ট্যাকটিক্যাল ব্যাপার ছাড়াও, গম্ভীরের অ্যাটিটিউড নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। লিডসে পন্থের জোড়া শতরানের পর প্রেস কনফারেন্সে এসে যখন তাঁকে ভারতের সহ-অধিনায়ককে নিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন গম্ভীর চিৎকার করে রিপোর্টারকে ধমক দিয়ে বলেন, গিল অনেক ভাল খেলেছেন, তাঁর প্রশংসা করতে হবে।

গৌতম গম্ভীর
শেষ আপডেট: 14 August 2025 15:22
ভারতের (Team India) ওভাল টেস্ট (Oval Test) জয় তাদের চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং শেষ অবধি হার না মানার মনোভাব ব্যক্ত করে। কিন্তু এই জয় তাদের নিজেদের জয়, হেড কোচ (Head Coach) গৌতম গম্ভীরের (Gautam Gambhir) কোনও অবদান নেই তাতে। বিগত ১৩টি টেস্টের মধ্যে তিনটিতে জয় যে কোনও কোচের কেরিয়ারে প্রশ্ন চিহ্ন ফেলতে বাধ্য।
এটা ঠিক যে সাম্প্রতিক কালের সেরা ভারতীয় জয়ের সঙ্গে একটা নেগেটিভ স্টোরিকে জুড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। মহম্মদ সিরাজের শেষ দিনে ওই অলৌকিক স্পেল- তাও পুরো সিরিজ বল করার পর ওভালের দর্শকদের মোহিত করে তোলে। এটা আরও বেশি তাঁদের কাছে, যাঁরা টিভি বা, মোবাইলে খেলা ফলো করছিলেন। তাঁদের হৃদস্পন্দন সহজেই অনুমেয়।
সিরাজ প্রায় একার হাতে রুদ্ধশ্বাস জয় ছিনিয়ে আনেন। ৩৫ রান করলে ইংল্যান্ড জিতবে, এই অবস্থায় সিরাজ এবং প্রসিদ্ধ কৃষ্ণ প্রত্যেকে চার উইকেট তুলে নিয়ে ওভালের মাঠে জয় ছিনিয়ে এনে সিরিজে সমতা ফেরালেন। এই জয় খুব সম্ভবত গম্ভীরের চাকরি বাঁচাল, যাঁকে নিয়ে আলোচনার অন্ত ছিল না যত এই সিরিজ গড়িয়েছিল।
একাধিক ট্যাকটিক্যাল ভুল করা সত্ত্বেও ভারত কী ভাবে এই সিরিজে সমতা ফেরাল, এক অনন্ত বিস্ময়। মহম্মদ সিরাজের ওই জাদুকরী স্পেল না হলে ভারত কোনওভাবেই ২-২ করতে পারত না।
সিরাজ নিজেও ম্যাচের পর বুঝতে পড়ছিলেন ওই স্পেলটার গুরুত্ব এবং মাহাত্ম্য। খেলার শেষে ভারতকে জিতিয়ে প্রেস কনফারেন্সে এসে তিনি চোখের জল চাপতে পারেননি। অধিনায়ক গিল যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন সিরাজ মাঝে মধ্যেই হারিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন একটি সিরিজ যেখানে তিনি ১৮৫.৩ ওভার বল করলেন, নির্দ্ধিধায় তাঁর ক্রিকেট জীবনের সব চেয়ে বেশি ওয়ার্কলোড। বর্ডার-গাভাসকর ট্রফিতে অনেক বোলিং করার পর, এটি বোধই অনেকাংশে বেশি ছিল। ৪০ দিন ধরে ১৮৫ ওভার বল করলে অনেক বোলার মাটিতে শুয়ে পড়বেন। কিন্তু সিরাজ অন্য ধাতুতে গড়া। এক চোখে জল, অন্য চোখে হাসি নিয়ে তিনি প্রেস কনফারেন্সে বললেন, ভগবান তাঁকে দিয়ে এই মহৎ কার্য করিয়ে নিয়েছেন।
