
বনশ্রী সেনগুপ্ত
শেষ আপডেট: 6 May 2025 16:57
'আজ বিকেলের ডাকে তোমার চিঠি পেলাম' ... এই প্রেমের গানে আজও বাঙালির মনে দখিন হাওয়া খেলে যায়। যে শিল্পীর কন্ঠে এই গান কালজয়ী তিনি বনশ্রী সেনগুপ্ত। আজকাল পুজোর বাংলা গান আর হিট করে না, বেরোয় না 'শারদ অর্ঘ্য', কিন্তু ছয় সাতের দশকে পুজোর আধুনিক বাংলা গানে উল্লেখযোগ্য নাম ছিলেন বনশ্রী সেনগুপ্ত। নয়ের দশকেও প্রতিটি বড় লাইভ জলসায় বনশ্রীর গান থাকবেই থাকবে। কিন্তু কথায় আছে 'শিল্পের জন্য শিল্পী শুধু'। জীবনের শেষ প্রান্তে একাকী জীবন কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন বাংলা গানের বনের রানি।

চুঁচুড়ার মেয়ে ছিলেন বনশ্রী রায়। আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় প্রসিদ্ধ ছিল তাঁদের বাড়ি। কিন্তু সেই বাড়ির মেয়ের গানের প্রতি টান ছোটবেলা থেকেই। ১৯৪৬ সালে ৬ ই মে রায় পরিবারে জন্ম হয় বনশ্রীর। চিকিৎসক পরিবারে বনশ্রীর বাবা ছিলেন সঙ্গীত সাধক। বাবা চেয়েছিলেন মেয়ে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতশিল্পী হবে। কিন্তু মেয়ের ভালবাসা ছিল লঘু সঙ্গীতে।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে পারদর্শী হয়ে উঠলেও, হুগলির বিভিন্ন জলসায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গান গাইতেন বনশ্রী। সন্ধ্যাও ক্লাসিকাল মিউজিক থেকে লঘু সঙ্গীতে এসেছিলেন। বনশ্রীর তখন নিজের গান ছিল না, কিন্তু শ্রোতারা বলত যেন সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের গানই তারা শুনছেন। সন্ধ্যাকন্ঠী বলে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল বনশ্রীর। মেয়ের গর্বে বাবার বুক ভরে উঠত।
কিন্তু বনশ্রীর জীবনে এল বড় আঘাত। হঠাৎ প্রয়াত হলেন বাবা। গানের গুরুকে হারিয়ে চোখে অন্ধকার দেখলেন বনশ্রী। দাদারা বোনের অসহায়তা বুঝলেন। কিন্তু চুঁচুড়া থেকে বড় সঙ্গীত গুরুর কাছে শিক্ষা অসম্ভব। তারজন্য কলকাতা যাওয়া প্রয়োজন।
ঠিক সে সময় বনশ্রীদের পরিবারের সঙ্গে আলাপ হল পুলিশে চাকরি করা শান্তি সেনগুপ্তর। আলাপ থেকে মন বিনিময়। বাড়ির সবার নয়নের মণি শান্তি। ভদ্র সৎ শান্তি সেনগুপ্তর সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেল বনশ্রীর।

'অন্ধকারকে ভয় করি
এসো না তোমার হাত ধরি
দু'জনে যাব, না হয় হারাব
দু চোখে রেখে আলোর প্রহরী...'
