আজ বিশ্ব কিডনি দিবস। অঙ্গদানের মতো মানবিক একটি বিষয়কে ঘিরে প্রতি বছরই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে জীবন বাঁচানোর গল্প, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাফল্য, আর মানুষের অসাধারণ মানবিকতা।

শেষ আপডেট: 12 March 2026 17:34
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আজ বিশ্ব কিডনি দিবস। অঙ্গদানের মতো মানবিক একটি বিষয়কে ঘিরে প্রতি বছরই নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে জীবন বাঁচানোর গল্প, চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাফল্য, আর মানুষের অসাধারণ মানবিকতা। কিন্তু এই আলোচনার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অস্বস্তিকর সামাজিক বাস্তব। ভারতের বিভিন্ন গবেষণা ও পরিসংখ্যান বলছে, দেশের জীবিত অঙ্গদাতাদের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই নারী, অথচ অঙ্গপ্রাপকদের বড় অংশই পুরুষ। সংখ্যাগুলো শুধু চিকিৎসা-পরিসংখ্যান নয়, বরং আমাদের সমাজের বহুদিনের এক মানসিকতার প্রতিফলন।
এই বাস্তবতাকেই গল্পের কেন্দ্রে এনে তৈরি হয়েছে নন্দিতা রায় ও শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় পরিচালিত নতুন ছবি ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’। দীর্ঘদিন ধরেই এই নির্মাতা জুটি তাঁদের ছবির মাধ্যমে সমাজের নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছেন। ‘ইচ্ছে’, ‘রামধনু’, ‘অ্যাক্সিডেন্ট’, ‘মুক্তধারা’, ‘কণ্ঠ’ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ‘রক্তবীজ’ কিংবা ‘বহুরূপী’— প্রতিটি ছবিতেই দেখা গেছে বাস্তব জীবনের টানাপোড়েন, সম্পর্কের ভেতরের দ্বন্দ্ব, আর মানুষের লড়াই। সেই ধারাবাহিকতাতেই তাঁদের নতুন ছবিতেও উঠে এসেছে সমাজের এক নীরব অথচ গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা— অঙ্গদান এবং তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লিঙ্গবৈষম্য। (Phool Pishi O Edward, zinia sen, world kidney day)
ন্যাশনাল অর্গ্যান অ্যান্ড টিস্যু ট্রান্সপ্লান্ট অর্গানাইজেশন বা নোটোর বিভিন্ন রিপোর্টে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভারতে জীবিত অঙ্গদাতাদের বড় অংশই নারী। পরিবারের পুরুষ সদস্যদের বাঁচাতে স্ত্রী, মা, বোন কিংবা দিদিরাই এগিয়ে আসেন বেশি। কিডনি দানের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। অথচ উল্টো উদাহরণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম— খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা যায় কোনও পুরুষ নিজের স্ত্রীর জন্য কিডনি দিচ্ছেন বা কোনও নারী অঙ্গগ্রহীতা হচ্ছেন।
এই বাস্তবতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সমাজের সেই চেনা ধারণা— পুরুষের জীবন রক্ষা করা যেন পরিবারের প্রধান কর্তব্য, আর নারীর আত্মত্যাগকে ধরে নেওয়া হয় স্বাভাবিক দায়িত্ব হিসেবে।
‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’-এর গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন জিনিয়া সেন। তাঁর কথাতেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ছবির মূল ভাবনা। জিনিয়া বলেন, “ডেটা এবং বিভিন্ন রিপোর্ট বলছে দেশে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ অঙ্গদাতা মেয়ে, আর প্রায় একই অনুপাতে গ্রহীতারা ছেলে। এই তথ্যটাই আমাদের ভাবিয়েছে। সেই বাস্তব থেকেই ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’-এর গল্প তৈরি হয়েছে। কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট কীভাবে হচ্ছে, কার হচ্ছে— তা এখনই বলা সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে যে ধরনের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো থেকেই আমরা অনেক উপাদান নিয়েছি।”
এই প্রসঙ্গে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন সাম্প্রতিক এক বিতর্কের কথাও। বিহারের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদবকে কিডনি দান করেছিলেন তাঁর মেয়ে রোহিণী আচার্য। সেই ঘটনাকে ঘিরে পরে রাজনৈতিক মহলের এক আড্ডা বা পার্টিতে তাঁকে ‘অপবিত্র কিডনি’ বলে কটাক্ষ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। মন্তব্যটি প্রকাশ্যে আসতেই শুরু হয় তীব্র সমালোচনা ও বিতর্ক। জিনিয়ার কথায়, এই ঘটনাই দেখিয়ে দেয় সমাজে নারীদের ত্যাগ কত সহজেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের চাপ বা সামাজিক প্রত্যাশার কারণে মহিলাদের ডোমেস্টিক অ্যাবিউজের মুখোমুখি হতে হয়। কেউ যদি কিডনি দান করতে না চান, তাতেও সমালোচনা শুনতে হয়। আবার কেউ রাজি হলেও নানা কটুক্তি বা মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়। এই জটিল বাস্তবকেই ছবির গল্পের ভিত হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে নির্মাতারা এখনই খোলসা করতে চাইছেন না ছবির রহস্যের সবটা। কারণ ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’ শুধু একটি সামাজিক গল্প নয়— এটি একই সঙ্গে রহস্য ও রোমাঞ্চে মোড়া একটি ড্রামা। কে কাকে কিডনি দিচ্ছে, কিংবা সেই ঘটনার পেছনে কী সত্য লুকিয়ে আছে— সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে পর্দায়।
তবু ছবির কেন্দ্রে যে প্রশ্নটি রয়ে যায়, তা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং গোটা সমাজের। অঙ্গদান নিঃসন্দেহে জীবন বাঁচানোর এক মহৎ কাজ। কিন্তু সেই মহত্বের আড়ালে যদি লুকিয়ে থাকে লিঙ্গবৈষম্য, দায়িত্বের অসম বণ্টন, কিংবা নীরব সামাজিক চাপ— তবে সেই প্রশ্নগুলোও সমান জরুরি হয়ে ওঠে।
বিশ্ব কিডনি দিবসে ‘ফুল পিসি ও এডওয়ার্ড’ তাই শুধু একটি সিনেমা হয়ে থাকে না। এটি যেন আয়নার মতো সামনে ধরে সমাজের এক বাস্তব ছবি— যেখানে অসংখ্য নারী নীরবে নিজের শরীর, নিজের জীবন দিয়েও অন্যকে বাঁচিয়ে রাখেন। আর সেই অদেখা ত্যাগের গল্পই মনে করিয়ে দেয়, অঙ্গদান শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয় নয়, এটি সমানভাবে মানবতা, সমতা এবং সামাজিক দায়িত্বের প্রশ্নও।