বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে তেলের দাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উপর। যদি সংঘাত আরও বাড়ে এবং তেলের দাম উচ্চস্তরে থাকে, তাহলে বাজারে চাপ বজায় থাকতে পারে। তবে পরিস্থিতি যদি দ্রুত শান্ত হয়, তাহলে তেলের দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে বাজারেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ছবি (AI)
শেষ আপডেট: 19 March 2026 21:14
দ্য ওয়াল ব্যুরো: আন্তর্জাতিক অস্থিরতা আর ঘরোয়া অনিশ্চয়তার জোড়া ধাক্কায় বৃহস্পতিবার বড়সড় ধস নামল ভারতীয় শেয়ার বাজারে। দিনের শেষে সেনসেক্স ২,৪৯৬.৮৯ পয়েন্ট বা ৩.২৬ শতাংশ পড়ে দাঁড়াল ৭৪,২০৭.২৪-এ। একইসঙ্গে নিফটি ৭৭৫.৬৫ পয়েন্ট নেমে ২৩,০০২.১৫-এ বন্ধ হয়। বাজারের এই পতনের জেরে একদিনেই বিনিয়োগকারীদের প্রায় ১৩ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ উবে গেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধস কোনও একক ঘটনার ফল নয়, বরং একাধিক আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া কারণ একসঙ্গে কাজ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিয়েছে অপরিশোধিত তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়া। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের জেরে তেল ও গ্যাস পরিকাঠামোতে হামলার ঘটনা সামনে আসতেই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ১১১ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ভারতের মতো তেল আমদানিনির্ভর দেশের জন্য এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ, তেলের দাম বাড়লে আমদানি খরচ বাড়ে, মুদ্রাস্ফীতি চাপে পড়ে এবং কর্পোরেট লাভে সরাসরি প্রভাব পড়ে।
এই আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি ঘরোয়া স্তরে এইচডিএফসি ব্যাঙ্ককে ঘিরে অনিশ্চয়তাও বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ব্যাঙ্কের পার্ট-টাইম চেয়ারম্যান অতনু চক্রবর্তীর আকস্মিক ইস্তফার খবর সামনে আসার পর শেয়ারের দামে তীব্র পতন দেখা যায়। শেয়ার ৫ শতাংশের বেশি নেমে প্রায় ৮০০-র কাছাকাছি পৌঁছে যায়। দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির একটি হওয়ায় এইচডিএফসি ব্যাঙ্কের পতন গোটা বাজারের উপর চাপ বাড়িয়েছে। এর প্রভাব পড়ে অন্যান্য ব্যাঙ্কিং শেয়ারেও—অ্যাক্সিস ব্যাঙ্ক, আইসিআইসিআই ব্যাঙ্ক এবং স্টেট ব্যাঙ্ক—সবক’টিতেই বিক্রির চাপ স্পষ্ট হয়।
শুধু ব্যাঙ্কিং নয়, প্রায় সব ক্ষেত্রেই এই পতনের প্রভাব পড়ে। পরিকাঠামো সংস্থা লার্সেন অ্যান্ড টুবরো থেকে শুরু করে বাজাজ ফাইন্যান্স ও শ্রীরাম ফাইন্যান্স—সব বড় শেয়ারেই পতন লক্ষ্য করা যায়। আইটি সেক্টরেও চাপ ছিল, কারণ বিশ্ব বাজার থেকে ইতিবাচক সংকেত আসেনি। ইনফোসিস, টিসিএস ও উইপ্রোর মতো সংস্থাগুলিও নিম্নমুখী ছিল। এদিকে, তেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিমান পরিষেবা সংস্থাগুলির উপর—ইন্ডিগোর শেয়ারও ৩ শতাংশের বেশি পড়ে যায়। যদিও প্রতিরক্ষামূলক শেয়ার যেমন আইটিসি বা হিন্দুস্তান ইউনিলিভার তুলনামূলক কম পড়েছে, তবুও সেগুলিও ঋণাত্মক দিকেই ছিল। এই পরিস্থিতিতে কোল ইন্ডিয়া কিছুটা ব্যতিক্রমী ছবি দেখিয়েছে, কারণ জ্বালানির দাম বাড়লে কয়লার চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা থাকে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সাম্প্রতিক অবস্থানও বাজারে প্রভাব ফেলেছে। সুদের হার কমানোর বিষয়ে সতর্ক ইঙ্গিত দেওয়ায় তারল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে টাকা তুলতে শুরু করেছেন বলেও মনে করা হচ্ছে। এই বিক্রির চাপ বাজারকে আরও দুর্বল করে দিয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে তেলের দাম এবং মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উপর। যদি সংঘাত আরও বাড়ে এবং তেলের দাম উচ্চস্তরে থাকে, তাহলে বাজারে চাপ বজায় থাকতে পারে। তবে পরিস্থিতি যদি দ্রুত শান্ত হয়, তাহলে তেলের দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে বাজারেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, বৃহস্পতিবারের এই ধস স্পষ্ট করে দিল—ভারতের শেয়ার বাজার এখন আর শুধু দেশীয় ঘটনার উপর নির্ভরশীল নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। আগামী দিনে এই অস্থিরতা আরও কিছুটা সময় বজায় থাকতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে।