুর্থীর প্রথম রূপকার তিনিই।

মৃত্যুর ৪৩ বছর পর আজও উত্তমকুমার বাঙালির ম্যাটিনি আইডল। কিন্তু স্টারডমের বাইরে তিনি ছিলেন আদ্যন্ত ঘরোয়া ঠাকুরভক্ত এক মানুষ। উত্তমকুমারের নিজের বাড়ি, অর্থাৎ ভবানীপুরের একান্নবর্তী পরিবারে লক্ষ্মীপুজো বা সরস্বতীপুজো এগুলো বহু বছর ধরে পারিবারিক রীতি অনুযায়ী পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু ময়রা স্ট্রিটে ছিল প্রতিষ্ঠিত গণেশ মূর্তি। ছয়ের দশকে যখন বাঙালি সমাজে গণেশ চতুর্থী একেবারেই অজানা বিষয় ছিল, তখন উত্তমকুমার ময়রা স্ট্রিটের বাড়িতে শুরু করেন গণেশ পুজো। 'ছোটি সি মুলাকাত' ছবি করতে বম্বেতে থাকার সময় মারাঠিদের ধুমধাম করে এই উৎসব পালন করতে দেখেছিলেন তিনি। তারপর থেকেই উত্তমকুমার বাংলায় গণেশ চতুর্থী সাড়ম্বরে করতে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। (Uttam Kumar Ganesh Puja)

উত্তমকুমার ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন গণেশের বড় ভক্ত। তাঁর এবং সুপ্রিয়াদেবীর সেই গণেশ নিত্যপুজো পেত বাড়িতে। শুধু তাই নয়, দিন শুরু হওয়ার আগে স্নান করে শুচিবস্ত্র পরে প্রতিদিন গণেশ পুজো করতেন মহানায়ক। রোজ ফুল-মালা-লাড্ডুর বন্দোবস্ত থাকত তাঁর গণপতির জন্য। মহানায়ক উত্তমকুমার নাকি খিদিরপুরের গার্ডেনরিচ এলাকার সতীশ ময়রার মিষ্টি খেতে বড়ই ভালবাসতেন। তাই তাঁর গণেশ পুজোতে সতীশ ময়রার দোকান থেকেই লাড্ডু যেত।

স্বহস্তে গণেশের গণেশের নিত্যপুজো করতেন মহানায়ক (mahanayak)। পুরোহিত দিয়ে নয়, সকল ব্যস্ততার মাঝেও রোজ নিজেই বসতেন পুজোয়। পুজো সেরে উত্তমকুমার চলে যেতেন ভবানীপুরের বাড়িতে মা চপলা দেবীকে প্রণাম করতে। তারপর যেতেন শ্যুটিংয়ে। এই ছিল উত্তমকুমারের প্রতিদিন সকালের রুটিন।  

গণেশ চতুর্থীর দিন প্রতিষ্ঠিত গণেশকে সমারোহে পুজো করতেন উত্তমকুমার। তবে উত্তম যে গণেশ মূর্তির পুজো করতেন, তাঁর সাজ ছিল পুরোদস্তুর বাঙালিয়ানায় ভরপুর, যাঁর গায়ে সাদা পৈতে, সাদা ধুতি। শোনা যায়, গণপতি বাপ্পার এই সাজ স্বপ্নে দেখেছিলেন মহানায়ক। তাই কোনওভাবেই বম্বের নকল করে মাড়োয়ারি সাজের গণপতি মূর্তি ঘরে আনেননি তিনি।

তাঁর গণেশ চতুর্থীর পুজো ছিল একেবারেই অনন্য। আর সেখানেই উত্তম একেবারে স্বতন্ত্র। নিজের বাঙালি শিকড়, রীতিনীতি তিনি ভুলে যাননি।

