কিছু বাঁক বদলে দেওয়া ঘটনার সূত্রপাত হয় অলক্ষ্যে, নিভৃতে। চর্চা সেভাবে দানা না বাঁধলেও যত সময় গড়ায়, ততই ভবিতব্য অমোঘ হয়ে ওঠে। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের টিম ইন্ডিয়ার মসনদে বসার রূপরেখাও কি সেই ধারা মেনে এগিয়ে চলেছে? আজ বাদে কাল নয়তো পরশু গম্ভীরের থেকে ব্যাটন মহারাজের হাতে চলে যাওয়াটা কি একান্ত অনিবার্য?

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 25 August 2025 16:16
দ্য ওয়াল ব্যুরো: কিছু বাঁক বদলে দেওয়া ঘটনার সূত্রপাত হয় অলক্ষ্যে, নিভৃতে। চর্চা সেভাবে দানা না বাঁধলেও যত সময় গড়ায়, ততই ভবিতব্য অমোঘ হয়ে ওঠে।
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের টিম ইন্ডিয়ার মসনদে বসার রূপরেখাও কি সেই ধারা মেনে এগিয়ে চলেছে? আজ বাদে কাল নয়তো পরশু গম্ভীরের থেকে ব্যাটন মহারাজের হাতে চলে যাওয়াটা কি একান্ত অনিবার্য?
প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলা কিংবা নস্যাৎ করা—দুটোই খুব সহজ। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেটের অতীত বলছে, এভাবে প্রায় অন্তরালে থেকে হাত পাকিয়েছেন যাঁরা, তাঁদের অনেকেই বসেছেন কোচের গদিতে।
রাহুল দ্রাবিড়ের কথাই না হয় ধরা যাক। সিওই (পূর্বতন এনসিএ) হয়ে অনূর্ধ-১৯ এবং সেখান থেকে ইন্ডিয়া-এ টিমের দায়িত্ব নিলেন। সময় লাগল। ধীরে ধীরে নিজেকে প্রস্তুত করলেন। কিন্তু একবার পায়ের তলার জমি পাকা হওয়ার পর আত্মবিশ্বাস যখন তুঙ্গে, তরুণ ব্রিগেডকে শানিত করে বোর্ডের আস্থা অর্জন করে ফেলেছেন, ঠিক তখনই ভারতীয় দলের কোচিং পদে বসার ডাক এল। বিসিসিআইয়ের আর্জি ফেরাননি দ্রাবিড়। মসনদে বসেছেন। বাকিটা ইতিহাস!
সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রিটোরিয়া ক্যাপিটালসের নতুন কোচ হওয়াটাও একই রকম ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঘোষণাটা শুনতে যতখানি আকস্মিক, ভেতরে ভেতরে ঠিক ততটাই স্বাভাবিক। যেন এটাই অমোঘ ভবিতব্য… হওয়ারই ছিল! দিল্লি ক্যাপিটালসের ডিরেক্টর থেকে বোর্ড সভাপতি—ক্রিকেট প্রশাসন ও ম্যানেজমেন্টে দাপিয়ে কাজ করার পর ‘কোচ সৌরভ’হওয়াটা অনিবার্য বৃত্তপূরণ নয়? বিশেষজ্ঞদের চোখে, দ্রাবিড়, গম্ভীরের পর এখন পালা মহারাজের—নিছক কষ্টকল্পনা নয়, বরং ঘোরতর বাস্তব!
