মা আমাদের নিরাপদ জীবন চেয়েছিলেন। সিনেমা জগত অনিশ্চিত। মা যে লড়াইটা করেছেন সেই কষ্ট তাঁর মেয়েরা করুক মা চাননি।

মাধবী কথায় মিমি
শেষ আপডেট: 16 May 2025 11:49
আজ মায়েদের দিন। সেলিব্রিটি মায়েরা কী বাড়িতে নন সেলিব্রিটি মায়েদের মতো থাকেন? দ্য ওয়াল মাদার'স ডে স্পেশাল আড্ডায় অধ্যাপিকা মিমি ভট্টাচার্য শোনালেন তাঁর মায়ের গল্প। তাঁর মা, জীবন্ত কিংবদন্তি মাধবী মুখোপাধ্যায়।

মাধবী মুখোপাধ্যায় মানেই 'চারুলতা', সেই আন্তর্জাতিক নায়িকাকে আপনি বাড়িতে মা রূপে কতটা পেয়েছেন?
আমি আমার মা-বাবার যৌথ জীবন থেকেই শিখেছি কাজের জগৎ আর বাড়ির জগৎকে কী ভাবে সুন্দর করে ব্যালেন্স করতে হয়। প্রথম কথা মা তো মা-ই হন। আমার মায়ের কাজের ধারা অন্যদের তুলনায় অন্যরকম ছিল। এখন তো যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে। সে যুগে মাকে আউটডোর শ্যুটিংয়ে ১৫, ২০ দিন বাইরে থাকতে হত। যদি বোলপুরেও শ্যুটিং হয় সেখান থেকে কোন যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। কখন টেলিগ্রাম করবে কেউ জানে না। সন্ধ্যেবলা আমরা দুই বোন ফোনের কাছে বসে থাকতাম তিন মিনিট যদি মায়ের সঙ্গে কথা হয়। কিন্তু ঘরেতে আমার মা সবার মতোই। মা বাড়িতে থাকলে রান্নাও করতেন, বাড়ির প্রচুর কাজ করতেন। আমরা খুব সাধারণ মধ্যবিত্তের মতো বড় হয়েছি। মায়ের নিজের জীবনে পুঁথিগত ডিগ্রি অত নেই। কিন্তু মা নিজের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে ইংরেজি সাহিত্যের বাংলা অনুবাদ বেশিরভাগ বই মা পড়ে ফেলেছেন। আমি দেখতাম মা টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে বই পড়ছেন। আমাদের বাড়িতে প্রচুর বই। যা আমাকে পড়াশোনা করতেও আরও অনুপ্রাণিত করে।

আপনার বাবা নির্মল কুমার, 'শেষের কবিতা'র নায়ক আর মা মাধবী মুখোপাধ্যায়, উত্তম-সত্যজিতের নায়িকা, দুই কিংবদন্তি বাবা-মা আপনাদের দুই বোনকে সামলাতেন কী ভাবে?
মায়ের নায়িকা জীবন বলতে গেলে আমার বাবার কথাও বলতে হয়। মা যখন শ্যুটিংয়ে বাইরে থাকতেন, বাবা আমাদের দুই বোনকে শিখিয়েছিলেন, মা কিন্তু একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন। যেটা অন্য আর পাঁচজন পারেন না। আর পাঁচজন মায়ের মতো তোমার টিফিন হয়তো সে প্রতিদিন গুছিয়ে দিতে পারছেন না, প্রাত্যহিক অনেক কাজই তোমার বন্ধুর মায়েদের মতো তিনি পারছেন না, কিন্তু মা একদিন ওমলেট করে দিলে ভাববে সেই খাবারটা কোন পাঁচতারা হোটেলের ডিশের থেকেও বেশি। বাবা আমাদের দুই বোনকে এভাবেই তৈরি করেছিলেন। আমাদের স্কুল জীবনে মা ফ্রি থাকলে তখন বাবা নিজের শ্যুটিং শিডিউল রাখতেন। কারণ আমাদের দেখতে হবে। আমাদের গরমের ছুটি বা পুজোর ছুটির সময় দু'জনেই কাজ রাখতেন। সে কারণে ক্লাস নাইন-টেন অবধি আমরা কোথাও ঘুরতে যেতে পারিনি। কোনওদিন মনে হয়নি, আমার বন্ধুরা ঘুরতে যাচ্ছে, আমরা কেন যাচ্ছি না।