গণেশ পুজোর ভোগের আয়োজন ও বহু পদে রান্নার দায়িত্ব সামলাতেন সুপ্রিয়া দেবী (Supriya Devi)। এদেশিদের সমস্ত নিরামিষ রান্না ভোগে দিতেন উত্তমকুমার। ইন্ডাস্ট্রির প্রচুর লোক ও বন্ধুবান্ধবরা আসতেন তাঁর এই পুজোতে। পুজো শেষ হবার পর বসত ঘরোয়া গানের জলসা। বড় বড় শিল্পীরা কতজন গান গেয়েছেন সেই আসরে। বলাবাহুল্য, সেই আসরে মধ্যমণি ছিলেন উত্তমকুমারই। তিনি নিজেও হারমোনিয়াম টেনে একের পর এক রবীন্দ্রনাথের গান গাইতে বসে যেতেন। ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত বাঙালিবাবু মহানায়কই হতেন সেদিনের সেরা আকর্ষণ।

উত্তমকুমারের নিজের ভাইঝি, তরুণ কুমারের মেয়ে ঝিমলি বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, 'জ্যাঠা (উত্তমকুমার) ময়রা স্ট্রিটে গণেশ চতুর্থীর দিন বড় করেই গণেশ পুজো করতেন। আর সব পুজোর আগেই তো গণেশ পুজো করতে হয়। তবে মা-বাবা গেলেও আমি কখনও জ্যাঠার গণেশ পুজোতে যাইনি। আমরা তখন ছোট। তাই বাড়ির বাইরে সব অনুষ্ঠানে আমাদের পাঠানোর খুব একটা চল ছিল না। যদিও আমরা না গেলেও জ্যাঠা সমস্ত ভোগ প্রসাদ আমাদের বাড়ির সবার জন্য পাঠিয়ে দিতেন।

তবে জ্যাঠার এই গণেশ মূর্তি আমি দেখেছি অনেকবার। কারণ অন্য সময় কয়েকবার জ্যাঠা আর সুপ্রিয়াদেবীর ময়রা স্ট্রিটের ফ্ল্যাটে আমি গেছি, মূলত বাবার সঙ্গেই। তখন দেখেছি জ্যাঠা গণেশ মূর্তির নিত্যপুজো করতেন। এই পুজো করার ভক্তি জ্যাঠার মধ্যে চিরকাল ছিল। উত্তমকুমার (Uttam Kumar) আর সুপ্রিয়াদেবী পরে লক্ষ্মীপুজোও শুরু করেন ওখানে। তবে জ্যাঠা আগে নিজের বাড়ির লক্ষ্মীপুজো সেরে তারপর ওখানে যেতেন। জ্যাঠা মারা যাওয়ার পর সুপ্রিয়াদেবী একা আর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো বড় করে করতেন না।

কিন্তু জ্যাঠার গণেশ মূর্তিকে সুপ্রিয়াদেবী চিরকাল নিত্য পুজো করেছেন। ময়রা স্ট্রিটের বাড়ি ছেড়ে দেবার পর অনেকবার বাড়ি বদল করেন সুপ্রিয়াদেবী। মারুতি বিল্ডিং থেকে কতবার বাড়ি পাল্টে শেষমেশ বালিগঞ্জের সরকারি আবাসন। সব জায়গাতেই ওই গণেশ মূর্তিকে নিত্য পুজো করতেন উনি। সেভাবে আর বড় করে করতে না পারলেও সুপ্রিয়াদেবী নিত্য পুজো দিতে কখনও ভোলেননি। জ্যাঠার ইষ্টদেবতাকে সেই সম্মান, শ্রদ্ধা চিরকাল দিয়েছিলেন সুপ্রিয়া দেবী।'

উত্তমকুমার আজ নেই, নেই সুপ্রিয়া দেবী (Supriya Devi), নেই তাঁদের সেই ময়রা স্ট্রিটের বাড়ি। কিন্তু আকাশে-বাতাসে রয়ে গেছে উত্তমকুমারের গণেশ আরাধনার স্মৃতিকথা। কালের স্রোতে সব ঘটনাই মুছে যায়, কমে যায় স্মৃতি টিকিয়ে রাখার মানুষ। তবু বাঙালির গণেশ চতুর্থীর প্রথম সূচনা করেন উত্তমকুমারই।


```