এমন বর ভাগ্য মেয়েদের জীবনে সহজে মেলে না! বিয়ের পর যেখানে মেয়েদের গানের জগত শেষ হয়ে যায়, সেখানে বনশ্রীর বর শান্তি সেনগুপ্ত স্ত্রীকে কলকাতার বড় সঙ্গীতগুরুদের কাছে গান শিখতে ভর্তি করে দিলেন। বিখ্যাত সুরকার সুধীন দাশগুপ্তর ছাত্রী হওয়া বনশ্রীর স্বামীর সৌজন্যেই।
তখন জলসার যুগ। বনশ্রীর স্বামী শান্তি বাবু সমস্ত জলসা উদ্যোক্তাদের কাছে নিজের স্ত্রীর গাইবার জন্য নাম সুপারিশ করলেন। কলকাতার সমস্ত জলসায় সুযোগ পেতে লাগলেন বনশ্রী। সুধীন দাশগুপ্ত তাঁকে শিখিয়েছিলেন শুধু সন্ধ্যার গান নয়, পুরুষ শিল্পী হেমন্ত,শ্যামল,ধনঞ্জয়দের গান গেয়ে নিজের সন্ধ্যাকন্ঠী ইমেজ বদলাতে। এক জলসায় বনশ্রীর কন্ঠে নিজের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন স্বয়ং ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। তিনি বনশ্রীকে ডেকে বললেন 'আমার গান তো বেশ গাইলে কিন্তু নিজের গান গাইলে না কেন?' বনশ্রীর জবাব 'দাদা আমার তো নিজের গান নেই!'
ধনঞ্জয় চিঠি লিখে দিলেন এইচএমভির সন্তোষ সেনগুপ্তকে। সেই চিঠিতেই বনশ্রীর জায়গা হয়ে গেল নতুন বাংলা গানে।
সুধীন দাশগুপ্তর সুরে সে সময় আশা ভোঁসলে একের পর এক হিট বাংলা গান গাইছেন। সুধীন দাশগুপ্ত আশার গানগুলো বনশ্রীকে দিয়ে তুলিয়ে রেকর্ড করে বম্বেতে আশাকে পাঠাতেন। সেই বনশ্রীর গান শুনে আশা গান তুলতেন। এমনই চলছিল। একদিন বনশ্রী সুধীন দাশগুপ্তকে বললেন 'দাদা আমার নিজের গান কবে হবে?' ছাত্রীর আবদারে বনশ্রীর জন্য গানে সুর করলেন সুধীন। বের হল বনশ্রী সেনগুপ্ত পুজোর গান। দীর্ঘ ২০ বছর সুধীন দাশগুপ্তর ছাত্রী ছিলেন বনশ্রী।
বনশ্রীর কন্ঠে দুষ্টুমিষ্টি চটুল গান ফুটত ভাল। 'আমার অঙ্গে জ্বলে রংমশাল', 'সুন্দর বনের সুন্দরী গাছ', ' হীরা ফেলে কাঁচ' প্রভৃতি গান বনশ্রীর লিপে সুপারহিট হয়ে গেল। নির্মলা মিশ্র বললেন 'বনশ্রী মানে বনের শ্রী, আজ থেকে ওর নাম ফরেস্ট বিউটি!' সেই থেকে বনশ্রী পেয়ে গেলেন 'ফরেস্ট বিউটি' উপাধি। সঙ্গীত মহলে ওই নামেই তাঁকে সবাই ডাকতেন।
একসময় কলকাতার রাতের রজনীগন্ধা মিস শেফালির নাচে পেশাদার রঙ্গমঞ্চে সব গান বনশ্রী সেনগুপ্ত গাইতেন। শেফালি-বনশ্রী জুটি হয়ে গিয়েছিলেন। ক্যাবারে গান মানেই খারাপ মেয়ের গান এমন ভাবতেন না বনশ্রী। তিনি বলতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কথা। হেমন্ত বনশ্রীকে বলেছিলেন 'গানের কোনও ছোট, বড় হয় না। মান্না দে তো দারা সিংহ-এর গলায় গান গেয়েছেন, কই তাতে তাঁর খ্যাতি কি কিছু কম হয়েছে? আর শিল্পীকে তো ভার্সেটাইল হতেই হবে।' শেফালি শেষ বয়সেও বনশ্রীর সঙ্গে দেখা হলে কান্না ভরা চোখে জড়িয়ে ধরতেন।

তবে বনশ্রী সেনগুপ্তর সিগনেচার গান হল 'আজ বিকেলের ডাকে তোমার চিঠি পেলাম'। বনশ্রী আগের দিন তাঁর গানের এক ভক্তের চিঠি পেয়েছিলেন। সেই ঘটনা থেকেই এই গান তৈরি হয়ে গেল। 'নিমন্ত্রণ', 'আশীর্বাদ', 'হারমোনিয়াম', 'ছুটি', 'অপর্ণা', 'বাবা তারকনাথ' এসব ছবিতে গান গেয়েছিলেন বনশ্রী। তবে বাংলা ছবিতে তাঁর সবথেকে কালজয়ী গান অজয় দাসের কথায় সুরে 'অর্চনা' ছবিতে মাধবী মুখোপাধ্যায়ের লিপে 'দূর আকাশে তোমার সুর'।
'তুমি দাও না আমায় আজ সে প্রেরণা
যেন ব্যথার গগনে আজ দাও সীমানা
আঁধারে তোমারই আলো দাও না জ্বেলে
দাও প্রাণেরও দুয়ার খুলে
এ তরী তোমার কুলে বেঁধে নাও...'
