ছবি- বগলামামা, যুগ যুগ জিও
প্রযোজনা- এসভিএফ
পরিচালনা- ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়
চরিত্রচিত্রণে- খরাজ মুখোপাধ্যায়, রজতাভ দত্ত, অপরাজিতা আঢ্য, কৌশিক সেন, ঋদ্ধি সেন, রেশমি সেন, দিতিপ্রিয়া, সুদীপ
দ্য ওয়াল রেটিং- ৭.৫/১০
শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
কিশোর সাহিত্যের এক স্বল্পচর্চিত চরিত্র বগলামামা। তাঁকে প্রথমবার পর্দায় নিয়ে এলেন পরিচালক ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়। টেনিদা, ঘনাদাদের মতো বগলামামা সেভাবে পরিচিতি পাননি বাংলা সাহিত্যে কিংবা সিনেমায়। রাজকুমার মৈত্রের কলম নিঃসৃত চরিত্র হলেন বগলামামা। সবার ছোটমামা। বগলামামার রূপ তুলির টানে ফুটিয়ে তোলেন নারায়ণ দেবনাথ। এই প্রথমবার রাজকুমার মৈত্রের বগলামামা এলেন পর্দায়। তবে ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বগলামামা ... যুগ যুগ জিও' ছবির টাইটেল কার্ড বা প্রচার বিজ্ঞাপনে কাহিনিকার রাজকুমার মৈত্রর নামটাই নেই। শোনা যাচ্ছে লেখকের নাম যোগ করা হবে খুব শিগগির। লেখকের অন্তরালমোচন খুব দরকার।

রাজকুমার মৈত্রর বগলামামা চরিত্রটিকে যেভাবে এঁকেছিলেন নারায়ণ দেবনাথ, ঠিক সেই ছবিকে সামনে রেখে খরাজ মুখোপাধ্যায়ের লুক অবিকল তৈরী করেছেন পরিচালক। খরাজের ভুড়িওয়ালা চেহারা থেকে হেয়ারস্টাইল, সবটাতেই নারায়ণ দেবনাথকেই অনুসরণ করা হয়েছে। বগলামামা যুগ যুগ জিও কাহিনিকে চলচ্চিত্ররূপ দেওয়া হয়েছে। সোনাদার অ্যাডভেঞ্চারের একাধিক সফল ফ্র্যাঞ্চাইজির পরে ধ্রুব ছোটদের জন্য এই ছবি নিয়ে এসেছেন। এ ছবিতে গুপ্তধন নেই। কিন্তু আছে হারিয়ে যাওয়া নির্মল হাস্যরস আর নিখাদ বাঙালিয়ানা।
আমাদের পরিবারে এমন অনেক চরিত্র থাকে যারা হন সব ব্যাপারে কাঁঠালি কলা। ঠিক সেরকম চরিত্র বগলামামা, বাড়ির সবার ছোটমামা। তাঁর বাবাও ছিলেন বিখ্যাত পালাকার। বগলামুখী দেবীর কাছে মানত করে জন্ম হয় বগলার। বগলা বাবার প্যাশনটা পেলেও সেই দাপুটে অভিনয় ক্ষমতা পায়নি। তাই কোনও নাট্যদলেই বগলার শেষমেষ জায়গা হয় না। মিথ্যাভাষণ দিয়ে বগলা তার চারপাশে এক নক্ষত্র বলয় তৈরি করে রেখেছে। অথচ বাজারে অভিনেতা বলে তাঁর কোনও দাম নেই। একসময় ফ্লপমাস্টার বগলার উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে তাকে গাড়ি থেকে ফেলে দেয় এক নাট্য কোম্পানি।

