নিজের মেয়ে রাণুকে আর আমাকে একই চোখে দেখতেন দাদা। কিন্তু আমার আর হেমন্তদার সম্পর্ক নিয়ে কাদা ছুড়ত কিছু মানুষ। সেসব নোংরামি জীবনে ভুলব না।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 16 June 2025 17:57
কাল ছিল বাবা দিবস। আজ সুরের জাদুকর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন। বাংলা সঙ্গীত জগতের লেজেন্ডারি গায়িকা হৈমন্তী শুক্লা বাবার আসনেই আজও বসান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে। হৈমন্তী কখনও ভোলেন না ১৬ জুন তারিখটা। কারণ আজ যে তাঁর হেমন্তদার জন্মদিন। কিন্তু সারাজীবন হেমন্তদাকে বাবার আসনে বসিয়েও তাঁদের শ্বেতশুভ্র সম্পর্কে এসে পড়ে নানা কালিমা। কিছু মানুষের কটুক্তি কুকথা আজও ভুলতে পারেন না হৈমন্তী শুক্লা। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিনে সুখ-দুঃখের নানা কথা মন উজাড় করে দ্য ওয়াল-এ বলতে বসলেন হৈমন্তী শুক্লা। তাঁর সঙ্গে প্রাণখোলা গল্প করলেন শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।

আজ তো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিন! কী মনে হয় আজকের দিনটা এলে?
১৬ জুন আমি কখনও ভুলি না। হেমন্তদা যখন ছিলেন আমি একটা ধুতি আর মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে দাদার বাড়ি ছুটতাম। প্রতিবার যেতাম। আমার বাবা হরিহর শুক্লা আর হেমন্তদার জন্মদিন আমি ছোটবেলা থেকে মেনে চলছি। আমার মনে দুটো মানুষের ছবি পাশাপাশি আসনে রাখা আছে। আমার গানের ঘরেও হেমন্তদা আর বাবার ছবি পাশাপাশি রাখা আজও। আমি হেমন্তদা বলে ডাকতাম কিন্তু মানুষটাকে বাবার জায়গায় বসিয়েছিলাম। হেমন্তদা যেমন শ্বেতশুভ্র ধুতি-পাঞ্জাবি পরতেন,তেমনই মানুষ হিসেবেও দাদা শ্বেতশুভ্র চরিত্রের ছিলেন। ওঁর মতো পরোপকারী মানুষ দুটো ছিল না। আমি আজও হেমন্তদার জন্মদিনে ওঁর ছবি ফুল মালা দিয়ে সাজিয়েছি। পুরনো কথা মনে পড়ে যায় তো খুব কান্না পেয়ে যায়। সব ভাল মানুষ গুলো চলে গেল আমি একাই পড়ে আছি। গানের জগতের সেই সময়টাকে মিস করি। মনটা খারাপ হয়ে যায়।
আপনার গানের জীবনেও তো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের অবদান অনেক খানি?
হ্যাঁ অবশ্যই। কেরিয়ারের প্রথম দিক থেকেই আমার গানের গলা হেমন্তদা পছন্দ করতেন। তখন আমি লতা মঙ্গেশকরের বাংলা গান গুলো খুব গাইতাম জলসায়। লতাজির বেশিরভাগ গানগুলোই হত হেমন্তদার সুরে। আমায় প্রথম নিজের গান দিলেন সুরকার শৈলেন মুখোপাধ্যায়।
'এতো কান্না নয় আমার, এ যে চোখের জলের মুক্তহার'। এরপর হেমন্তদার সুরে আমার প্রথম গান 'ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁয়ো না' এখনও তো মানুষের মুখেমুখে ফেরে। রবীন্দ্রনাথের গানেও আমায় সুযোগ দেন হেমন্তদা। তরুণ মজুমদারের 'ভালবাসা ভালবাসা' ছবিতে 'তোমার কাছে এ বর মাগী' হেমন্তদা আমাকে জোর করে গাইয়েছিলেন।
এরপর তো কত জায়গাতেই হেমন্তদা আমাকে সুযোগ দিয়েছেন। ঐ উচ্চতায় থেকে মানুষের সঙ্গে ভাল করে কথা বলা, ছোটদের হাত ধরে মিষ্টি করে কথা বলা। মানুষ হবার শিক্ষা আমি হেমন্তদার থেকে পেয়েছি।

