Date : 15th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
হরর নয়, এক ব্যক্তিগত ক্ষতের গল্প—‘দ্য মামি’ নিয়ে মুখ খুললেন পরিচালকনববর্ষে স্মৃতির পাতায় ফিরলেন সাবিত্রী, বললেন—“আগে এত উদযাপন ছিল না”'আইপিএলের বাতিল ক্রিকেটাররাই পিএসএলে আসে!’ বোমা ফাটালেন খোদ পাকিস্তানের প্রাক্তন তারকাহরমুজ বাধা টপকে গুজরাতে ভারতীয় জাহাজ! ট্রাম্পের অবরোধের মাঝেই স্বস্তি ফেরাল ‘জাগ বিক্রম’হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ! মেদিনীপুরের তৃণমূল প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের দাবি বিজেপির‘১৫ বছরের অচলাবস্থা কাটানোর সুবর্ণ সুযোগ!’ নববর্ষের শুভেচ্ছাবার্তায় তৃণমূল সরকারকে তোপ মোদীরঅভিষেক পত্নীকে টার্গেট করছে কমিশন! হোয়াটসঅ্যাপে চলছে নেতাদের হেনস্থার ছক? সরাসরি কমিশনকে চিঠি তৃণমূলেরIPL 2026: আজ আদৌ খেলবেন তো? ‘চোটগ্রস্ত’ বিরাটের অনুশীলনের ভিডিও দেখে ছড়াল উদ্বেগনৌকাডুবিতে ১৫ জনের মৃত্যু, বৃদ্ধার প্রাণ বাঁচাল ইনস্টা রিল, ফোনের নেশাই এনে দিল নতুন জীবন!‘ভূত বাংলা’-তে যিশু সেনগুপ্তর আয় নিয়ে হইচই! ফাঁস হল অঙ্ক

সুচিত্রা সেন তিন দশকেরও বেশি সময় স্বেচ্ছাবন্দি ছিলেন ঘরে! বাধ্যতা নয়, সাধনা ছিল তাঁর

কোনও কিছুই টলাতে পারেনি সুচিত্রার সাধনা। তিনি নিজের চিত্তে অবিচল থেকেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ আর সারদা মায়ের পায়ে মন ফেলে রেখে।

সুচিত্রা সেন তিন দশকেরও বেশি সময় স্বেচ্ছাবন্দি ছিলেন ঘরে! বাধ্যতা নয়, সাধনা ছিল তাঁর

শেষ আপডেট: 17 January 2024 16:13

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

স্বেচ্ছা নির্বাসন একটা সাধনা। একলা থাকা মানেই একাকীত্বে ভোগা নয়, বরং একলা যাপন অনেক সময়েই আরও বৃহত্তর সাধনার পরিচায়ক হয়। মহানায়িকা সুচিত্রা সেন সেই সাধনাতেই ব্রতী ছিলেন। তার জন্য সেসময়ে তাঁকে কম ব্যঙ্গ, কটু কথা, অপমানজনক মন্তব্য শুনতে হয়নি। কেউ বলেছে নিজের বাজার পড়ে যাচ্ছে জেনে নির্বাসন, কেউ বলেছে শ্বেতী হয়ে গেছে, কেউ আবার রটিয়েছে ব্লাড ক্যান্সার হয়েছে ম্যাডামের, তাই স্বেচ্ছা নির্বাসন। কেউ বা বলেছে বিগতযৌবনা নায়িকা হয়ে গেলে সরে যেতেই হয়। কিন্তু এসব কোনও কিছুই টলাতে পারেনি সুচিত্রার সাধনা। তিনি নিজের চিত্তে অবিচল থেকেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ আর সারদা মায়ের পায়ে মন ফেলে রেখে।

তাই সুচিত্রা সেন ৩০ বছর ঘর থেকে না বেরোলেও, তাকে স্বেচ্ছাবন্দিত্ব বা স্বেচ্ছা নির্বাসন বলা যেতে পারে, কোয়ারেন্টাইন কিছুতেই নয়। কারণ কোয়ারেন্টাইন শব্দটির উৎপত্তিতেই লুকিয়ে রয়েছে সংক্রামক রোগের ইতিহাস। প্লেগ থেকে বাঁচতে ভেনিসে চল্লিশ দিন ধরে নোঙর করে রাখা হতো বাইরে থেকে আসা জাহাজ। চল্লিশ অর্থাৎ কোয়ারান্তা এবং সময় অর্থাৎ টিন থেকে এই শব্দের উৎপত্তি। ফলে গৃহবন্দির মরসুমে সুচিত্রা সেনকে নিয়ে লিখলেও, এ কথা প্রথমেই বলে নেওয়া ভাল, যে সুচিত্রা মোটেও 'কোয়ারেন্টাইনে' ছিলেন না।