মা-বাবার অনুপস্থিতিতে কাদের কাছে থাকতেন আপনারা দুই বোন মিমি আর ঝুমি?
আমাদের বাড়ির একতলায় আমার মাসি অর্থাৎ মায়ের দিদি আর মাসতুতো বোন থাকতেন। মাসি কদিন আগেই মারা গেলেন। আমার দিদিমাও আমাদের দেখতেন। দিদিমার সঙ্গে আমার সখ্যতা ছিল খুব। দিদিমা স্বয়ংসম্পূর্ণা মহিলা ছিলেন। নিজে পিয়ানো শিক্ষিকা ছিলেন। আমি যখন একাও থেকেছি বাড়িতে কখনও মনে হয়নি মা আমাকে অবহেলা করছেন! ছোট থেকেই নিজের কাজ নিজে করে নেওয়া আমরা শিখেছি। মাকেও বেরোবার সময় সাহায্য করে দিয়েছি। স্টার কিড হয়ে আমরা বাঁচিনি, খুব সাধারণ জীবন। মাদার'স ডে-র সবথেকে বড় কথা, সুরক্ষা নয়, নিজেকে শক্তিশালী করার ক্ষমতা। পরবর্তী জীবনটা তো সন্তানদের একাই বাঁচতে হয়।
মা আমাকে শিখিয়েছিলেন যেখানে তুমি কাজ করছ সেই কাজের গুরুত্ব। আমি অসুস্থ, মা আমাকে দিদার কাছে রেখে কাজে বেরোচ্ছেন, মা-র দু চোখ দিয়ে জল পড়ছে কিন্তু শ্যুটিংয়ের ডেট তো ক্যান্সেল করা যেত না। বাবা হাসপাতালে ভর্তি কিন্তু মাকে কাজে যেতে হয়েছে। এই ছোট ছোট জিনিসগুলো আমার মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। উৎপল দত্ত-র মেয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া দত্ত, পিউদি যখন সাংবাদিক জীবন শুরু করেছিলেন তখন আমাদের বাড়ি এসে মাকে সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সংসারে বা মেয়েদেরকে মা সময় দিতে পারেন না, তাতে মায়ের অপরাধবোধ হয় কিনা? মা বলেছিলেন 'হ্যাঁ হয়। মেয়েদের ফেলে শ্যুটিংয়ে বেরতে হয়।' তখন স্কুলপড়ুয়া আমি মাকে বলেছিলাম 'তোমার অপরাধবোধের কোন কারণ ছিল না, আমাদের কখনও মনেই হয়নি তুমি আমাদের জন্য কিছু করছ না!' এটা বাবার অবদান আমি বলব। খুব ছোট্ট থেকে বাবা আমাদের মাথায় মায়ের কাজের গুরুত্ব ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন।