কারণ হিসেবে একাধিক যুক্তি দেখানো যেতে পারে। স্মরণ করা যাক সৌরভের পূর্বাশ্রমের কথা। খেলোয়াড়ি জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল প্রতিভা চিনতে পারার অসামান্য চোখ। সেহবাগ, যুবরাজ, জাহির, হরভজন—সবাই তাঁর ছত্রচ্ছায়ায় ক্রিকেটার হিসেবে বেড়ে ওঠেন। সাফল্যের সেই ধারাটা তিনি কোচিংয়েও টেনে আনতে পারেন—এটা কি লোভনীয় প্রত্যাশা নয়? বোর্ড প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর যোগাযোগ-দক্ষতা, ড্রেসিংরুমে তরুণদের ভরসা জাগানোর ক্ষমতা… সব মিলিয়ে তাঁর সিভি অন্যদের তুলনায় অনেক ভারী। বিরাট কোহলি-পর্বের অস্বস্তিকর অধ্যায় বাদ দিলে সৌরভের ম্যান-ম্যানেজমেন্ট প্রশ্নাতীত।
কোচিংয়ের চাপ কম নয়। রবি শাস্ত্রী শেষদিকে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, দ্রাবিড় পরিবারকে সময় দিতে সরে দাঁড়িয়েছেন। সৌরভের বয়স ৫৩। বড়সড় হার্ট অ্যাটাকের পরও যে ফিটনেস আর উদ্যম তিনি দেখাচ্ছেন, তাতে বোঝা যায়, এখনও ব্যস্ত থাকতে, ক্রিকেটকে কিছু ফিরিয়ে দিতে চান। এটাই মহারাজের আসল শক্তি।
অনেকের কাছে তাঁর কোচ হওয়াটা ‘সময়ের অপেক্ষা’। বিকল্প তালিকা এই মুহূর্তে খুবই সীমিত। লক্ষ্মণ নিজে দায়িত্ব নিতে নারাজ। বিদেশি নাম নিয়ে আলোচনা চললেও বিসিসিআই ১৪ বছর ধরে কেবল ভারতীয় কোচেই ভরসা রেখেছে। রিকি পন্টিং আবেদন পর্যন্ত করেননি। জয়বর্ধনে, নেহরা, পন্টিং—সবাই নামকরা। কিন্তু টিম ইন্ডিয়ার কোচের চেয়ারে কজনকে সত্যিই ভরসা করা যায়? এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের ফাঁকেই আরও উজ্জ্বল হচ্ছে সৌরভের সম্ভাবনা।
প্রিটোরিয়া দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেছেন, ‘সময় এলে দেখা যাবে!’ ক্রিকেটের অভিধানে এর মানে স্পষ্ট—দরজা খোলা থাকলে আমি রাজি। দ্রাবিড় যেমন এনসিএ থেকে উঠে এলেন জাতীয় দলে, সৌরভও কি সেই পথেই এগোচ্ছেন? ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
গম্ভীর গত বছর জুলাই মাসে দায়িত্ব নিয়েছেন। শুরুর কয়েক মাস কেটেছে অস্থিরতায়। একমাত্র বড় সাফল্য চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি। ইংল্যান্ড সফরে ২-২ ড্র তাঁর ভাবমূর্তি খানিকটা ফেরালেও সমালোচকরা এখনও খুঁত খুঁজে চলেছেন। মুখে নতুন দল গড়ার যুক্তি দিলেও অনেকের বদ্ধমূল ধারণা: অশ্বিন, রোহিত, কোহলির টেস্ট অবসরের নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছেন আর কেউ নন… স্বয়ং গৌতম গম্ভীর।
আপাতত তাঁর চুক্তি ২০২৭ পর্যন্ত। বাস্তবে বিসিসিআই এত দ্রুত কোচ বদলায় না। পাকিস্তান বোর্ডের মতো মিউজিক্যাল চেয়ারের খেলা এখানে নেই। গম্ভীরের হাতে সময় রয়েছে, অন্তত বিশ্বকাপ পর্যন্ত তো বটেই। নিজেও আস্থার প্রতিদান রাখার চেষ্টা চালাচ্ছেন—তরুণ দল গড়ে তুলছেন, ধীরে ধীরে প্রভাব দেখাচ্ছেন। তা ছাড়া সৌরভও খোলাখুলি বলেছেন, ‘গম্ভীরকে আরও সময় দেওয়া উচিত!’
তবু ক্রিকেটে ভবিষ্যৎ বড়ই অনিশ্চিত। ব্যর্থতার ধাক্কা বা ড্রেসিংরুমে টানাপোড়েন যদি বাড়ে, আলোচনায় জোরালো হবে মহারাজের নাম। আপাতত গম্ভীরই প্রধান কোচ, কিন্তু সবার জানা—সুযোগ এলে, ছায়া থেকে ভেসে আসতে পারে সরোষ গর্জন।