ঠিক সেই সময় বগলার সাথে দেখা হয় ফেলু আচার্য-র। যে চরিত্রে রূপদান করেছেন রজতাভ দত্ত। ফেলু এলাকার ডন। সে রবীন্দ্রনাথের 'র' জানে না, কিন্তু নাটক মঞ্চস্থ করে জাতে উঠতে চায়। বগলার অভিনয় ছলাকলায় মজে বগলাকেই নাটকের গুরু মানে ফেলু। এদিকে ডন ফেলুর কাছে ভুলচুক করলেই জবাই হতে হয়। তাই ভয়ে বুক দুরুদুরু বগলার প্রাণ। কিন্তু বগলার জোর তার বোনপোরা। বেশিরভাগ বোনপোই পাড়াতুতো। বগলার মতো ফ্লপমাস্টার পারবে কি ফেলু আচার্য র মান রেখে হিট নাটক নামাতে? এটা নিয়েই ছবির গল্প এগোতে থাকে। গল্পের পরতে পরতে রয়েছে অনেক সিরিও কমেডির চমক। তবে সেসব চাক্ষুষ করতে চাইলে বড়পর্দায় দেখতে হবে ছবিটি।
'বগলামামা' ছবির ইতিবাচক দিক যেটা তা হল অভিনয় গুলে খাওয়া এক ঝাঁক অভিনেতা অভিনেত্রীর সমাহার। তাঁরাই ছবিটাকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাঁদের পারফরম্যান্স থেকে চোখ ফেরানো যায় না।
নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন খরাজ মুখোপাধ্যায়। ২০ বছর আগে 'পাতালঘর' ছবিতে প্রথম খরাজ চলচ্চিত্রে গুরুত্বপূর্ণ বড় চরিত্র পেয়েছিলেন। তাঁর লিপে গানও বিখ্যাত হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে টলিউডে শুধুমাত্র ভাঁড় হয়েই তাঁকে থেকে যেতে হয়েছে। বগলামামার চরিত্র এই ছবিতে পুরোপুরি ভাঁড়ের নয়। এখানে সিরিও কমেডি বেশি। কমেডিয়ান হিসেবেই মহাদেবের বেশে বগলামামার ছবিতে রাজকীয় এন্ট্রি হয়। তবে তিনি তখন কাপালিকদের তাড়া খেয়ে পালাচ্ছেন। শেষমেষ বহুরূপী মা কালীর পায়ের তলায় মহাদেব হয়ে শুয়ে বগলামামা কাপালিকদের হাত থেকে নিস্তার পান। এমনই পরের পর মজায় মোড়া এই চরিত্র।

খরাজের কিছু সংলাপ মনে থাকার মতোই। যেমন মেজভাই কৌশিক সেনকে খরাজের ডায়লগ, "মাফলারের থেকে সোয়েটারে উল বেশি থাকে।" কমেডির থেকেও এই ছবিতে নজর কেড়েছে খরাজের সিরিয়াস অভিনয়। যখন সে স্বর্গীয় বাবা-মায়ের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছে আর নিজের অসুন্দর চেহারার জন্য ভেঙে পড়ছে, সেই দৃশ্য দেখলে সত্যিই চোখে জল চলে আসবে। ষাট বছর বয়সে এসে নায়ক চরিত্র পেলেন খরাজ। এতদিন পোস্টারে তাঁর মুখ দেখা যেত না। তিনি যদিও এসবের থেকে অভিনয়টা নিয়েই বেশি ভেবেছেন বরাবর। তবু এতদিন পর তিনিই পোস্টারে। 'বেলাশেষে' থেকেই খরাজ-অপরাজিতা জুটি সুপারহিট। সেই ম্যাজিক এই ছবিতেও কাজে লাগানো হয়েছে।

বগলামামা শুধু খরাজের ছবি নয়। এক ঝাঁক ভাল অভিনেতার অভিনয়ের ফসল এই ছবি। প্রথমেই বলতে হয় ফেলু আচার্য-র ভূমিকায় রজতাভ দত্তর কথা। তিনি এই ছবির তুরুপের তাস। যখনই তিনি পর্দায় এসেছেন, হাসিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে তাঁর মায়ের বন্ডিংও মন ছুঁয়ে যাবে। কৌশিক সেন মেজকাকার রোলে চমৎকার। সে কখনও বগলার প্রেমে প্রতিদ্বন্দ্বী, কখনও বগলার বন্ধু। অপরাজিতা আঢ্য আবার মন জয় করে নিলেন কৃষ্ণা চরিত্রটি করে। তাঁর গল্প ত্রিকোণ প্রেমে বন্দি। বগলামামা খরাজ আর মেজভাই কৌশিক, দুজনের মনের প্রেমিকাই কৃষ্ণা। এই দুজন একা মানুষকেই আগলে রাখে কৃষ্ণা, কিন্তু কাকে শেষে মন দেবে সে? ছোটকাকা বিশ্বনাথ বসু বৈজ্ঞানিকের চরিত্রে দুর্দান্ত। তেমনই তাঁর সংলাপ। রেশমি সেন বাড়ির বিধবা গিন্নির রোলে বেশ সপ্রতিভ অভিনয় করেছেন।

