
অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পরে উল্লাস আফগান ক্রিকেটারদের। (এএফপি/গেটি ইমেজেস)
শেষ আপডেট: 23 June 2024 16:42
দ্য ওয়াল ব্যুরো: পঞ্চাশ ওভারের বদলা টি২০-তে।
মনে কি পড়ে, গত বছরের সাতই নভেম্বর? ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম? সকাল থেকে তো কেউ গা করেননি ওইদিন। পঞ্চাশ ওভারের বিশ্বকাপে মুখোমুখি অস্ট্রেলিয়া ও আফগানিস্তান। এটা কি একটা খেলা হল? অনেকেই হয়ত ওইদিন সকালে বাজারের ব্যাগ হাতে বেরিয়ে পরিচিতজনদের মুখ বেঁকিয়ে তাচ্ছিল্য করেছিলেন। ও তো অস্ট্রেলিয়া চোখ বুজে জিতে যাবে! বেলা গড়াতেই অবশ্য ভুলটা ভেঙেছিল। আফগানিস্তান ২৯১ তুলে দেয়, সেঞ্চুরি করেন ইব্রাহিম জাদরান! তাতেও অনেকে ভেবেছিলেন, এই রানটাই বা এমন কি! কিন্তু ঘড়ির কাঁটা রাত আটটা বাজতেই টিভির সামনে ভিড় বাড়তে শুরু করে। সাড়ে আটটা নাগাদ দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়া ৭ উইকেটে ৯১!
জয়ের মুখে আফগানিস্তান! আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আসতে চলেছে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! যুদ্ধবিধ্বস্ত এক আনকোরা দেশের হাতে পরাজয় ঘটতে চলেছে ক্রিকেটের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের!
তারপরেই নামলেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল।
ক্রিকেট ইতিহাস সেদিন এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গিয়েছিল আরব সাগরের তীরে। তুলনা হতে পারে ২০০১-এর ইডেনের সেই ঐতিহাসিক টেস্ট। গোটা অস্ট্রেলিয়া দলের কেউ ২৫ রান পেরোতে পারেননি। একা গ্লেন ম্যাক্সওয়েল করলেন ২০১। মেরেছিলেন একুশটা চার, দশটা ছক্কা। জয়ের দোরগোড়ায় এসেও রাশিদ খানদের মানতে হয়েছিল, 'আরে যাই হোক না কেন, দলটার নাম তো অস্ট্রেলিয়া!'
মানেননি রাশিদ। শুধু অপেক্ষা করলেন। এক বছরও যেতে হল না। শুধু মুম্বই থেকে এক লাফে উড়ে আসতে হল ক্যারিবিয়ান সাগরের ওপরে সেন্ট ভিনসেন্ট দ্বীপের ছোট্ট শহর কিংসটাউনে। টি২০ বিশ্বকাপের সুপার এইটে প্যাট কামিন্সের অস্ট্রেলিয়াকে ২১ রানে হারিয়ে দিল আফগানিস্তান। একেবারে সুদে আসলে প্রতিশোধ।
স্রেফ পরিশ্রম, প্রতিভা আর লেগে থাকা দিয়ে কীভাবে একটা আনকোরা, ছোট দল থেকে বড় মঞ্চের অন্যতম নামী দলে উত্তরণ ঘটানো যায়, সম্ভবত আফগানিস্তান তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ! নিজেদের দেশ যুদ্ধবিধ্বস্ত! নিজেদের 'হোম' গ্রাউন্ড খুঁজতে কখনও আসতে হয় ভারতের দেরাদুনে, কখনও দুবাইয়ের শারজাতে। দলের বেশিরভাগ ক্রিকেটারের কাছে বাড়ি যাওয়া মানে অনিশ্চয়তার মেঘ। যদিও তালিবান প্রশাসন সরকারিভাবে জানিয়ে দিয়েছে, তারা ক্রিকেটারদের খেলাধুলোয় কোনও বাধা দিতে চায় না। কিন্তু তারপরেও, ঠাঁইনাড়া হয়ে কাটে ক্রিকেটারদের। অথচ ধীরে ধীরে নিজেদের প্রতিভা চিনিয়েছেন আফগানরা। যে দলের ক্রিকেটারদের বেশিরভাগকে কেউ চিনত না, তাঁরা এখন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত সেলিব্রিটি। চুটিয়ে খেলছেন আইপিএলে। রহমানুল্লাহ গুরবাজ, আজমাতুল্লাহ ওমরজাই, ইব্রাহিম জাদরান, মহম্মদ নবি, রাশিদ খান, নূর আহমেদ, নবীন-উল হকদের নাম এখন গোটা দক্ষিণ এশিয়ায় পরিচিত।
টসে জিতে আফগানদের ব্যাট করতে পাঠিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক মিচেল মার্শ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বীপে বড় রান এমনিতে ওঠে না। সহায়তা পান বোলাররা। প্যাট কামিন্স দুর্দান্ত ফর্মে আছেন। অ্যাডাম জাম্পাও এখানে ব্রহ্মাস্ত্র হয়ে উঠতে পারেন। অথচ দুই আফগান ওপেনার, কলকাতা নাইট রাইডার্সের রহমানুল্লাহ গুরবাজ ও ইব্রাহিম জাদরান এমন গ্যাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন; প্রথম উইকেট পড়ল ১১৮ রানে!
