
অলকনন্দা রায়, সত্যজিৎ রায়
শেষ আপডেট: 24 April 2025 11:30
সত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) প্রথম রঙিন ছবি ছিল ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। মুক্তি পায় রূপবাণী, অরুণা, ভারতী-সহ আরও বহু প্রেক্ষাগৃহে। অথচ ১৯৬২ সালে সত্যজিতের এই ছবি চলচ্চিত্র সমালোচক থেকে দর্শক মহলে একদমই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। প্রায় ৩০ বছর পর দূরদর্শনের আমলে 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' কাল্ট ছবির সম্মান পায়। আজ সত্যজিৎ রায়ের প্রয়াণ দিনে 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' ছবির নায়িকা মনীষা, প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী অলকনন্দা রায় বন্দ্যোপাধ্যায় (Alaknanda Roy Banerjee) সত্যজিতের স্মৃতি তর্পণ করলেন 'দ্য ওয়াল'-এ।
'কাঞ্চনজঙ্ঘা' ছবিতে নায়িকা মনীষার রোলে আপনাকে কীভাবে নির্বাচন করেন সত্যজিৎ রায়?
সত্যজিৎ রায়ের নিজের কাহিনি নিয়ে প্রথম ছবি ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’। এর আগে বিখ্যাত সাহিত্যিকদের কাহিনি নিয়ে উনি ছবি করেছিলেন। সত্যজিৎ রায় চিত্রনাট্য লেখার সময়ই সব চরিত্রগুলির স্কেচ নিজেই করতেন। ওঁর কিছু কাছের বন্ধু ছিলেন, যাঁরা ওই ছবির মতো মানুষ খুঁজে বার করতেন। যাঁদের দেখার চোখকে সত্যজিৎ রায় ভরসা করতে পারতেন। তেমনই মনীষা চরিত্রের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, সাজপোশাক ওঁর আগেই আঁকা ছিল।
আমাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে সত্যজিৎ বাবুর এমনই এক বন্ধু বিজয় চট্টোপাধ্যায় আমাকে দেখেছিলেন। তার পরে তাঁর থেকে ফোন নম্বর জোগাড় করে সত্যজিৎ রায় আমাদের বাড়িতে নিজে এসেছিলেন। মানিকদার সেই আঁকা ছবি আমি দেখিনি। কিন্তু এই কাহিনি আমি মঙ্কু মাসির (সত্যজিৎ রায়ের স্ত্রী বিজয়া রায়) মুখ থেকে শুনেছিলাম। সত্যজিৎ বাবু আমার বাবার অনুমতি নিতে আমাদের বাড়ি এসেছিলেন।
আমাদের বাড়ি ভীষণ রক্ষণশীল ছিল। আমরা তিন বোন ডিনার টেবিলে বসে শুনলাম, বাবা-মা আলোচনা করছেন সত্যজিৎ রায়ের মতো মানুষের প্রস্তাব ভদ্রভাবে কী বলে প্রত্যাখ্যান করা যায়। কিন্তু অনেক অনুরোধ-উপরোধ করে আমার বাবার থেকে ও জ্যাঠামশাইয়ের থেকে অনুমতি আদায় করেন সত্যজিৎ রায়।
আমি তখন ইংরাজি সাহিত্য নিয়ে প্রেসিডেন্সি কলেজে অনার্স পড়ি। কলেজে বেরোব, কিন্তু মানিকদা আমাকেও বসতে বললেন। নানা কথা বলার কারণ এখন বুঝতে পারি। উনি আমার কায়িক অভিনয়টা বুঝতে চাইছিলেন। কী ভাবে হাত নাড়ি, ঘাড় ঘোরাই ইত্যাদি। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র প্রধান চরিত্রে তাই উনি আমাকে দেখে নিচ্ছিলেন। তখন তো মিডিয়ার এত রমরমা ছিল না। আমরা এসব ব্যাপারে অজ্ঞ ছিলাম। তারপর আমি কলেজ চলে গেলাম। তখনকার প্রেসিডেন্সি কলেজে ফোর্থ ইয়ারে পড়ি। বিএ অনার্স পরীক্ষায় অত্যন্ত ভাল রেজাল্ট করেছিলাম। শুধু তাই নয়, মনীষা চরিত্রটিও মানিকদা ছবিতে করে দিলেন, প্রেসিডেন্সিতে ইংরাজি অনার্সের পড়ুয়া হিসেবে। ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র শ্যুটিং অক্টোবর মাসে দার্জিলিঙে হয়েছিল। অক্টোবরেই আমার ১৮ পূর্ণ হল।
মানুষ সত্যজিৎ রায় আপনার কাছে কেমন?
‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ওঁর প্রথম রঙিন ছবি। তাই রং নিয়ে ভীষণ সচেতন ছিলেন। পোশাক কী রঙের হবে, উনি আর বিজয়া রায় আগেভাগে দর্জির দোকানে গিয়ে সব বেছে রেখে দিয়েছিলেন। বম্বেতে হিন্দি ছবিতে তখন এমন সব রং, মনে হত রঙের দাঙ্গা লেগেছে। কিন্তু আর্টিস্ট সত্যজিৎ বাবুর ছবিতে রঙের স্নিগ্ধতা ছিল। উনি আমার মাকে চিঠি লিখলেন 'চৌরঙ্গীতে এক দর্জির কাছে আপনি যদি মেয়ে বুলবুলকে (আমার ডাক নাম) নিয়ে এসে মাপটা দিয়ে যান, ভাল হয়।' এখন তো ফ্যাশন ডিজাইনাররা আলাদা রাজত্ব করেন। কিন্তু তখন সত্যজিৎ রায় নিজেই সব করেছিলেন। এই ব্যক্তিগত যত্ন আমার কাছে অমূল্য।
উনি আমাকে স্ক্রিপ্টটা দেননি। বললেন 'তুমি তো ছাত্রী, তোমার মুখস্থ হয়ে যাবে। আমি সেই অভিনয় চাই না। আমি তোমায় স্ক্রিপ্ট পড়ে শোনাচ্ছি, যাতে তুমি চরিত্রটা বুঝতে পারো।' এমনকী আমার সঙ্গে আমাদের বাড়িতে বসেই উনি স্ক্রিপ্ট রিডিং সেশনও করেছিলেন।
শোনা যায়, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র মনীষা চরিত্র শর্মিলা ঠাকুর ফিরিয়ে দেওয়ার পর আপনার কাছে অফার আসে? সত্যি নাকি?
একেবারেই ভুল তথ্য। উইকিপিডিয়ার কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। সত্যজিৎ রায়ের মুখের কথাই শেষ কথা। উনি যখন আমাদের বাড়ি এলেন, আমার বাবা ওঁকে বলেছিলেন 'আপনার সৌমিত্র-শর্মিলার জুটি থাকতে আপনি আবার কেন নতুন মুখের জুটি খুঁজছেন?' মানিকদা ভীষণ ভাবেই আমায় চেয়েছিলেন। উনি বলেছিলেন, 'না আমি নতুন মুখ চাইছি। আর সৌমিত্রও কিন্তু এই ছবিতে থাকছেন না।' শর্মিলার কথা মঙ্কু মাসিও লেখেননি। 'আমাদের কথা'-তে পরিষ্কার লিখেছেন, মনীষার চরিত্রে মানিক একটা অন্যরকম চেহারা চাইছিল।
পরবর্তীকালে সৌমিত্রদাও আমায় বলেছেন, 'মানিকদা তো ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র স্ক্রিপ্ট প্রথমে আমাকে শুনিয়েছিলেন। আমি লাফাচ্ছিলাম করব বলে। কিন্তু মানিকদা বললেন, না এই চরিত্রে তোমায় নেওয়া যাবে না। তখন নতুন মুখ অরুণ মুখোপাধ্যায় এলেন। মুশকিল হচ্ছে, উইকিপিডিয়াতে দেওয়ার ফলে আমাকে নানা জায়গায় এই প্রশ্ন শুনতে হয়। আজ বললাম এই তথ্য সম্পূর্ণ ভুল। কে দিয়েছেন জানি না। এটা তো সত্যি নয়।
সত্যজিতের নায়িকা হয়েও দীর্ঘ সময় চলচ্চিত্র দুনিয়ার থেকে সরে থাকলেন কেন? ছয়-সাতের দশক থেকে আর ছবিতে আপনাকে দেখা গেল না কেন?
‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র পর প্রচুর ছবির অফার এসেছিল। কিন্তু ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’র জন্য আমার বাবা আর জ্যাঠামশাই যখন রাজি হলেন, তখন তাঁরা সত্যজিৎ রায়ের উপর কিছু শর্ত আরোপ করেছিলেন। প্রথম ছিল, অন্য কাউকে আমার ফোন নম্বর দেওয়া যাবে না, অলকনন্দাকে আর দ্বিতীয় কোনও আগামী ছবিতে ডাকা যাবে না, কোনও ফিল্মি ম্যাগাজিনে আমার ছবি ছাপা যাবে না, ফিল্মি রাত পার্টিতে আমায় ডাকা যাবে না। সে কারণেই সত্যজিৎ রায় আর কখনও আমায় ডাকেননি।
অলকনন্দার বড় জ্যোঠামশাই প্রমোদনাথ (পি এন) রায় ছিলেন বম্বে টকিজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। বম্বে টকিজের প্রাণপুরুষ হিমাংশু রায় ছিলেন তাঁর মামাতো ভাই। অভিনেতা কুমুদলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘অশোক কুমার’ নামটি প্রমোদনাথেরই দেওয়া। অন্য দিকে, আপনার দুই মাসি সাধনা রায়চৌধুরী এবং নিবেদিতা দাস ছিলেন নাট্যকর্মী। আর এক মাসি বিনতা রায় ছিলেন ‘উদয়ের পথে’ ছবির নায়িকা। এমন বাড়িতে সিনেমা নিয়ে এত কঠোরতা কেন? এইসব শর্ত আরোপ কেন?