পরোপকারী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গল্প বলুন না একটু?
হেমন্তদা প্রতি মাসে খামে করে করে কত পরিবারকে যে টাকা পাঠাতেন তা বলার নয়। দাদার পাঠানো টাকাতেই তাদের সংসার চলত। সব ফাংশনে আমাদের শিল্পীদের তো প্রতিদিন মিষ্টির প্যাকেট দিত। সেইসব খাবার রোজ হেমন্তদা পথে বসে থাকা মানুষদের দিয়ে দিতেন। কখন হেমন্তদা খাবার দিতে আসবেন, সেই মানুষ গুলো অপেক্ষায় বসে থাকতেন।
আরও একটা ঘটনা, তখন আমি প্রচুর ফাংশনে গাইছি। জলপাইগুড়ি কলেজে আমার ফাংশন ছিল। সেদিন সকালে আমার জামাইবাবু মারা গিয়েছেন। তখন আমি জলপাইগুড়ি যাব কী করে! আমি সোজা চলে গেলাম হেমন্তদার বাড়িতে। আমায় দাদা বললেন 'তোকে যেতে হবে না গান গাইতে, তুই আমার বাড়িতে এখন চুপ করে বস'। দাদার দেখভাল করতেন ড্রাইভার সনৎ, তাকে বললেন হৈমন্তীকে চা দাও। দাদা হেমন্ত মুখোপাধ্যায় হয়েও নিজে জলপাইগুড়ি কলেজে ফোন করে বললেন 'আমি হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলছি, হৈমন্তীর বাড়িতে প্রিয়জন মারা গেছেন, তাই আজ হৈমন্তী গান গাইতে যেতে পারবে না'। এত বড় ঘটনা ভুলব জীবনে! এরকম অনেক জায়গায় দাদা আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। আমাকে সন্তান ভেবে করে গিয়েছেন এগুলো দাদা। নিজের মেয়ে রাণুকে আর আমাকে একই চোখে দেখতেন দাদা। কিন্তু আমার আর হেমন্তদার সম্পর্ক নিয়ে কাদা ছুড়ত কিছু মানুষ। সেসব নোংরামি জীবনে ভুলব না।
কী ঘটেছিল আপনার সঙ্গে? কারা বলতেন এমন কুকথা?
এত মিশতাম আমি হেমন্তদার সঙ্গে যে ঠিক বাপ-বেটির মতো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু আমাদের দেশে তো আজেবাজে কথা বলার লোকের অভাব নেই। কুকথা বলা সেসব মানুষদের নামও আজ আমি মুক্তকন্ঠে বলে দিতে পারি। মূল যিনি আমার গায়ে কাদে ছুড়তেন, তিনি হেমন্তদার স্ত্রী বেলা মুখোপাধ্যায়। হেমন্তদার স্ত্রী ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন 'হেমন্ত আর হৈমন্তী, বাবাহ নামেও কী মিল!' আমি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি গেলেই ওঁনার স্ত্রী খুব বিশ্রী ইঙ্গিত করতেন। বেলা মুখোপাধ্যায়ের থেকে ভাল ব্যবহার পাইনি কখনও। হেমন্ত-হৈমন্তীর সম্পর্ক নিয়ে উনি একে ওকে বলে বেড়িয়ে একটা মুখরোচক খবর তৈরি করেছিলেন। বেলা মুখোপাধ্যায় অত্যন্ত রুচিহীন মহিলা ছিলেন। শুধু আমায় নয়, আমার সঙ্গে একদিন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মেয়ে বাসবী হেমন্তদার বাড়ি গিয়েছিল, তার সঙ্গেও খারাপ ব্যবহার করলেন হেমন্তদার স্ত্রী। উনি এত বার হেমন্ত-হৈমন্তীর সম্পর্ক আছে বলতেন সন্দেহ করতেন যাতে হেমন্তদাও বিরক্ত হতেন। উপায় না দেখে আমি একদিন হেমন্তদাকে বললাম 'আপনাকে দাদা বললেও আমি আপনাকে বাবা মানি। আমার বাবাকে আর আপনাকে এক আসনে বসিয়ে আমি পুজো করতে পারি।

বেলা মুখোপাধ্যায়ের ব্যবহারের বিরুদ্ধে হেমন্ত বাবু কী ব্যবস্থা নিয়েছিলেন?
হেমন্তদা বললেন আমাকে 'তুই আমাকে বাবার মতো শ্রদ্ধা করিস সেটা রেকর্ড করে দিয়ে যা বেলাকে শোনাব '।
তখনকার দিনে ছোট্ট টেপ রেকর্ডার পাওয়া যেত তাতে আমি বলেছিলাম 'দাদাকে আমি আমার মাথায় রাখি। দাদার আর আমার বাবার আসন একই জায়গায়। '
এসব কথা বলতে বলতে অঝোরে কাঁদতে লাগলেন হৈমন্তী শুক্লা। স্বনামধন্য শিল্পীকে এভাবে কাঁদতে আমজনতা দেখেনি। পুরনো আঘাত আজও ভুলতে পারেননি গায়িকা

এতখানি পজেসিভ ছিলেন বেলা মুখোপাধ্যায়? নিজেও তো উনি একজন গায়িকা ছিলেন!
এক্ষেত্রে আমি বেলাবৌদিকে পজেশিভ বলব না। উনি চিরকালের রুচিহীন মহিলা। সাংসারিক দিকে হেমন্তদা একদম সুখী ছিলেন না। উনি তো কলকাতার ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন। আর সেটা স্ত্রীর প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে। পরিবার তো বম্বেতে থাকত। হেমন্তদার সঙ্গে কাছ থেকে মিশে আমি বুঝতে পেরেছি। হেমন্তদা খুব চাপা লোক ছিলেন, কাউকে বলতেন না কিন্তু আমি তো ওঁর সন্তানের মতো আমি কষ্টটা বুঝতে পারতাম। হেমন্তদা কলকাতা-বম্বে করতেন। আমি একবার ওঁর কলকাতার ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখি ধুতি-পাঞ্জাবি ছুড়ে ছুড়ে আলমারি থেকে সুটকেসে ফেলছেন। আমি বললাম দাদা এভাবে রাখছেন কেন? তখন বললেন যখন যেটা মনে পড়ে সুটকেসে ফেলে রাখি। কখন কোনটা ভুলে যাব। তখন আমি বলেছিলাম 'বেলাবৌদি এখা নে থাকলে কত আপনার সুবিধে হত!' তখন হেমন্তদা চশমার ফাঁক দিয়ে আমায় দেখে বলেছিলেন 'ওরে ওরা থাকলে আমার অসুবিধে হয়। আমি একা থাকলে ভাল থাকি। উনি খুব আত্মনির্ভর ছিলেন। কারও পরোয়া করতেন না।'
ততক্ষণে কান্নায় গলা ধরে এসছে হৈমন্তী শুক্লার। অপমানের ক্ষত মেটেনি আজও। শেষে বললেন 'আর আমাকে বলিও না, পুরনো কথা ভেবে খুব কষ্ট হয়। কান্না মেশা গলায় ফোন ছাড়লেন হৈমন্তী শুক্লা।