ছবিতে আছে এক ঝাঁক তরুণ প্রতিনিধি। প্রথমেই বলতে হয় যৌবনের দূত ঋদ্ধি সেনের কথা। কেবুর প্রেম দিয়েই ছবি শুরু। বগলামামার যোগ্য সহকারী সে। ছবিতে ঋদ্ধির প্রেমিকার ভূমিকায় রয়েছেন দিতিপ্রিয়া রায়। সে যেন অপরাজিতার উত্তরসূরী। একই ছাঁচে সংসারের ভাবী লক্ষ্মী প্রতিমা। সে শুধু তাঁর প্রেমিককে নয়, হযবরল কেবুর পুরো পরিবারটাকেই সে ভালবাসে। আশির দশকের প্রেম দারুণভাবে ফুটে উঠেছে ঋদ্ধি-দিতিপ্রিয়ার রসায়নে।
আর আছে বগলামামার দলবল। ত্রিদিব, নাড়ু, ধনু, সদন। বিশেষভাবে সাবলীল অভিনয়ে মন কাড়লেন সুদীপ ধাড়া। নবাগত অভিনেতা হিসাবে মন্দার সিরিজে পেদোর চরিত্রে সুদীপ ঐতিহাসিক অভিনয় করেছিলেন। বগলামামাতেও কী সাবলীল তাঁর কমেডি অভিনয়! সঙ্গে যোগ্য সঙ্গতে উজান চট্টোপাধ্যায়, মিঠুন গুপ্ত, জিৎ সুন্দর।
আজকাল তো নির্মল হাস্যরস খুঁজে পাওয়াই বিরল। সবখানেই শুধু দ্ব্যর্থবোধক যৌন কমেডির ইশারা। যা আমাদের জীবনও গ্রাস করেছে। সেই দূষণের মাঝে এই ছবি সত্যি মন ভাল করে।
এবার আসি ছবির কিছু নেতিবাচক দিকে। এই ছবি দেখে তরুণ মজুমদারের 'দাদার কীর্তি', অরবিন্দ মুখোপাধ্যায়ের 'ধন্যি মেয়ে' বা 'পাতালঘর' ছবির কিছু কিছু দৃশ্য মনে পড়বে। কিন্তু ধ্রুব বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'বগলামামা যুগ যুগ জিও' ক্লাসিক হতে গিয়েও হল না। কিছু হাসির দৃশ্য নির্মল, কিন্তু কিছু দৃশ্য যেন পথচারীর কলার খোসায় পা পিছলে গেলে পাড়ার ছেলেদের জোর করে হাসির মতো। কিছু দৃশ্য কেন ঘটছে তার আগেপিছু কারণ-যুক্তি নেই। ছবিটির দৈর্ঘ্য বেশ বেশি হওয়াতে কমেডির বাঁধন আলগা হয়ে গেছে মাঝেমধ্যেই, যা দর্শককে বোর করে দিচ্ছে। ছবিতে খুব দরকারি গল্পও কিছু নেই। কমেডি দৃশ্যর ওপর ছবিটা দাঁড়িয়ে। কিন্তু সেখানেই চিত্রনাট্যে বুনোটের অভাব।
গানগুলি শ্রুতিমধুর, কিন্তু হল থেকে বেরনোর পর মনে থাকে না। পাতালঘরের গান যেমন মনে দাগ কেটেছিল। আজও তার সুর বাজে মনে। বগলামামার গানে ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্ত সেই ছাপ ফেলতে পারেননি।
সৌমিক হালদারের সিনেমাটোগ্রাফি নয়নাভিরাম। দেখতে দারুণ লাগে প্রথম দৃশ্য থেকেই।
ছোটদের, বিশেষ করে কিশোরদের এই ছবি ভাল লাগবে। তারা তো এত যুক্তি খুঁজে সবসময় ছবি দেখে না। সপরিবারে দেখার মতো ছবি দেখতে চাইলে বগলামামা নিরাশ করবে না। দেখলে ঠকবেন না। মনে একটা নির্মল আনন্দের রেশ থাকবে। বিশেষ করে তারকাবিহীন, অথচ শুধুমাত্র বলিষ্ঠ অভিনেতাদের অভিনয় দেখার জন্য এ ছবি আদর্শ।