এই “মিয়াঁ ম্যাজিক” বোধহয় পুরো সিরিজের একটি সঠিক বিশ্লেষণ। এজবাস্টনে গিল এবং পন্থ, ম্যাঞ্চেস্টারে সুন্দর এবং জাদেজা এবং ওভালে মিয়াঁ- প্রত্যেক টেস্ট ম্যাচে ভারত তার নির্দিষ্ট হিরো খুঁজে নিয়েছে।
এই তরুণ ভারতীয় দল কাঁধে কাঁধ রেখে দারুণ লড়াই উপহার দিয়েছে প্রত্যেকবার, যখনই মনে হয়েছে তাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে। ভারত এমন একটা সিরিজ ড্র করল যা তাদের জেতা উচিত ছিল। তাও আবার এমন একটা দলের সঙ্গে যারা ভারতের মতোই ট্যাকটিক্যাল ভুল অনেক করেছে।
ভারত সিরিজ ড্র করল অনেক ট্যাকটিক্যাল ভুল সত্ত্বেও
২-২ বোধহয় এই সিরিজের সঠিক মূল্যায়ন। ভারত বেশিরভাগ সেশন জিতল, কিন্তু অত্যন্ত ক্রিটিকাল সেশনগুলি জেতার ফলে ইংল্যান্ড ২-১ এগিয়ে ছিল ওভাল টেস্টের আগে অবধি। উল্টোদিকে যখন ইংল্যান্ড প্রায় জেতার মুখে তখন জাদেজা, সুন্দর এবং সিরাজ এক অপ্রতিরোধ্য দেওয়াল বানিয়ে ইংল্যান্ডকে আটকে দিলেন।
কিন্তু এই সাহস, দৃঢ়তা এবং মনের অদম্য জোরকে ট্যাকটিক্যাল সাউন্ডনেসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। যেমন ধরুন, ওভালের শেষ টেস্ট ম্যাচ- মনে হচ্ছিল ভারত একটা বোলার কম নিয়ে খেলছে, কিন্তু আসলে ইংল্যান্ডের একটি বোলার কম ছিল (ওকসের চোট)।
নিম্ন মানের টিম সিলেকশন
ভারতীয় জোরে বোলারদের ওপর গম্ভীরের অতি নির্ভরতা শুধুমাত্র একটি ম্যাচে সীমিত ছিলো না। পুরো সিরিজে ভারতের প্লেয়িং কম্বিনেশন দেখে প্রাক্তন প্লেয়ার এবং বিশেষজ্ঞরা স্তম্ভিত। প্রত্যেক ম্যাচে ভারত ব্যাটিং নির্ভর দল গড়েছিল, যেটি অত্যন্ত অবাক করেছে সবাইকে। কারণ প্রত্যেকটা পিচ ব্যাটিং সহায়ক ছিল।
ব্যাটিং নির্ভর দল- যেখানে গম্ভীর প্রত্যেক ম্যাচে দু’জন অলরাউন্ডারকে খেলালেন। যার ফলে ভারতের একজন বোলার কম হয়ে গেল। যেখানে ২০ উইকেট ছাড়া টেস্ট ম্যাচ জেতা যায় না।
আপনি কোনও এমন আন্তর্জাতিক দল পাবেন, যেখানে কুলদীপ যাদবের মতো কুশলী এক বোলারকে পুরো সিরিজ বসিয়ে রাখা হল? যিনি কিনা আনঅর্থডক্স ইংল্যান্ড ব্যাটারদের কঠিন পরীক্ষায় ফেলতে পারতেন? কুলদীপের রং ওয়ান কি বাজবল কেতাদুরস্ত ইংলিশ ব্যাটারদের বিপদে ফেলতে পারত না?
