আজ অরুন্ধতীর হোম চৌধুরীর জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক সেই ফেলে আসা সোনালী দিন।

গ্রাফিক্স - দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 1 July 2025 19:30
'জোছনা ভেজা রাতে,
একলা লাগে বড়
বলব আর কাকে
আমায় গ্রহণ করো ... '
সুচিত্রা-সন্ধ্যা জুটির পর বাংলা ছবির ইন্ডাস্ট্রিতে উত্থান হয়েছিল আর এক নায়িকা-গায়িকা জুটির। স্বর্ণযুগের মেলোডি বেসড গানের ধারা অব্যাহত রেখেছিল এই জুটি। যাঁদের কন্ঠে-লিপে বেশিরভাগ গানই আজও চিররঙিন। তাঁরা হলেন মহুয়া রায়চৌধুরী আর অরুন্বতী হোমচৌধুরী। আজ অরুন্ধতীর হোম চৌধুরীর জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক সেই ফেলে আসা সোনালী দিন।

হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরেই জীবনের প্রথম ছবি 'দত্তা'তে সুচিত্রা সেনের লিপে গান গাইবার সুযোগ পান অরুন্ধতী। যা সকল গায়িকার স্বপ্ন থাকে। সে সাধ মেটেনি হৈমন্তী শুক্লা,বনশ্রী সেনগুপ্তদের। 'দত্তা' র বিজয়ার পর ততদিনে নিজের দরজাটি বন্ধ করে দিচ্ছেন শ্রীমতী সেন। কিন্ত ম্যাডামের লিপে গেয়েই সমসাময়িক মহিলা শিল্পীদের থেকে অরুন্ধতীর স্টেটাস বেড়ে গেল। এরপরই অরুন্ধতী পেয়ে গেলেন তাঁর যোগ্য নায়িকাকে। তিনি মহুয়া।
'দৌড়' ছবিতে রবীন্দ্রনাথের গানে মিলল অরুন্ধতী-মহুয়ার মিশ্রণ। সমুদ্রের ঢেউয়ের মাঝে উচ্ছল মহুয়ার লিপে অরুন্ধতী কন্ঠে 'হা রে রে আমায় ছেড়ে দে রে' উর্মিমালার মতোই পর্দায় মেতে উঠল। 'দৌড়' ছবিতে মহুয়ার সিরিয়াস অ্যাক্টিং। হুইল চেয়ারে বসা প্রতিবন্ধীর চরিত্রে মহুয়া। যে তাঁর ফ্ল্যাশব্যাকে দেখে ফেলে আসা স্বাভাবিক জীবনের এই আনন্দের দিন। একই রবীন্দ্রসঙ্গীতে আবার মহুয়া লিপ দেন দু বছর পরই বিজয় বসুর 'সাহেব' ছবিতে। আউটডোর নয় এবার ইন্ডোরে শ্যুট। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায় আর অরুন্ধতী হোম চৌধুরীর দ্বৈত সঙ্গীতে 'হা রে রে'। একই নায়িকা ও গায়িকা দুই ছবিতে দু বছরে গাইছেন যা বিরলস্য বিরল। দুটো গানের দৃশ্যই সুপারহিট।

তবে অরুন্ধতী যে গান গাইবার পর শীর্ষস্থানীয়া গায়িকা হয়ে যান সেটি হল তরুণ মজুমদারের 'দাদার কীর্তি'র 'বধূ কোন আলো লাগল চোখে'। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের ভাইঝি গায়িকা সুমিত্রা রায় মুখোপাধ্যায়-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি "আপনি মেজ কাকার সংগীত পরিচালনায় আশির দশকে আর গাইলেন না কেন? কোথায় হারিয়ে গেলেন 'অগ্নীশ্বর' ছবিতে 'তবু মনে রেখো' রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে?"
সুমিত্রা দেবী একটা নামই নিয়েছিলেন "কারণ অরুন্ধতী। অনেক চড়ায় ভাল গাইত। 'বধূ কোন আলোর' পর অরুন্ধতী ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গিয়েছিল।"
ঠিক তাই তরুণ মজুমদারের 'দাদার কীর্তি' মহুয়া-অরুন্ধতী জুটির ল্যান্ডমার্ক ছবি।
'এসো প্রাণভরণ' গানটি পিয়ানোর সামনে বসে মহুয়া গাইছেন এক শীতের ভোরে যে গানের থেকে পবিত্র গান আর হয়না। ছবির শেষ দৃশ্যে ফিমেল ভার্সানে 'চরণ ধরিতে দিও গো আমারে' গানে মহুয়ার বুকভাঙা কান্নায় পিয়ানোর উপর ভেঙে পড়া আর অরুন্ধতীর গান দর্শকের বুকে এসে লাগে আজও।