পাল্টা ব্যাট করতে নেমে প্রথমেই জবাব দিয়ে দিলেন ট্র্যাভিস হেড! আইপিএলের শেষের দিক থেকে সেই যে খরায় পড়েছেন, এদিকে কলকাতায় বৃষ্টি নেমে গেল, কিন্তু হেডের রান-খরা আর কাটল না! একই অবস্থা ডেভিড ওয়ার্নারের। আট বল খেলে ৩ রানেই বিদায় নিলেন ওয়ার্নার-গারু। মিচেল মার্শ ১২, মার্কাস স্টোয়নিস ১১। বাকিরা কেউ ১০ পেরোতে পারেননি।
ব্যতিক্রম, আবারও সেই ম্যাক্সওয়েল।
এমনিতে আইপিএল থেকেই ম্যাক্সওয়েল ছন্দে নেই। টি২০ বিশ্বকাপেও একই অবস্থা! কিন্তু আফগানদের সামনে পড়লেই যেন চেগে ওঠেন ম্যাড ম্যাক্স। কাবুলিওয়ালাদের এখন এমন অবস্থা, হিন্দুকুশ থেকে কারাকোরাম তাঁরা পার করে দেবেন, কিন্তু ম্যাক্সওয়েলকে ডিঙোনোটাই যেন সমস্যা হয়ে যায়। ৪১ বলে ৫৯ করেন ম্যাক্সি। মারেন ছ'টা চার, তিনটে ছক্কা। শেষ অবধি ১৪ ওভার ৪ বলে ম্যাক্সওয়েলের শট ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে দাঁড়িয়ে থাকা নূর আহমেদ প্রায় ডাইভ মেরে ধরে ফেলতেই খেলার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়ে যায়। আর ম্যাচে ফিরতে পারেনি অজিরা।
বিশ্বকাপে শুরু থেকেই দাপটে খেলছে আফগানিস্তান। কিন্তু অস্ট্রেলিয়াকে হারানো যেন এক অন্য মুহূর্ত। তুলনীয় হতে পারে, কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্তিনাকে সৌদি আরবের হারানো। যদিও তুলনাটা ঠিকঠাক চলে না। সৌদি আরবের একজন খেলোয়াড়কেও তার আগে অবধি কেউ চিনত না। সকলেই সৌদির স্থানীয় লিগে খেলতেন। তখনও তাতে তাবড় বিশ্বখ্যাত ফুটবলাররা নাম দেননি। এদিকে আফগানিস্তানের গুরবাজ, রাশিদ, নবীনরা রীতিমত আইপিএলে সাড়া ফেলে দেওয়া ক্রিকেটার। সকলেই নিজ গুণে তারকা। আফগানিস্তানের ক্রিকেট বোর্ড এক্স হ্যান্ডলে ছবি দেয়, কার্যত উৎসব শুরু হয়েছে হিন্দুকুশের ওপারে। খোস্ত প্রদেশে রাশিদদের জয় সেলিব্রেট করতে কাতারে কাতারে লোক জমায়েত হয়েছেন রাস্তায়। কাবুল থেকে কান্দাহার, এক মহাকাব্যিক জয়ে মোহিত আফগান আমজনতা।