সেই জন্যই হয়তো ছিল। চিত্রজগতের অন্ধকার দিকগুলো এঁদের জানা ছিল বলেই বাড়ির মেয়েকে করতে দেননি। তখন আমার বাবা মত দিলেই হত না, বড় জ্যাঠামশাই মারা গেছেন। তাই মেজো জ্যাঠামশাইয়ের অনুমতি লাগবে। তিনি তখন পক্ষাঘাতে শয্যাশায়ী। ওঁর অনুমতি নিতে বাবা গাড়ি চালিয়ে সত্যজিৎ রায়কে জ্যাঠামশাইয়ের বাড়িতেও নিয়ে গিয়েছিলেন। আমার মেয়ে আমি বুঝে নেব, তখন এই ব্যাপার ছিল না। মানিকদা দু'জনকেই নানা যুক্তি দিয়ে রাজি করান।
ছবি না করার আরও কারণ হল, তার পরের বছর আমার বিয়ে হয়ে যায়। অসম্ভব রক্ষণশীল ছিলেন তাঁরাও। এমনকী তাঁরা তো অভিনেত্রী বলে আমার পরিচয়টাই লোকসমাজে দিতে চাইতেন না। সত্যজিতের ছবির নায়িকা হয়েও, আমার অভিনেত্রী পরিচয় শ্বশুরবাড়ির লোকের সম্মানহানির কারণ ছিল। আমার সিনেমার সমস্ত ফাইলপত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছিল। তাঁরা বলতেন, লোকে বলবে বউয়ের ফিল্মের টাকায় শ্বশুর বাড়ি-গাড়ি করেছে। আমার স্বামী বিরাট চাকরি করতেন, কিন্তু বাবার মুখের উপরে কথা বলার মানুষ উনি ছিলেন না।
তবে এগুলো সব যে আমার অজান্তে বা অমতে হয়েছে তাও নয়। আমি নায়িকা হতেও চাইনি। আমার স্বপ্ন ছিল ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক হওয়া। বিয়ের পরে অত্যন্ত ভাল ফল করে এমএ পাশ করেছিলাম। বিদেশে যাবার স্কলারশিপ পেয়েছিলাম আমি। কিন্তু আমার পরপর ছেলেমেয়ে হয়ে গেল বলে আর হল না সেসব। পড়াশোনার জন্য শ্বশুরবাড়ি থেকে বাধা আসেনি। আমি অধ্যাপনা করলেও হয়তো তাঁরা বাধা দিতেন না। কিন্তু আমি নিজেই তো সংসারে জড়িয়ে গেলাম। তবে আমি অভিনয়ে ফিরতেই চাইনি। পিএইচডি করতেও আমি শুরু করেছিলাম। ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে গিয়ে পাতার পর পাতা হাতে লিখে কপি করে আমি রিসার্চ পেপার বানাতাম। আমার তাই নিয়েও আক্ষেপ নেই। সংসার করলেও মনপ্রাণ ঢেলে করেছি। দীর্ঘকাল শিশু ও বৃদ্ধদের আমি দেখাশোনা করেছি।
পরে বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর 'ফেরা' ছবি দিয়ে বহু যুগ পর তো আপনার কামব্যাক হল?
'ফেরা'টাও অ্যাক্সিডেন্টালি। তখন শ্বশুরবাড়িতে মাথার ওপর আর কেউ ছিলেন না। স্বামী ব্যস্ত, ছেলেমেয়ে বড় হয়ে গেছে, আমি নিজের একটা জগত খুঁজছিলাম। তাই 'সিগাল বুকস'-এ যুক্ত হই। ইংরাজি পত্রিকা এডিট করতাম। সেখানেই বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর 'আন্ধি গলি' ছবির চিত্রনাট্য বই হওয়ার কথা হয়। ছবিতে কুলভূষণ খারবান্দা আর দীপ্তি নাভাল ছিলেন। দেবনাগরী হরফ থেকে ইংরেজি এডিট করছিলাম। তখন বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর সঙ্গে আলাপ হয়। উনি আমাকে দেখে বললেন, 'আপনি এসব কেন করছেন? আপনি ছবি করুন, অভিনয় করুন!'
আমি বললাম 'না, আমি সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে প্রধান চরিত্র করেছি। আর আমার অভিনয়ে ফিরতে ইচ্ছে করে না। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত বললেন, 'আমি যদি আপনাকে আমার ছবিতে প্রধান চরিত্র দিই করবেন?'
ব্যস, সেই 'ফেরা' দিয়ে আমার আবার অভিনয়ে ফেরা।