তাই ইদানীং যে মিম এবং পোস্টারগুলো সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, যে সুচিত্রা সেন নিজেকে ৩০ বছর কোয়ারেন্টাইনে রেখেছিলেন আমরা কেন ২১ দিন পারব না" এই মর্মে, তা সর্বৈব মিথ্যে। সুচিত্রা কিন্তু শুধু নিজেকে ঘরের মধ্য অন্তরাল করেননি, বাইরের জগতের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংশ্রবও ত্যাগ করেছিলেন। অথচ এই সময়ে নিজের মানস জগৎকে আরও উন্মুক্ত করেছিলেন তিনি। এই ধরনের অন্তরীণ হতে  আম-বাঙালি কখনওই পারবে না। তাই সেই স্বেচ্ছা নির্বাসন আর জোর করে পুলিশ নামিয়ে মানুষকে ঘরে রাখা-- এ দুটো আলাদা। সাধনাকে নিয়ে এত লঘু রসিকতা মানায় না। দুটো প্রেক্ষিতও একেবারেই আলাদা।

নির্বাসন ব্রতর প্রথম শর্ত লোভ, মোহ ত্যাগ করা, যা আমরা কেউই প্রায় পারি না। তাই হয়তো এখনও দেশের নানা বাজারে মানুষকে বেরোতে দেখা যাচ্ছে, অতি প্রয়োজন ছাড়াও। নিজেকে ইহজগতের মোহ থেকে মুক্ত করার দীক্ষামন্ত্র সুচিত্রাকে দিয়েছিলেন ভরত মহারাজ। শোনা যায়, ১৯৭৮ সালে 'প্রণয় পাশা' ছবি ফ্লপ করার পরে সুচিত্রা ছুটে গেছিলেন ভরত মহারাজের কাছে। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার 'প্রণয় পাশা' ছবির গল্পটা কিন্তু ভাল ছিল, অনেকটা রেখার 'খুন ভারি মাং' ছবির মতো। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ভিলেন এ ছবিতে। নায়িকা সুচিত্রা। সুচিত্রার চেহারা সে সময়ে একটু ভারী হয়ে গেছিল। তবু খুবই দাপট দেখান নায়িকার চরিত্রে। কিন্তু ছবিটা চলল না। ভেঙে পড়েছিলেন সুচিত্রা। ছুটে যান বেলুড় মঠে গুরু ভরত মহারাজের কাছে। ভরত মহারাজ বলে দেন "মা, লোভ কোরো না"। ওই মন্ত্রই যেন সুচিত্রা নিজের শেষ জীবন অবধি চলার পথে পাথেয় করে নেন। সমস্ত লোভ ত্যাগ করার জন্য ঘরে বন্দি করে ফেলেন নিজেকে।

