রাজশাহীর ঘোরামারা অঞ্চলের মিয়াপাড়ায় যে বাড়িটা একসময় ছিল তাঁর অবাধ স্বাধীনতার মুক্তাঙ্গন, সেখানে এখন খোলা আকাশের নিচে ছড়িয়ে আছে লাল ইট, কাদা, ঝোপজঙ্গল আর শ্যাওলা ধরা ভাঙা দেওয়ালের টুকরো।

শেষ আপডেট: 4 November 2025 21:53
রাজশাহীর বাতাসে আজও হাওয়া বয় শনশন। লেগে থাকে ঝরা পাতার ধুলোমাখা গন্ধ। একসময় যে বাড়ি ছিল ঋত্বিক ঘটকের ছেলেবেলার রোদ–ছায়ার আশ্রয়, তা আজ শুধুই ভাঙা ইটের স্তূপ। শতবর্ষে এসে দাঁড়িয়ে সেই বাড়ি, সেই উঠোন, সেই পথ — আজ আর কারও ঘর নয়, শুধু স্মৃতির ভাঙা প্রতিধ্বনি। মায়েস্ত্রোর জন্মশতবার্ষিকীতে দেশ-বিদেশ জুড়ে রকমারি অনুষ্ঠান। অথচ জন্মভূমির বুকেই তাঁর প্রথম পৃথিবীর ছাপ আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন। ঠিক যেন 'মেঘে ঢাকা তারা'।
রাজশাহীর ঘোরামারা অঞ্চলের মিয়াপাড়ায় যে বাড়িটা একসময় ছিল তাঁর অবাধ স্বাধীনতার মুক্তাঙ্গন, সেখানে এখন খোলা আকাশের নিচে ছড়িয়ে আছে লাল ইট, কাদা, ঝোপজঙ্গল আর শ্যাওলা ধরা ভাঙা দেওয়ালের টুকরো। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া সেই ভাঙা দেয়ালে ম্লান আঁকিবুকি এখনও মনে করিয়ে তিনি ছিলেন।
গত বছরই বাড়িটি ভেঙে ফেলা হয়। তার আগেও যদিও তা বহু বছর ধরে অবহেলায় ক্ষয়ে যাচ্ছিল। ভাঙা বাড়ির জমিটা এখন শুধু স্তূপ। কিন্তু সেই স্তূপে যারা চোখ রাখে, তারা জানে — এ ইটের স্তূপে চাপা আছে অমূল্য সব স্মৃতি।

১৯২৫ সালে জন্মানো ঋত্বিক ঘটক তাঁর শৈশবের বহু সময় কাটিয়েছিলেন এই রাজশাহীতেই। পড়াশোনা করেছিলেন রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলে আর কলেজে। দেশভাগের পরে তাঁর পরিবার চলে আসে এ দেশে। সেই থেকেই এই বাড়ি পড়ে যায় প্রশাসনিক জটিলতার ভিতরে। পরে যদিও 'মালিকানাহীন সম্পত্তি' হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। বহু দশক পরে ১৯৮৫ সালে রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল সেই জমি কিনে নেয়। বহু বছর ধরে সেই বাড়ি অক্ষতই ছিল। ঘর, উঠোন, কুয়ো — সবই বয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ঘটক পরিবারের স্মৃতি। কিন্তু দেওয়ালের বয়স হয়, সোজা হয়ে দাঁড়ানো দায় হয়ে যায় এক পর্যায়ে, এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে, ভেঙেছে দেয়াল, কিন্তু স্মৃতি? বড় দায়!
কলেজের প্রিন্সিপাল ডাঃ আনিসুর রহমানের দাবি, তাঁরা কখনও চাননি বাড়িটা ভেঙে ফেলা হোক। হাসপাতালের আউটডোর ইউনিটহিসেবে বাড়িটা বহু বছর ব্যবহৃতও হয়েছে। কিন্তু কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্র নিষেধ উপেক্ষা করেই এক সন্ধ্যায় বাড়িটি ভেঙে দেয়। কেন? উত্তর অজানা।

ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি আহসান কবীর বাংলাদেশের এক সংবাদমাধ্যমকে জানান, ঋত্বিকের জীবনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই শহর। মাটির গন্ধ, বরেন্দ্র অঞ্চলের মিউজিয়াম, কাছের লাইব্রেরির বইয়ের দুনিয়া — এসব তাঁর সংবেদনশীল মনের ওপর গভীর ছাপ ফেলেছিল। এই শহরের বাতাস, নদীর স্রোত, মানুষের জীবনের টানাপোড়েন — এগুলোই পরে তাঁর সিনেমায় ফিরে ফিরে এসেছে। ২০০৮ সালে যখন তাঁরা ফিল্ম সোসাইটি শুরু করেন, তখন বহু মানুষই জানতেন না যে ঋত্বিকের শৈশব কেটেছে এই রাজশাহীতে। তাঁরা নিজেরা অনুষ্ঠান করতেন ঐ বাড়িতেই। পরে সোসাইটির নাম বদলে হয় — ঋত্বিক ঘটক ফিল্ম সোসাইটি।
লিটন যোগ করেন, প্রশাসন থেকে নাকি বাড়ি পুনর্গঠনের জন্য ৫২ লাখ টাকার একটি হিসেবও একসময় তৈরি হয়েছিল। কাগজে এসেছিল পরিকল্পনা। কিন্তু বাস্তবে সেই পরিকল্পনা আর শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। কেন? তাও কেউ জানে না।
প্রতি বছরই ৪ নভেম্বর জন্মবার্ষিকীর দিন তাঁরা অনুষ্ঠান করেন। কিন্তু এবার? ভিটেটাই তো আর নেই! পরিচালকের জমির নথিতে দেখা যায় জমির মালিকানায় ছিল মা ইন্দুবালা দেবীর নাম। তাই কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে কীভাবে এককভাবে মালিকানা যায় সেই প্রশ্নও আগে উঠেছে, আর এ ক্ষেত্রেও উত্তরটা অজানা!
আইনি জটিলতা, প্রশাসনিক মাপজোক, রাজনৈতিক পরিবর্তন — এসবের মাঝেই আজও গুমরে কাঁদে নোনা ধরা বাড়ির কঙ্কাল। পদ্মার ঢেউ, শব পোড়া গন্ধ, আর নদীর ঘাট শুধু সাক্ষী থাকে সেই সব স্বপ্নের। পোড়ো কুয়োর জলের দাগ হিঁচড়ে নিয়ে যায় এমন এক সময়ে যেখান থেকে ফেরার পথ থাকলেও ইচ্ছের অভাবই শেষ করে দেয় একমুঠো আশ্রয়কেও। একই সঙ্গে তুলে দেয় বেশ কিছু প্রশ্ন, যার উত্তর জানা থাকলেও প্রকাশ্যে বললে 'খবর আছে'।
তথ্যঋণ:
দ্য ডেইলি স্টার
Docu: Ritwick and Beyond