
উত্তম কুমার
শেষ আপডেট: 12 April 2025 19:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: উত্তমকুমার, বাঙালির চিরকালের ম্যাটিনি আইডল। তিনি ছবিতে থাকা মানেই ছবি সুপারহিট। ছবিকে বাণিজ্য সফল করতে প্রযোজকদের প্রথম পছন্দ ছিলেন সবসময়ই উত্তমকুমার। তিনি ছবি ছেড়ে দিলে তবেই বাকিরা অভিনয়ের সুযোগ পেতেন।
কিন্তু এমন ঘটনাও ঘটেছিল যে স্বয়ং মহানায়ককেই ছবি থেকে বাদ দেওয়া হয়। কোন ছবি? কে ছিলেন পরিচালক যিনি উত্তমকুমারকে বাদ দেন? পরিবর্ত অভিনেতা হিসেবে কাকেই বা সুযোগ দেওয়া হয়?
তরুণ মজুমদার 'যাত্রিক' গোষ্ঠীর হয়ে 'পলাতক' ছবির চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। মনোজ বসুর 'আংটি চাটুজ্জের ভাই' কাহিনি অবলম্বনে 'পলাতক'-এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন তরুণ মজুমদার। ছায়াবাণী প্রোডাকশনের অফিসে বসে চিত্রনাট্যও শুনিয়েছিলেন তিনি। যা শুনে মুগ্ধ হন ছায়াবাণীর কর্ণধার অসিত চৌধুরী। যে কারণে 'পলাতক' ছবি করতে দু'বার ভাবতে হয়নি তাঁদের।
'পলাতক' ছবির প্রধান চরিত্রে কোনও তথাকথিত নায়ক তরুণ মজুমদারের পছন্দের তালিকায় ছিলেন না। বরং অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছিলেন তাঁর পছন্দের কোনও চরিত্রাভিনেতাকে। বক্সঅফিস নিয়েও একদমই মাথা ঘামাননি তরুণবাবু।
পরিচালকের প্রথম পছন্দ ছিলেন অনুপ কুমার। এদিকে ছায়াবাণীর কর্ণধার ডেকে পাঠালেন উত্তমকুমারকে। সঙ্গে ডাকা হল তরুণকেও। তিনি তো উত্তমকে দেখে অবাক। যাই হোক, তরুণবাবু পড়তে শুরু করলেন চিত্রনাট্য। যা শেষ হতেই দেখা গেল উত্তমকুমারের দু'চোখ ভরা জল। রাখঢাক না রেখেই বলে ফেললেন 'এই ছবি আমিই করব'।
কোনও কথা না বলে চুপ করে বাড়ি ফিরে এলেন তরুণ মজুমদার। উত্তম রাজি হলেও মন ভাল নেই পরিচালকের। তরুণবাবু যাঁকে ভেবে চিত্রনাট্য লেখেন তিনি তাঁকেই নেবেন। এমনটাই হয়ে এসেছে। না হলে ছবিই করেন না তিনি। এমনই তাঁর ধনুক ভাঙা পণ।
এদিকে প্রযোজক উত্তম ছাড়া ছবি করবেন না। শেষে তরুণবাবু নিজেই মহানায়কের দ্বারস্থ হলেন। বুঝিয়ে বললেন, "'পলাতক'-এর প্রধান চরিত্র ঠিক তথাকথিত নায়কোচিত নয়। তাই আপনার স্টারডম আর গ্ল্যামার আমার হিরোর অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। যদি কিছু অনুগ্রহ করেন!"
চুপ করে সবটা শুনলেন মহানায়ক। এর আগে 'যাত্রিক' গোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করেছিলেন উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন। ছবির নাম 'চাওয়া পাওয়া'। শুধু তাই নয়, উত্তম-সুচিত্রাই ওই গোষ্ঠী তৈরি করতে তরুণ মজুমদারদের উৎসাহ দিয়েছিলেন।
তরুণের ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে মহানায়ক তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন, "চিন্তা করবেন না। আমি 'ছায়াবাণী'কে বোঝাব। আমি করছি না 'পলাতক'।
তরুণ মজুমদার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। কিন্তু, উত্তমকুমারের অনুরোধ ছায়াবাণীর কর্ণধার রাখেননি। তারা উত্তমকুমারকে ছাড়া ছবিই করবেন না বলে সরে দাঁড়ালেন। ভেবেছিল অনুপ কুমারকে প্রধান চরিত্র করা মানে ছবি ফ্লপ হবে।
কলকাতার কোনও প্রযোজকই অনুপ কুমারকে হিরো করে টাকা লগ্নি করতে চাননি। কারণ তখন কমেডিয়ানের রোলে টাইপকাস্ট হয়ে গিয়েছিলেন অনুপ।
শেষমেশ, দক্ষিণী চলচ্চিত্রের বিখ্যাত প্রযোজক ভি. সান্তারাম হাল ধরলেন। তিনি 'পলাতক' ছবির চিত্রনাট্য শুনে মুগ্ধ তো হলেনই, কোন অভিনেতা হিরো হবে সেই নিয়ে শর্তও রাখলেন না। সব ব্যাপারেই তরুণকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন তিনি।
অনুপ কুমার যেন 'পলাতক' ছবির করে তথাকথিত 'চরিত্রের' গণ্ডি থেকে মুক্তি পেলেন। সংগীত পরিচালক হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে ছবির প্রতিটি গান হয়েছিল সুপারহিট। বক্স অফিসেও বিশাল সাফল্য পায় পলাতক। নায়কোচিত ইমেজ ভেঙে এই ছবি ইতিহাস গড়েছিল। অনুপের লিপে লোকের মুখেমুখে ফিরেছিল 'জীবন পুরের পথিক রে ভাই'-এর মতো কালজয়ী গান।