
কিশোরকুমার ও রুমা গুহঠাকুরতা
শেষ আপডেট: 4 August 2024 16:44
শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
'হোপ ৮৬' , কলকাতার সাড়া জাগানো অনুষ্ঠানে শেষ দেখা তাঁদের। দুজনের মাঝে বিচ্ছেদ আড়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে ততদিনে, কিন্তু কোনও অনুষ্ঠানে দেখা হলে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়া এমন সম্পর্ক কখনও হয়নি এই তারকা দম্পতির। শোনা যায়, অমিতাভ-জয়ার 'অভিমান' ছবিটি আদতে এই তারকা দম্পতির জীবন যৌবনের গল্প নিয়েই নির্মিত। অভিমানে সঙ্গীতশিল্পী দম্পতি অমিতাভ-জয়ার মিলন হলেও বাস্তব জুটির বিয়ে কিন্তু ভেঙেই গেছিল। সেই তারকা দম্পতির নাম কিশোরকুমার ও রুমা গুহঠাকুরতা। বিচ্ছেদ হলেও তাঁদের যোগাযোগের একমাত্র সুতো ছিল তাঁদের একমাত্র পুত্র অমিতকুমার।
কিশোর-রুমার শেষ দেখা হয়েছিল 'হোপ ৮৬' অনুষ্ঠানে সল্টলেক স্টেডিয়ামে। সেদিন বৃষ্টিমুখর দিন। কিশোর আর ছোট ছেলে সুমিতকুমার এসেছিলেন সেদিন কলকাতায়। সুমিত, কিশোর আর তাঁর চতুর্থ স্ত্রী লীনা চন্দ্রভারকরের সন্তান। লীনা যখন উঠতি নায়িকা তখন বয়সে অনেক বড় কিশোরের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। রুমা প্রথম। তারপর মধুবালা ও যোগিতা বালিকে বিয়ে করেন কিশোর। শেষে লীনা। 'হোপ ৮৬' এ কিশোর রুমা দুজনেই গান গাইতে এসেছিলেন। রুমা তখন ক্যালকাটা ইউথ কয়্যারের প্রাণপ্রতিমা। রুমা কিশোরকে বলেছিলেন "বৃষ্টিতে ভিজছ ঠান্ডা লেগে যাবে।" কিশোরকুমার উত্তরে বলেছিলেন "স্টেডিয়ামে হাজার হাজার মানুষ ভিজছে ওঁদের ঠান্ডা লাগবে না!" রুমা পরে বলেছিলেন "এই একটা কথায় মানুষটাকে অনেক দূর পর্যন্ত চেনা যায়"। হোপ ৮৬ এ সেদিন কিশোরকুমার ও লতা মঙ্গেশকর একসঙ্গে ডুয়েট গেয়েছিলেন কলকাতায় দাঁড়িয়ে।
রুমা কিশোরকুমার কে ডিভোর্স করার পর বিয়ে করেছিলেন অরূপ গুহঠাকুরতাকে। রুমা হয়ে গেলেন বিখ্যাত গুহঠাকুরতা পরিবারের বউ। রুমা-অরূপের এক ছেলে এক মেয়ে শ্রমনা আর অয়ন। অরুপ গুহঠাকুরতা পরিচালক হিসেবে বেশ উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ছবি করেছিলেন, যেমন 'পঞ্চশর' ও 'বেনারসি'। দুটি ছবিই নায়িকা রূপে রুমার জীবনেও উল্লেখযোগ্য। কিন্তু পরিচালক রূপে অরূপ গুহঠাকুরতা সেই মাপের প্রচার পাননি। সত্যজিৎ রায়ের সহকারী হিসেবে 'অপরাজিত' ছবিতেও কাজ করেছেন তিনি।
রুমার দ্বিতীয় সংসারে বেশ কয়েকবার কিশোর কুমার এসেছেন। অমিতকুমার তো আসতেনই। শ্রমনা অয়নের সঙ্গে খুব ভাল সম্পর্ক ছিল কিশোরকুমারের। একবার শ্রমনার বড় অপারেশনের জন্য মেয়েকে নিয়ে বিদেশ যাচ্ছিলেন রুমা। যাবেন মুম্বই হয়ে। মুম্বই পৌঁছতেই কিশোরকুমার শ্রমনাকে দেখতে এলেন। দিলেন মনের জোর একদম বাবার মতোই। অরূপ গুহঠাকুরতা আর কিশোরের পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্কই ছিল।
বহুদিন ভেঙে গেছিল রুমা-কিশোরের সংসার। কিন্তু রুমার দ্বিতীয় সংসারে যখন এল কিশোরকুমারের মৃত্যুর খবর। ভেঙে পড়েছিলেন রুমা গুহঠাকুরতা। প্রথমে একটি সংবাদপত্রের অফিস থেকে খবরটা আসে। উড়ো খবর ভেবে বিশ্বাস করেনি গুহঠাকুরতা পরিবার। কিন্তু তারপরই ফোন করে খবরটা দেন সত্যজিৎ রায়। রায় পরিবারের সঙ্গে রুমার নিবিড় পারিবারিক আত্মীয়তাও ছিল। কী অদ্ভুত সে পরিস্থিতি। রুমা তখন দ্বিতীয় সংসারে সধবার সাজে। হাতে শাঁখাপলা পরনে সাদা লাল পাড় শাড়ি, সিঁথিতে সিঁদুর। কিন্তু বেখেয়ালে সেদিন বড় টিপ পরতে ভুলে যান। আর তখনই এল প্রথম স্বামীর প্রস্থানের খবর। শুনে ছেলে অয়নের সঙ্গে মুম্বই গেছিলেন রুমা।