প্রাক্তন ক্রিকেটার সঞ্জয় মাঞ্জরেকার তো বলেই দিলেন, খেলোয়াড় নির্বাচনের পদ্ধতি তাঁর গোলমাল লেগেছে- টেস্ট ক্রিকেটের মতো স্পেশালিস্ট খেলায় শুধু ব্যাটিং অলরাউন্ডারদের নেওয়া হচ্ছে। ইঙ্গিত কার দিকে বুঝতে অসুবিধে হয় না।
এমন কি শেষ টেস্টে ৩৭৪ টার্গেট রেখেও ভারত বেশ দুর্বল জায়গায় ছিল। সত্যি বলতে কি ইংল্যান্ড ম্যাচের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিল, যখন তারা ৩৩০/৪। কিন্তু অতিরিক্ত বাজবল প্রীতি এবং ভারতের দুই পেসারের দানবীয় পারফরমেন্স ভারতকে অলৌকিক জয়ের মুখে এনে দেয়।
জাদেজা এবং সুন্দরকে স্পিনার হিসাবে পুরো সিরিজ খেলিয়ে ভারত তাদের সিমারদের ব্যাকআপ সাপোর্ট থেকে বঞ্চিত করে।
কোচ গম্ভীরের এই দুরূহ সিলেকশন ক্যাপ্টেন গিলকে আরও বিপদে ফেলে দেয়। ম্যাঞ্চেস্টারে গিল চতুর্থ সিমার শার্দূল ঠাকুরকে একেবারেই ভরসা করতে পারেননি। পুরো সিরিজে গিল স্পিনারদের ওপর একেবারেই ভরসা করতে পারেননি, যাঁদেরকে মোটের ওপর তাঁদের ব্যাটিং দক্ষতার জন্য নেওয়া হয়েছিল।
অবিরাম দলে পরিবর্তন, একি মিউজিক্যাল চেয়ারের খেলা নাকি ?
ভারত ১৮ জনের দল নিয়ে গিয়েছিল, যাতে দীর্ঘ্য সফরে ওয়ার্কলোড এবং কেউ চোট প্রাপ্ত হলে তাঁর প্রপার ব্যাকআপ থাকে। কিন্তু আমরা কী দেখলাম? পুরো সিরিজে ভারত একটা সেটেল্ড টিম খেলাতে পারল না।
অংশুল কম্বোজের অদ্ভুত নির্বাচনী প্রক্রিয়া দেখুন। ট্যুর ম্যাচগুলিতে ভাল খেলার পর তাঁকে ভারত ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হল। বলা হল তাঁকে আর দরকার পড়বে না। হর্ষিত রানা যে কিনা ওয়ার্ম আপ ম্যাচে খেলতেই পারেননি, তাঁকে দলের সঙ্গে রেখে দেওয়া হল। এর পর বিশেষজ্ঞদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পরে রানাকে ফেরত পাঠানো হল এই বলে যে, তিনি ব্যাক আপ ইনজুরি কভার ছিলেন এবং তাঁকে আর দরকার নেই।
এর কয়েক সপ্তাহ পরে কম্বোজকে হঠাৎ দলে ডেকে একেবারে সোজা নতুন বল দেওয়া হল চতুর্থ টেস্টে। তার ফল কী হল? কম্বোজ ১২৫ কিলোমিটার স্পিডে বল করে দল থেকে বাদ পড়লেন। একমাত্র কম্বোজ নন, একটি ম্যাচের পর সাই সুদর্শন বাদ পড়লেন। করুণ নায়ার আট বছর পর দলে ফিরে প্রথমে ৬ নম্বরে খেললেন, তারপর জোর করে ৩ নম্বরে। এরপর তৃতীয় টেস্টের পর তাঁকে বাদ দেওয়া হল। কেন? এ কি পাগলের দুনিয়া?