সুচিত্রা সেন, অপর্ণা সেন, সুপ্রিয়া দেবীর মেয়েদের মতো মাধবী কন্যা সিনেমায় এলেন না কেন?
মাকে সিনেমায় আসতে হয়েছিল দারিদ্র্য থেকে। মা আমাদের নিরাপদ জীবন চেয়েছিলেন। সিনেমা জগত অনিশ্চিত। মা যে লড়াইটা করেছেন সেই কষ্ট তাঁর মেয়েরা করুক মা চাননি। আমার নিজেরও সিনেমা জগত নিয়ে মোহ ছিল না। অথচ আমি উচ্চশিক্ষায় ফিল্ম স্টাডিজ নিয়ে গবেষণা করেছি। মা-বাবা আমার উপর কিছু চাপিয়ে দেননি। আমি যখন হিউম্যানিটাইটিস বিষয় নির্বাচন করলাম, মা বিজ্ঞান পড়তে হবে বলেননি। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার বয়সের কাছাকাছি ছিলেন কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়, চূর্ণী গঙ্গোপাধ্যায়রা। কৌশিকের সঙ্গে আমি নাটক করতাম। কৌশিক একদিন বলল 'মিমি চল তোর মাকে স্ক্রিপ্ট শুনিয়ে আসি'। মা অবলীলায় কৌশিকের লেখা শুনলেন। আমি ইতিহাসের অধ্যাপিকা হওয়া মায়ের কাছে মেয়ে নায়িকা হবার থেকে অনেক গর্বের। স্টারডমের মোহ, স্টার লাইফ যাপন করতে যা যা করতে হয় সেইসবের কোনটাই আমার বাবা-মা করেননি। পার্টিতে কখনও যাইনি। অথচ মা আমাদের দুই বোনকে ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের টিকিট কেটে দিতেন। মায়ের খুব আদর্শ ছিল। ছবি হোক বা মায়ের নিজের নাটক। মা গেস্ট কার্ড নেবার সুযোগ নিতেন না। মায়ের অতিথিদের টিকিট মা নিজে পয়সা দিয়ে কাটতেন। ফিল্ম, থিয়েটার ভাল লাগার জায়গা বলে আমি এগুলো নিয়ে পড়াশোনাও করেছি। কিন্তু ছবির অফার কখনও নিইনি। গ্ল্যামার জগৎকে আমার ভীষণ মেকি লাগে। মা নিজে তো অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা করতে পারেননি, তাই আমার মনে হত আমি পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ালে মা খুশি হবেন। মায়ের সেই স্বপ্ন আমরা দুই বোন পূরণ করেছি।

মা এখন যে ধরণের রোল পান সিরিয়ালে, মাঝেমধ্যে ছবিতে, আপনার মেয়ে হিসেবে কী মনে হয় মাধবী মুখোপাধ্যায়ের আরও ভাল চরিত্র পাওয়া উচিত? আজকাল এসব সিরিয়ালে মায়ের কাজ করা সমর্থন করেন আপনি?
আমি যখন ইতিহাসের সঙ্গে মানবী বিদ্যা ও ফিল্ম স্টাডিজ নিয়ে পড়াশোনা করেছি তখন সত্যি হতবাক হয়ে গেছি মায়ের আগের সব ছবিতে অভিনয় দেখে। পরবর্তীকালে মাকে নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার কথা কেউ কিন্তু ভাবেননি। আরও ভাল রোল পেলে আমি তো খুশি হতাম। কিন্তু এই ইন্ডাস্ট্রিতে তেমন ভাববার লোক নেই। আমার মায়ের স্পিরিট যেটা ভাল লাগে অভিনেত্রী রূপে মায়ের প্রাণশক্তি। এখন খুব একটা সাধারণ সিরিয়াল মা করছেন। কিন্তু আমার ভাল লাগে মা অভিনেত্রী জীবনে এখনও রোজ বাঁচছেন, কাজে বেরোচ্ছেন। মায়ের এই বিশ্বাস কে সম্মান জানাই। তবে আমি আরও খুশি হতাম মা ভাল কাজের ক্ষেত্র পেলে।
শেষে একটা কথা বলি, মাকে কিন্তু চারুলতার বাইরে একজন ভাবতেন! তিনি ঋতুপর্ণ ঘোষ। ঋতুদা মারা যাবার ঠিক কিছুদিন আগে আমাকে ফোনে বলেছিলেন ' মিমি তোর মা এই চারুলতা হয়ে আর কতদিন থাকবে! চারু তো শুধু মাধবীর সত্ত্বা নয়! মাধুদিকে কেন্দ্র করেই আমি একটা ছবি করতে চাই। 'চারুলতা' ছাড়াও যে ছবি দিয়ে মাধবী মুখোপাধ্যায়কে দর্শক ভাববে।'
মাকে কখনও বলা হয়নি ঋতুদার এই কথাটা। আজ মায়ের দিনে এই আড্ডার মাধ্যমে মাকেও জানালাম।