রুমা-কিশোরের শেষ কথা হয় ফোনে। তখন অমিতের বিয়ে ঠিক হয়ে গেছিল। সেই নিয়েই কিশোর-রুমার কথা হয় টেলিফোনে। ২রা ডিসেম্বর কলকাতাতে কিশোরের আসার কথা ছিল। পুত্রবধূ রিমাকে আশীর্বাদ করতে আসবেন। কিশোর রুমাকে বলেছিলেন "তোমরা যা ঠিক করবে তাই হবে। আমার এখন থেকেই ভাবতে ভাল লাগছে ছেলের বিয়ে হচ্ছে। ঘরে বউ আসবে। নতুন বউ। বৌমা আমার গৌরীকুঞ্জে থাকবে ঘর আলো করে। "
বড় সাধ ছিল ছেলে অমিতের বিয়ে দেবেন কিশোর দাঁড়িয়ে থেকে। কিন্তু ঠিক ঐ ফোনের কদিন পরই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ১৩ অক্টোবর ১৯৮৭ মুম্বইতে প্রয়াত হন কিশোরকুমার।
তখন অমিত ভ্যাঙ্কুরারে প্রোগাম করতে গিয়েছিলেন। বাবা মায়ের কিছু হলে অমিতের টেনশন হত। সে পেল এমন দুঃসংবাদ। তখন মোবাইলের যুগ নয়। বাপ্পি লাহিড়ীর সঙ্গে যোগাযোগ হয় অমিতকুমারের। অমিত বাপ্পিকে বলেন "মা যেন চলে আসেন গৌরীকুঞ্জে!" বাপ্পির বাবা অপরেশ লাহিড়ী সে খবর ফোন করে রুমাকে জানান। রুমা ছুটে যান মুম্বই ছেলের পাশে দাঁড়াতে। রুমা দেবী সেদিন স্বামী হারানোর কষ্টের চেয়েও ছেলের কষ্টটা বেশিমাত্রায় অনুভব করেছিলেন। কারণ কিশোরের সঙ্গে রুমার সুতোটা ছিঁড়ে গেছিল বহু বছর আগেই।
তবে কিশোর-রুমার বৈবাহিক জীবনে ভাঙন এলেও তিক্ততা আসেনি। কখনও কাদা ছোড়াছুড়ি করেননি তাঁরা। সবার কাছেই গঙ্গোপাধ্যায় পরিবার আর গুহঠাকুরতা পরিবার ছিল এক বন্ধুত্বের নিদর্শন। বিয়ে তো শুধু দুটো মানুষের বন্ধন নয়, দুটো পরিবারের বন্ধন। রুমার দ্বিতীয় স্বামীর সংসারে ছেলেমেয়েরা সবসময় কিশোরকুমারের গানের রেকর্ড কিনত। আবার শেষ বয়সে রুমাকে গৌরীকুঞ্জে নিয়ে গিয়েই রেখেছিলেন বড় ছেলে অমিত। সেখানে কিশোরের চতুর্থ স্ত্রী লীনা দেবী নিরন্তর সেবা করেছেন রুমা দেবীর। কে বলবে তাঁরা দুজনে সতীন। লীনার জন্য তো রুমার ঘর ভাঙেনি। রুমা-লীনা মা-মেয়ে দিদি-বোন হয়ে গেছিলেন। শ্রমনা গুহঠাকুরতা বিয়ের পর ব্যাঙ্গালোরে থাকেন তাই মায়ের সেবা করতে পারেননি। তাই শ্রমনা লীনা দেবীর ঋণ সবসময় স্বীকার করেন।
আজকাল ডিভোর্সের হার যে ভাবে বাড়ছে সেখানে রুমা গুহঠাকুরতার জীবনদর্শন শিক্ষনীয়। কিশোরকুমারের মৃত্যুর পর রুমা গুহঠাকুরতা একটি কথা বলেন যা শেখার মতো। রুমা বলেন "আমার দুই সংসারে বন্ধুত্ব ছিল। এটা কিন্তু অবিশ্বাস্য! কেউ ভাবতেই পারেনা। সবাই ভাবে বানিয়ে বানিয়ে বলছি। কারণ এইরকম ঘটনা সচরাচর ঘটেনা। আমার সঙ্গে কবে কিশোরের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। আমি নতুন সংসার পেতেছি। কিশোর নতুন সংসার পেতেছে। তবু আমাদের মধ্যে কী সুন্দর সম্পর্ক ছিল। কারণ আমরা সম্পর্ক তেতো করে শেষ করিনি। ঝগড়া করে একজন, আরেকজনকে ছেড়ে রয়েছি তা নয়। আমাদের মতের মিল যখন হয়নি তখন একদিন দুজনে সমঝোতায় এসেছি। একসঙ্গে থাকা সম্ভব হয়নি বলেই আলাদা হয়েছিলাম। বন্ধুত্ব অমলিন রয়ে গেছে। আমার সঙ্গে অরূপের বিয়ে হবার পরও কিশোর আমাদের কলকাতার বাড়িতে এসেছে।"
কিশোর-রুমা দুজনেই এখন সুরলোকে। তবু ওঁদের প্রেম শাশ্বত। আজ যেমন কিশোরকুমারের জন্মদিন, তেমন বন্ধুত্ব দিবসও, ডিভোর্সের পরও কিশোরকুমার ও রুমা গুহঠাকুরতার সম্পর্কে তিক্ততা আসেনি বরং বন্ধুত্ব বেঁচে ছিল। এমন বন্ধুত্ব আজকের যুগে বিয়ে ভাঙা দম্পতিদের টেক্সট বুক হতে পারে।