এই ঘটনার দু'বছর পরে ১৯৮০ সালে সাংবাদিকদের ক্যামেরার চোখ এড়িয়ে মধ্যরাতে মহানায়ক উত্তম কুমারের বাড়িতে একবারই গিয়েছিলেন সুচিত্রা। উত্তমকুমারের নিথর দেহে মালা পরাতে। সে বছরের বইমেলাতেও গেছিলেন তিনি, কিন্তু সুচিত্রা সেন আসার খবর বইমেলায় রটে যাওয়ায় আর থাকেননি। এর পরে ১৯৮২ সালে তাঁকে দেখা যায় কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে। রবীন্দ্র সদনে গোষ্ঠ কুমারের মেকআপে এসেছিলেন সুচিত্রা সেন। কিন্তু আর নয়। এর পরে দক্ষিণেশ্বর বা বেলুড়ে কদাচিৎ গেলেও, তার বাইরে পুরোপুরি ভাবে নিজেকে গৃহবন্দি করে ফেলেন সুচিত্রা সেন। সেখানে যাওয়ার সময়ে দুই নাতনি নয়না (রাইমা) ও হিয়া (রিয়া) সঙ্গে থাকত। মহানায়িকা নিজেকে মুড়ে রাখতেন বোরখায়, কোনও ভাবেই যেন তাঁকে দেখা না যায়। নিজের মুখ রুমাল দিয়ে ঢেকে রাখতেন সর্বদা। খ্যাতির বিড়ম্বনা কী জিনিস, সেটা টের পেয়েছিলেন সুচিত্রা। আর তাই হয়তো সুচিত্রা নিজেও চেয়েছিলেন, এই খ্যাতিকে ওঁর ফিল্ম থেকে অবসর নেবার পরেও জিইয়ে রাখতে। আর সেটা একশো ভাগ পেরেওছিলেন। অন্তরাল হওয়ার বুদ্ধি সুচিত্রাকে দেন কানন দেবীও। শেখান, বাজে ছবি করে যেন অর্জিত সুনাম না নষ্ট করেন সুচিত্রা। এই সময়ে যখন নির্বাচন কমিশন ভোটার কার্ডে ছবি তোলা বাধ্যতামূলক করল, সুচিত্রা সেনও গেলেন ছবি তুলতে। সে খবরও আগের রাতে রটে গেল খবরের কাগজের অফিসগুলোয়। তবে ফ্রেমবন্দি করা সম্ভব হয়নি তাঁকে। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজের সামনের রাস্তায় ভিড় জমাই সার হয়েছিল। তবে ভোট দিতে যাওয়ার সময়ে সমস্যা হয়।

ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজেই সেন পরিবারের ভোট দেওয়ার বুথ। বিভিন্ন কাগজের সাংবাদিকরা আগের দিন রাত থেকে সেখানে ঘাঁটি গেড়ে লুকিয়ে থাকলেন। কেউ আবার ছদ্মবেশে থাকলেন গোপনচারিণীকে ফ্রেমবন্দী করতে। সুচিত্রা তাঁর চেনা প্রিমিয়ার পদ্মিনী গাড়ি থেকে নামতেই শাটার পড়ল কয়েক হাজার। সাদা চিকনের চুড়িদার পরে সুচিত্রা ধরা পড়ে গেলেন দু'দশক পরে। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় তিনি। এলো চুল, চোখে চশমা, চিকনের সাদা চুড়িদার হাত গোটানো... কী অসম্ভব স্মার্ট সেই ৬৫ পেরোনো বৃদ্ধাও!

কতটা সিনেম্যাটিক ভাবুন! যেন একটা সিনেমার প্লট। তিনি ছবি করা ছেড়েছিলেন সেই কবে, আর নয়ের দশকেও তাঁকে একবার দেখবার জন্য এত প্রস্তুতি! এই হেভি ডিমান্ডের কেন্দ্র, টক অফ দি টাউন হয়ে থাকতে হয় কিীভাবে সেই মোহিনীবিদ্যা সুচিত্রা জানতেন। শোনা যায়, তাঁর পরিবারের লোকজনদের কাছে, ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবদের মধ্যেও তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল। কারও বান্ধবী সুচিত্রা, কারও সুচিত্রা পিসি, কারও মা, আম্মা, কারও সুচিত্রা মাসি তিনি। তিনি "মেশো কিন্তু মিশে যেওনা"-তে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই যাদের সঙ্গে মিশতেন, সেখানেও একটা লক্ষ্মণরেখা টেনে রাখতেন। তাই জন্যই শেষ জীবন পর্যন্ত থাকতে পেরেছিলেন অন্তরালে। অথচ না কোনও অবসাদ, না কোনও রোগ, না কোনও বিকার। কেবল অবসর। সুচিত্রা নিজের সেরা সময়টা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। তাই হয়তো সংবাদমাধ্যমগুলোর কৌতূহল কখনও কম পড়েনি তাঁকে নিয়ে। তাঁকে নিয়ে যুগেযুগে গোলটেবিল বৈঠক হয়েছে।