বনশ্রী ও শান্তি সেনগুপ্ত নিঃসন্তান দম্পতি ছিলেন। কিন্তু এই নিয়ে শান্তি বনশ্রীকে কখনও দোষারোপ করেননি। বরং স্ত্রীকে গানে সবরকম সাহায্য করেছেন। বনশ্রীর জীবনে ভগবান ছিলেন তাঁর স্বামী। তাঁদের সংসার যেন দু'জনের ভালবাসার যুগলবন্দী। কিন্তু শান্তি সেনগুপ্তর হঠাৎ প্রয়াণ বনশ্রীর জীবনে বজ্রপাতের মতো ছিল। সন্তানহীন জীবনে একেবারে একলা হয়ে গেলেন বনশ্রী।
![]()
তবু তিনি মনের জোর হারাননি। ফাঁকা বাড়িতে একা থাকতে পারতেন না। তাই ফাংশনে গান গাইতে বেরিয়ে যেতেন। প্রয়াত স্বামীর ছবিকে প্রণাম করে তবেই বনশ্রী বেরোতেন বাইরে গান গাইতে। দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে স্বামীই ছিলেন তাঁর অবলম্বন। সেই জায়গাটাই শূন্য হয়ে গিয়েছিল গায়িকার।
একলা ঘরে কান্নাই ছিল তাঁর সাথী। তিনি কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারেননি স্বামীকে হারানোর যন্ত্রনা। রাত গুলো কাটানোই সবথেকে পীড়াদায়ক ছিল। শেষ জীবনে হার্ট, ফুসফুস, কিডনি রোগে আক্রান্ত হন তিনি। পিজি হাসপাতালে ভর্তি করা হয় শিল্পীকে। মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর কাছের মানুষ ছিলেন বনশ্রী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সঙ্গীত জগতের একটি সম্মানীয় পদেও রেখেছিলেন বনশ্রীকে। সরকারি সাহায্য বনশ্রী পেয়েছিলেন। সারা শরীরে যন্ত্রনা নিয়েও 'এ ব্যথা কী যে ব্যথা, বোঝে কী আনজনে' ডাক্তারদের গেয়ে শোনাতেন রোগশয্যায়। শেষ অবধি ২০১৭ সালে ১৯ ফেব্রুয়ারি সেরিব্রাল অ্যাটাকে প্রয়াত হন বনের রানি বনশ্রী।
বাংলা গানে নির্মলা, আরতি, বনশ্রী, মাধুরী,হৈমন্তী,শিপ্রারা দিদি বোনের মতো ছিলেন। যে কোন জলসায় এক ঝাঁক গায়িকার আড্ডার আসর বসে যেত। বাংলা গানের সেই মহল, সেই প্রাণ আজ আর নেই। বাংলা গানে আধুনিক গানের অস্তিত্ব তাই আর নেই।