গম্ভীরের আজব দুনিয়া-আমরা এতে বেঁচে আছি
ট্যাকটিক্যাল ব্যাপার ছাড়াও, গম্ভীরের অ্যাটিটিউড নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। লিডসে পন্থের জোড়া শতরানের পর প্রেস কনফারেন্সে এসে যখন তাঁকে ভারতের সহ-অধিনায়ককে নিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন গম্ভীর চিৎকার করে রিপোর্টারকে ধমক দিয়ে বলেন, গিল অনেক ভাল খেলেছেন, তাঁর প্রশংসা করতে হবে। এর পরে এজবাস্টনে গিলের ডাবল সেঞ্চুরির পরে গম্ভীর প্রেস কনফারেন্সে এসে আবার মনে করিয়ে দেন প্রেসকে, দলের অধিনায়ক কে।
কিন্তু প্রেস কি আদৌ প্রশ্ন তুলেছিল গিলের অধিনায়কত্ব নিয়ে? একেবারেই নয়। তারা শুধু জানতে চেয়েছিল যে, ইংল্যান্ডের মতো এত টাফ সিরিজে গিলের মতো অনভিজ্ঞ অধিনায়ক কি দরকার ছিল, বিশেষ করে দল যখন একেবারে নতুন?
কিন্তু কে পাত্তা দেয়? এটা যে গম্ভীরের দুনিয়া। আমরা শুধু এখানে বেঁচে-বর্তে আছি।
১৩ টেস্টে ৩টি জয়
ওভালের জয় গৌতম গম্ভীরের কোচিং কেরিয়ারকে লাইফ-লাইন দিল ঠিক, কিন্তু নিছক পরিসংখ্যান অত্যন্ত খারাপ। কোচ হিসাবে বিগত ১৩ টেস্টে মাত্র ৩ টি জয়। ভারত ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-২ করেছে কোনওরকমে। গম্ভীরের বুদ্ধিমত্তার জন্য নয়, কিছু খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের জন্য।
ভারত তাদের শেষ তিনটি টেস্ট সিরিজ জিততে ব্যর্থ হয়েছে। দেশের মাঠে নিউজিল্যান্ড এবং বিদেশে ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে।
গম্ভীরের ভারতের তিনটি বিশেষ সমস্যা আছে। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যাটিং কোলাপ্স, অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে বোলিং ঠিক ছিল কিন্তু ব্যাটিং আবার ভেঙে পড়ে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যাটিং ঠিক ছিল কিন্তু বোলিং দু’টি টেস্টে ২০ উইকেট নিতে পারেনি।
এক একটা সিরিজে যদি এক এক রকম ভুল হয়, তা হলে সেটা কি টিম ম্যানেজমেন্টের ওপর এসে পড়ে না? যে টিম ম্যানেজমেন্ট প্রায় এক বছর দলের দায়িত্বে আছে? নিশ্চয়ই পড়ে।
গম্ভীরের কি রেড বল ক্রিকেটের দূরদর্শিতা আছে?
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গম্ভীরের কি ক্রিকেটের সর্বোচ্চ ফরম্যাটে সফল হওয়ার ক্ষমতা আছে?
কোচ হওয়ার পর থেকে গম্ভীর অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী ভাবে একের পর এক ভুল করে চলেছেন। সিরাজ ১৮৫ ওভার বল করে প্রায় শেষ, বুমরাহ তিনটির বেশি টেস্ট খেলতে পারছেন না, কুলদীপ টিমের সঙ্গে গিয়ে একটাও টেস্টে সুযোগ পাচ্ছেন না এবং অভিমন্যু ঈশ্বরণকে কেন স্কোয়াডে রাখা সত্ত্বেও খেলানো হচ্ছে না- ঈশ্বর জানেন।
গম্ভীর কোনওরকমে তাঁর চাকরি বাঁচিয়ে রেখেছেন ওভাল টেস্ট জিতে। কিন্তু গম্ভীর লাল বল কোচ হিসাবে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন। টেস্ট ম্যাচের মতো ৫ দিনের ফরম্যাটে কতদিন তিনি টি-২০ টিম নির্বাচন করে গা বাঁচাতে পারবেন? যেখানে ২০ উইকেট নেওয়ার মতো বোলার নেই!
ফলোঅন বাঁচানো আর সিরিজ ড্র করাই কি আমাদের একমাত্র কর্তব্য, যেখানে ভারত অনেক বেশি জেতার ক্ষমতা রাখে?
ভারত কিন্তু আরেকটা ডব্লিউটিসি ফাইনাল মিস করতে চাইবে না। তা সে গম্ভীর থাকুক বা না থাকুক।