কথায় বলে, যা নিষিদ্ধ, যার সবটা জানা যায় না, তাই নিয়ে কৌতূহল কখনও কমে না। তাই সুচিত্রার এই অন্তরাল যাপন তো শুধু রহস্য নয়, এ তো এত এত হিট গান, সুপার ডুপার হিট ছবি, এত রূপের ছটাকেও বাঁচিয়ে রাখা। যেদিন সুচিত্রা রুপোলি পর্দা থেকে সরে গেলেন, সেদিন থেকেই তাঁর নতুন লড়াই শুরু হয়েছিল। তাঁর সমসাময়িক নায়ক নায়িকারা ভাবতেও পারেন না এমনটা। কিন্তু সেই কঠিন কাজটা সুচিত্রা করে দেখিয়েছেন। তাই তো তিনি বাঙালির গ্রেটা গার্বো। গ্রেটা গার্বো আর সুচিত্রা দু'জনের জীবননাট্য অনেকটাই এক। শরীরে সময়ের পদধ্বনি টের পাচ্ছিলেন তাঁরা৷ তাই নিজেকে সরিয়ে নিলেন লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের বাইরে৷

জীবন যৌবনে গ্রেটা গার্বো অনেক একাকিনী ছিলেন। সুচিত্রা সে অর্থে অতটা একা ছিলেন না। গ্রেটা গার্বোকে এক সময় নিয়মিত হাঁটতে দেখা যেত নিউ ইয়র্কের রাস্তায়৷ সেই ছবি ক্যামেরাবন্দি করার জন্য হুড়োহুড়ি করতেন চিত্রসাংবাদিকরা৷ তবে ব্যক্তিজীবনের বৃত্তে ঢুকে মহানায়িকাকে কেউ উত্ত্যক্ত করতে যাননি৷ দেখেই খুশি হয়েছেন। কিন্তু কলকাতার নিভৃতচারিণীকে নিয়ে রহস্য-কুয়াশা আরও ঘনীভূত হয়েছে৷ সঙ্গে একাধিক প্রজন্মের বেড়া টপকানো মুগ্ধতা তো ছিলই। আজকের টুইটার, ফেসবুক, হোয়াটসআপ,ইনস্টাগ্রাম, শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্সের বাঙালিদের কাছে আজও 'মুখোমুখি বসিবার' জন্য থেকে গেছেন সুচিত্রা সেন৷ এমন দেশটি কোথায় খুঁজে পাবেন গার্বো?

শোনা যায়, সুচিত্রা সেন ছিলেন এমনিতেই 'ভেরি প্রাইভেট পার্সন'। যখন ফিল্মে কাজ করতেন, তখনও তাঁকে সামনাসামনি কম জনই দেখতে পেতেন, শ্যুটিংয়ের বাইরে। নিজের কাজের বাইরে পার্টিও করতেন না তিনি। এড়িয়ে চলতেন মিডিয়া। একবার তথ্য সংস্কৃতি মন্ত্রালয় থেকে চলচ্চিত্রে চুম্বন দৃশ্য দেখানো নিয়ে আলোচনা ওঠে। তখন সবাই বাইট দিলেও, সুচিত্রা সেনকে ফোন করা হলে তিনি বলেন "চুম্বন দেওয়া কি অত সোজা? কিন্তু আমার হয়ে কিছু লিখবেন না।" কিন্তু তবু পরের দিন সংবাদপত্রে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন- সকলের মতামতের সঙ্গে ছিল সুচিত্রা সেন কিছু বলেননি। তাঁর নামটা উল্লেখ করা হয়েছিল তবু।