পরপর অনেক ছবির জুটি তাঁরা। 'উপলব্ধি', 'সতী সাবিত্রী ও সত্যবান', 'দক্ষযজ্ঞ' আর সেসময় মহুয়া মানেই অরুন্ধতী। বম্বে থেকে গায়িকাদের আনার ভাবনা হত না প্রযোজকদের। দীনেন গুপ্তর প্রিয়তমা ছবির নায়িকা সোনালী গুপ্ত কিন্তু সহনায়িকা মহুয়া নজর টেনে নিলেন অরুন্ধতীর 'জোছনা ভেজা রাতে' গানে। মহুয়া ঠিক যেন এখানে 'নৌকাডুবি' র হেমনলিনী।
মহুয়ার শেষ ছবি 'আশীর্বাদ' -এও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে রাণু মুখোপাধ্যায়ের পাশাপাশি অরুন্বতী ছিলেন স্বমহিমায়। 'গুন গুন সুরে মৌমাছি' মহুয়ার লিপে জায়গা পেলেও 'বাইরে না হয় ঝড়ের হাওয়াই চলুক' মহুয়া লিপ দিতে পারলেন না। মারা গেলেন বাংলা ছবির সোনার প্রতিমা।
তবু গানে ব্যবহার হল মহুয়ার শট। 'কিনকিন কিনি কিনি' অরুন্ধতীর গানে মহুয়া কথা দিয়েছিলেন বীরেশ চট্টোপাধ্যায় কে তুমুল নাচবেন। সে জন্য নাচ প্র্যাকটিস করতে ছুটি নিয়েছিলেন মহুয়া। ফাটিয়ে নাচবেন বলেছিলেন মৌ। কিন্তু নাচের আগেই শেষ সোনার প্রতিমা। ফটোশ্যুট করা মহুয়ার শট গুলো ব্যবহার হল 'আশীর্বাদ' ছবিতে। মহুয়া মরে গিয়েও গান হিট করালেন অরুন্ধতীর সাথে। এই ছবির আরও একটি গান 'তোমরা আমায় হাসতে বলছ' অরুন্ধতী গাইলেন ক্যাবারে গানে সাথেসাথে বিরহ ম্যুডে গাইলেন রানু মুখোপাধ্যায়। গানের লয় দ্রুত থেকে ধীর আবার দ্রুত।
মহুয়া স্মরণে লেখা হল 'প্রেম ও পাপ' ছবিতে সেখানেও মহুয়ার লিপে অরুন্ধতী।

অরুন্ধতী হোমচৌধুরীর একচেটিয়া বাজার শেষ হয়ে গিয়েছিল আশির দশকের শেষেই মহুয়া রায়চৌধুরীর মৃত্যুতে। খান খান হয়ে ভেঙে গেল জুটি। 'ভালবাসা ভালবাসা' ছবিতে দেবশ্রী রায়ের লিপে অরুন্ধতী যদিও সুপারহিট দিয়ে মেটাতে চেয়েছিলেন মহুয়ার অভাব। কিন্তু ১৯৮৯ এ গুরু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের প্রয়াণ শেষ পেরেকটি পুঁতে দিল। তারপর আশা ভোঁসলে লতা মঙ্গেশকরদের আবার সাম্রাজ্য বিস্তার শুরু হল টালিগঞ্জ পাড়ায়। এসে গেল আর ডি বর্মণ থেকে বাপ্পি লাহিড়ীর যুগ। পটভূমিতে অরুন্ধতী আর নেই। এমনকী তখন 'পেন্নাম কলকাতা' ছবিতে মিস শেফালির লিপে 'ধিকি ধিকি জ্বলে' গাইছেন অরুন্ধতী।
তরুণ মজুমদারের সঙ্গে বহু দশক পর অরুন্ধতী-শিবাজি 'আলো' ছবিতে রবীন্দ্রনাথের গানে কামব্যাক করেছিলেন। 'ভালবাসার অনেক নাম' ছবিতে তাঁরা সংগীত পরিচালনা করলেও চলেনি। মৌলিক গানের প্লে ব্যাকে অরুন্ধতী যুগ শেষ হয়েছিল মহুয়ার প্রস্থানে।
আটের দশকে এই গায়িকা নায়িকা সুস্থ রুচির গান যেভাবে হিট করিয়েছেন উত্তমকুমার পরবর্তী যুগে। তা ঐতিহাসিক। সেই যুগ সেই সময়কেই গানেগানে ফিরিয়ে এনেছেন অরুন্ধতী। অরুন্ধতী হোমচৌধুরী শুধুমাত্র রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী নন তিনি সফল প্লে ব্যাক গায়িকা যা নিভেছিল মহুয়ার মৃত্যুর সাথেই।