
বিক্রম স্বস্তিকা
শেষ আপডেট: 24 April 2025 16:32
ছবি: দুর্গাপুর জংশন
চরিত্র চিত্রণে: বিক্রম চট্টোপাধ্যায়, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, একাবলী খান্না
পরিচালনা: অরিন্দম ভট্টাচার্য
প্রযোজনা: অরিন্দম ভট্টাচার্য ও ড্রিমলাইনার এন্টারটেনমেন্ট
দ্য ওয়াল রেটিং: ৭.৫/১০
আমেরিকায় ঘটে যাওয়া এক সত্য অপরাধ কাহিনিকে দুর্গাপুরের প্রেক্ষাপটে নিয়ে আসলেন পরিচালক অরিন্দম ভট্টাচার্য। বাংলা ছবিতে এমন প্লট ছকভাঙা। শুধু তাই নয়, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় ও বিক্রম চট্টোপাধ্যায়ের যৌথ অভিনয়ে এই প্রথম পূর্ণাঙ্গ ছবি। কেমন হল অরিন্দম ভট্টাচার্যের নতুন ছবি 'দুর্গাপুর জংশন'?
দুর্গাপুর শহরে আচমকা একের পর এক চাঞ্চল্যকর মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে থাকে। কারণ অনুসন্ধান করে জানা যায়, সকালে ভিটামিন ওষুধ খেয়ে মারা যাচ্ছেন সকলে। সেইসব ভিটামিন ওষুধ ডাক্তারবাবুরাই রোগীদের খেতে বলেছেন। অথচ সর্ষের মধ্যেই রয়ে গেছে ভূত। ভিটামিনের বিষক্রিয়া। থ্রিলার গল্পের প্লট বলে দেখার আগ্রহ নষ্ট করতে চাই না।
অরিন্দম ভট্টাচার্য ইতিমধ্যে পরপর যে ক’টি ছবি বানিয়েছেন সব ক’টিই থ্রিলার। যদিও পরিচালক আশা জাগিয়ে বললেন, তাঁর পরের ছবির মূল বিষয় ফ্যামিলি ড্রামা হতে চলেছে। দুর্গাপুর জংশন দেখে বোঝা গেল, অরিন্দম পরিচালনায় আরও উন্নত হয়েছেন। স্মার্ট মেকিংয়ে এমন থ্রিলার ছবি পর্দায় দেখতে দুর্দান্ত লাগে। অরিন্দম সত্যজিৎ রায়ের ভক্ত। এ ছবি দেখে সত্যজিৎ রায়ের 'গনশত্রু' ছবির কথাও মনে পড়ছিল।
'দুর্গাপুর জংশন' ছবির প্রথমার্ধ দর্শকদের মন ভরাবে তবে দ্বিতীয়ার্ধে রয়েছে আরও চমক। বিক্রম চট্টোপাধ্যায়কে রাফ অ্যান্ড টাফ পুলিশ অফিসারের চরিত্রে দুর্দান্ত লেগেছে। সারা ছবিতে বিক্রম অসম্ভব নায়কোচিত। নতুন প্রযোজককে সাধুবাদ, তথাকথিত স্টার হিরোদের ছেড়ে বিক্রমের উপর ভরসা করার জন্য। অরিন্দমের যোগ্য পছন্দ বিক্রম। নির্মেদ মোহময় চেহারায় কাঠিন্য জুড়লেও বিক্রমের শরীরে খেলা করেছে যৌনতার চাপা আগুন। যে আগুন সাংবাদিক উষসী ওরফে স্বস্তিকার বিছানায় দাবানল হয়ে গেছে। পুলিশ অফিসার আর সাংবাদিক মহিলার সম্পর্কের পরত যেভাবে ছবিতে খোলে সেই ট্রিটমেন্ট বাংলা ছবিতে বেশ বিরল। হলিউড বা বলিউড থ্রিলার ঘরানায় খেলেছেন অরিন্দম।
স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় প্রত্যাশামতোই আরও একবার মুগ্ধ করলেন। তিনি এখানে নায়িকা হলেও ধূসর চরিত্রে। স্বস্তিকা এ ছবির মক্ষ্মীরানি। ছবির জট যত খোলে, তত বোঝা যায়। স্বস্তিকা-বিক্রমের কিছু যৌথ দৃশ্য দেখে রীতিমত গায়ে কাঁটা দেয়। স্বস্তিকার সেই অভিনয় ভীষণ ধারালো। স্বস্তিকার কিছু সংলাপও মনে রাখার মতো। যেমন, তিনি বলেন, সাংবাদিক হয়ে তাঁর জীবন যেন এক রেলওয়ে জংশন। কত মানুষের সঙ্গে রোজ আলাপ হয়, কথা হয়, আবার তাঁরা হারিয়ে যান। এই জংশনের প্রকৃত অর্থ কী উষসীর কাছে? সেই জট কাটাতেই এই ছবি আরও রহস্যময়।
এ ছবির নগ্নতা মানে শুধু শরীরের নগ্নতা নয়, সমাজের নগ্ন রূপ, মুখোশের আড়ালে নগ্ন মুখও এই ছবির সারসত্য।
গৌরী চরিত্রের স্মার্টনেসে তাঁর আভিজাত্যের ছাপ এ ছবিতেও রেখেছেন একাবলী খান্না। যদিও তাঁকে সেই অর্থে ব্যবহারই করেনি টলিউড। বিদেশিনী বৃদ্ধা ডিসুজার ভূমিকায় শ্রীময়ী মজুমদার নজর কাড়লেন। রাজদীপ সরকার যথাযথ। থ্রিলার ছবিতে প্রদীপ ধরের কমেডি টাইমিং-ও বেশ জমেছে।
দুর্গাপুর জংশনকে পর্দায় আরও স্মার্ট করে তুলেছে রূপম ইসলামের গান। দারুণ ভাবে পর্দায় উপস্থাপন করা হয়েছে। শব্দ প্রয়োগে সৃজন দেবের সঙ্গীত আবহের জন্য ছবিটি আরও নজর কাড়ে। সিনেমাটোগ্রাফিতে প্রসেনজিৎ চৌধুরী দুরন্ত। ছবির শিল্প নির্দেশনাও এই ছবির বড় রসদ। সুজয় দত্ত রায়ের এডিটিং বেশ টানটান।
ছবির শেষটা কিন্তু বেশ চমকপ্রদ। স্বস্তিকার নানা রূপ যেন এই ছবির তুরুপের তাস। তবে এই চিত্রনাট্য সব গেরস্থ বাঙালি কতখানি নিতে পারবে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। কিছু জায়গায় প্লট বেশ অলীক। সেই অলীকেই ছবিটিকে মোহময় করতে চেয়েছেন পরিচালক। করতে কি পারলেন? অন্যধারার থ্রিলার গল্পে চমক পেতে 'দুর্গাপুর জংশন'-এ একবার পৌঁছেই যান।