কিন্তু একটা বড় কৌতূহল থেকে গেছে, বন্দি জীবনে ঠিক কী করতেন সুচিত্রা? সুচিত্রা সেন যে সারাদিন পুজো করতেন ঠাকুরঘরে, এটা একটা মিথ। এমনটা মোটেই নয়, এ কথা বলেছেন তাঁর কন্যা মুনমুন সেনই। রমার নিজের শোয়ার ঘরেই পাশেই ছিল ঠাকুরঘর। ঠাকুর রামকৃষ্ণ, মা সারদা, বিবেকানন্দর ছবি। স্নান সেরে পুজোয় বসতেন তিনি। ঠাকুরকে দেওয়া জিলিপি ছিল রামকৃষ্ণদেবের প্রিয়। পুজো বলতে ধ্যান, আর ঠাকুরের সিংহাসন ফুল দিয়ে সাজানো। কিন্তু তার মানে এই নয় সারাদিন ঠাকুরঘরে পড়ে থাকতেন। বরং ওঁর সময় কাটত ধর্মপুস্তক পড়ে। রীতিমতো ধর্মীয় সাহিত্য নিয়ে চর্চা করতেন। ওঁর বাড়িতে আসতেন বেলুড় মঠের মহারাজরাও। চলত আধ্যাত্মিক আলোচনা। একবার তো দক্ষিণেশ্বরে ভিড়ের মধ্যেই ঘোমটা দিয়ে ভবতারিণী দর্শনে মন্দিরে চলে গেছিলেন। প্রণাম করেন হাঁটু গেড়ে। ততক্ষণে লোক জড়ো হয়ে গেছে। কোনও মতে বেরিয়ে আসেন। বেলুড় যখন বন্ধ থাকত রাতের বেলা জনসাধারণের জন্য, ওঁর বলা থাকত আগে থেকে। রামকৃষ্ণর মন্দিরে গিয়ে একমনে ধ্যান করতেন, তার পরে ভরত মহারাজের সঙ্গে দেখা করে ফিরে আসতেন। ভরত মহারাজ মারা গেলেন যখন সাদা ঢাকাইতে ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢেকে, সানগ্লাস পরে, মেয়ে মুনমুনকে নিয়ে সুচিত্রা নিজে গেছিলেন, শেষ শ্রদ্ধা জানাতে।

রিয়া-রাইমা স্কুল থেকে ফিরে সোজা চলে যেত দিদিমা সুচিত্রার কাছে। তখন তো মুনমুন ছবি করছে টলিউড-সহ সাউথেও। রাইমা-রিয়া তাই সুচিত্রাকেই মা বলে ডাকত। মুনমুনকে মাম কি মাম্মি। নাতনিদের নিয়ে সুচিত্রা বিকেলে যেতেন লাভার্স লেনের ক্লাবে। সঙ্গে থাকতেন কখনও সাংবাদিক বন্ধু। নাতনিদের স্কেচ পেন কিনতে নিয়ে যেতেন থিয়েটার রোড এসি মার্কেটে। লম্বা কালো চুড়িদার বা শাড়ি, কিন্তু মুখ ঢাকা বড় গোগো সানগ্লাস সঙ্গে রুমালে। মানুষের ছেঁকে ধরা এড়াতেই ওঁর এই পন্থা।

বহু উকিল বন্ধু, ডাক্তার বন্ধুর বাড়ি যেতেন যখন তখন তাঁদের সঙ্গে মুখ না ঢেকেই গল্প করতেন। একবার তো তৎকালীন পুলিশ কমিশানার তুষার তালুকদারকে সপরিবারে নিমন্ত্রণ করে নিজের বাড়িতে খাওয়ান সুচিত্রা। এভাবেই নিজের জগতে নিজের পছন্দের লোকদের মাঝে আনন্দে করেই জীবন কাটিয়েছেন সুচিত্রা। যেমন একবার মুনমুনের বান্ধবী হওয়ার সুত্রে অভিনেত্রী আলপনা গোস্বামীকে সুচিত্রা নিজহাতে ফ্রেঞ্চ টোস্ট বানিয়ে খাওয়ান।

সুচিত্রার আগে ছিল প্রাসাদোপম বাড়ি। পুরোটাই ছিল ওঁর রাজত্ব। সেখানে ছবির জগত থেকে অবসর নিলেও ওঁর নিজের বাড়িতে পরিবারের প্রিয় মানুষদের ও ভাই-বোনদের যাতায়াত ছিলই। বাড়ির চারদিকে বড় বড় গাছ, ফুলে ফলে ভরা। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে যেন এক দেখার মতো প্রাসাদ। কিন্তু সে বাড়িও ওঁকে ভাঙতে হল। অত বড় প্রাসাদবাড়ির খরচ অনেক। ফ্ল্যাটে ভাগ হয়ে গেল সম্রাজ্ঞীর জমি। কিছুদিন বাড়ি ভাঙার জন্য বাসা বদলে দেওদার স্ট্রিটের ভাড়া বাড়িতে উঠলেন সুচিত্রা। সে বাড়ির কাছে ওঁর প্রাইভেট সলিসিটরের বাড়ি। প্রাসাদ ভেঙে তৈরি হল 'বেদান্ত' অ্যাপার্টমেন্ট। ফিরলেন ফ্ল্যাটে। সুচিত্রার পরিধি আরও ছোটো হয়ে গেল।

এই সময় থেকেই পুরোপুরি ঘরবন্দি দশা শুরু। কিন্তু রোজই প্রায় বেশি রাতের দিকে পরিচারিকাকে নিয়ে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির মোড় অবধি হেঁটে বেড়াতেন। বলতেন, আমি এ পাড়ার মেমসাহেব। শোনা যায়, অনেক ফ্যানও দাঁড়িয়ে থাকত, কেউ যদি দেখতে পায়। একবার একজনকে তো রাস্তায় ফেলে দেওয়া সিগারেটের প্যাকেটের রাংতা তুলেও তাতে অটোগ্রাফ দিয়েছিলেন কাগজ না থাকায়। বালিগঞ্জ ধাবা থেকে তড়কা রুটিও কিনেছেন কখনও কখনও। যত দিন পেরেছেন হাঁটতে বেরোতেন। তবে শেষ দশ বছর আর বেরোননি। ফ্ল্যাটের আবাসিকরাও কেউ কখনও দেখেনি ওঁকে।

 ওঁর পাশের ফ্ল্যাটই মুনমুনের। মুনমুনের বাড়িতে বন্ধুরা এলেও, সুচিত্রার সাম্রাজ্য ঠিক পাশে থেকেও যেন রহস্যে মোড়া। তবে সুচিত্রার ছোটোবেলার কয়েকজন  বান্ধবী সুচিত্রার বাড়িতে যেতেন। এছাড়া বড়দি, সেজো বোন, ছোট বোন, ভগ্নীপতি, তাঁদের ছেলেমেয়ে- সকলের খুব আপন ছিলেন সুচিত্রা। নিজের জন্মদিন এঁদের নিয়ে কাটাতেন। তৎকালীন রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধী ওঁকে দেখতে হসপিটালে গেলেও দেখা করেন সুচিত্রা একবার। 

বান্ধবীদের সঙ্গে।

সুচিত্রা ছিলেন স্বল্পাহারী। কিন্তু অতিথিদের অনেক পদ খাওয়াতে ভালবাসতেন। সুচিত্রার পছন্দের ছিল খিচুড়ি, যে কোনও কিছু ভাজা। ঘি দিয়ে মাখা গরম গরম ভাতও দলা পাকিয়ে খাইয়ে দিতেন মুনমুন, রাইমা, রিয়াদের। সঙ্গে থাকত স্ম্যাশড পোট্যাটো, একটা মিষ্টি এবং মরসুমি ফল। ছোটো মাছ ছিল ওঁর প্রিয়। বড়দি উমা এলে রাঁধতে বলতেন। জানা যায়, বাড়িতে থাকা পরিচারিকাদের লেখাপড়া শেখাতেন সুচিত্রা। দু'জন যমজ যুবক ছিলেন, ওঁর দেখাশোনা করার জন্য। তাঁরা আবার ওঁর প্লাম্বার, ইলেক্ট্রিক-- সব রকমের কাজ করতেন। মা বলে ডাকতেন সুচিত্রাকে। পাখিদের জল-ছোলা খাওয়ানো ছিল ওঁর একটা প্রিয় কাজ। কত কাক, পায়রা, বদ্রী পাখি রোজ এসে বসত সুচিত্রার বারান্দায়। নিজে হাতে খাওয়াতেন ওঁদের। নিজের কাজ নিজেই করতেন যতদিন পেরেছেন। টুকটাক চিকিৎসাও করে নিতেন ঘরোয়া টোটকায়। মৃত্যুর পরেও যাতে আড়াল বজায় থাকে, তাই তাঁর শেষযাত্রা যাতে সুষ্ঠু ভাবে হতে পারে, সে জন্য মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেও সুচিত্রা দেখা করেছিলেন বলে মনে করেন অনেকে। তাঁর ইচ্ছে মেনেই, শেষযাত্রাতেও কফিনে মুড়ে বের করা হয় সুচিত্রার দেহ। ইচ্ছানুসারে চুল্লিতে নয়, চন্দনকাঠের দাহতে সুচিত্রার দেহ পোড়া ধোঁয়া মিশে যায় আকাশে। না-দেখা, ও না-জানা কৌতূহল নিয়েই তিনি থেকে যান বাঙালির জনমানসে।


```