‘পুনঃপাঠ’ আর ‘নিবিড় পাঠে'র ব্র্যান্ডিংয়ের ফাঁদে পড়ে সমাজদর্শনের গড্ডলিকার চিরচেনা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে নিবিড়তর মেধার তন্তুটিকে খুঁজে পেতে চাইলে ‘বাঙালির মন’ আধুনিক বাঙালি পাঠকের অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত৷

গ্রাফিক্স: দিব্যেন্দু দাস
শেষ আপডেট: 17 February 2026 16:53
দ্য ওয়াল ব্যুরো: জাতিবাচক বিশেষ্য ‘বাঙালি’ সমাজতাত্ত্বিকদের নজরে সদাচঞ্চল, বিবর্তনশীল, প্রবহমান স্বরূপ। দশকে দশকে, যুগে যুগে এর বিন্যাস, রূপ-রং, আকার-অবয়ব বদলেছে। এই জাতিসত্তার উৎস, পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধান করেছেন বিনয় ঘোষ, নীহাররঞ্জন রায়ের মতো পণ্ডিত, বিদ্বজ্জন৷ সেখানে গূঢ় বিশ্লেষণের পাশাপাশি তালিকা আছে, কালসীমা আছে, তথ্যের পঞ্জিকা আছে৷
কিন্তু সমস্ত জরুরি পুঞ্জ সরিয়ে বাঙালির মনের খোঁজ? বহুধা-বিভক্ত বাঙালির বিখণ্ড মননের অনুসন্ধান? অনালোকিত ও অনালোচিত এই পরিসর নিয়েই লিখেছেন আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় (বই: বাঙালির মন)। শিক্ষাজীবী বাঙালি, বণিক বাঙালি, উদ্বাস্তু বাঙালি—এরকম ১০টি গোত্রে সাজানো বিচ্ছিন্ন প্রবন্ধ৷ কিন্তু লক্ষ্যমুখ একটাই—মনটিকে চিনে নেওয়া, বুঝে ফেলা!
ধরা যাক নায়কের কথা। বাঙালির নায়ক কে? কারা? সাহিত্য ঘাঁটলে কোন কোন চরিত্রে প্রতিরূপায়িত হয়েছে বাংলার শাশ্বত আত্মা? আলাপন বেছে নিয়েছেন তিনজনের নাম: শরৎচন্দ্রের দেবদাস, বিভূতিভূষণের অপু ও তারাশঙ্করের দেবু পণ্ডিত৷ প্রশ্ন উঠবে, যেমনটা তুলেছিলেন রুশতী সেন, গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে: প্রাবন্ধিকের নির্দেশিত নায়কের বাইরেও তো ছকভাঙা কোনও চরিত্র, ঈষৎ ধূসর (তিনি জগদীশ গুপ্তের ‘অসাধু সিদ্ধার্থে'র প্রসঙ্গ টেনেছিলেন, আমরা মানিকের ‘চতুষ্কোণে'র রাজকুমারের কথাও আনতে পারি)—তাঁরা কি জাতিসত্তার প্রতিকল্প নন? এককথায় সহজ জবাব: আলাপন যেহেতু এখানে একরৈখিক ইতিবৃত্ত লেখেননি, ফলে সমস্ত বৈচিত্র্য আর বক্রতার উল্লেখ থাকবে না, বলাই বাহুল্য।
কিন্তু এর বদলে যেটা প্রবন্ধাবলিতে রয়েছে, তাকে আমি বলতে চাই মেধার সূক্ষ্ম তন্তু৷ চর্বিতচর্বণের অহেতুক আঁশ না ছাড়িয়ে মর্মের গভীরে সার্চলাইট ফেলেছেন লেখক। চরিত্রকে বিচার করেছেন কালের মন্দিরায়, যুগের পাদতটে।
একটা উদাহরণ দিই৷ ‘পথের পাঁচালী’তে ক্ষুধার রাজনীতি, নিশ্চিন্দিপুরের সেকালের যথার্থ অবসান সত্যিই ইন্দিরঠাকরুণের প্রয়াণে নাকি দুর্গার আকস্মিক বিয়োগে—এই নিয়ে রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য থেকে নবারুণ ভট্টাচার্য অনেকের লেখাই পড়েছি৷ কিন্তু অপুর জীবনের অভিযাত্রাকে সামাজিক গতিশীলতার আলোকে বিচার করা, ‘অপরাজিত’ নামকরণের তির্যকতাকে ফোকাসে এনে তার পরাজয়ের খতিয়ানকে বিধৃত করে প্রায় অবরোহণমূলক যুক্তিকাঠামোয় ‘সমাজে গতি নেই, অর্থনীতি বন্ধ্যা, রাজনীতি স্তিমিত; কেবল মনের মধ্যে দূরায়ত কোনও টান আছে, অশ্রুত সঙ্গীত আছে—অপুর কাহিনি এই বিরোধাভাসের কাহিনি।’—এই অন্তিম সিদ্ধান্তে পৌঁছনো পাঠকের জন্য এক অভিনব জার্নি৷
‘ভদ্রলোকের সংকট’ রচনাটিও বিশেষ অভিনিবেশের দাবি রাখে। কারা ভদ্রলোক নন, ভদ্রলোক কীভাবে গড়ে উঠেছিলেন—জানিয়ে অত:পর সংকটের স্বরূপ অনুসন্ধান। ইউরোপীয় রাষ্ট্রতত্ত্বের আত্মাকে কাজে লাগিয়েও একেবারে বাংলার জল-মাটি-হাওয়ায় নিষ্ণাত যুক্তিকাঠামোর অনুপম প্রয়োগ৷ যার ফলশ্রুতি হিসেবে একটি অংশ উদ্ধৃত করতে চাই: ‘একবিংশ শতকের প্রথম দশকের শেষদিকে সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের কথা বহু-আলোচিত৷ কিন্তু ওই সময় যে অনগ্রসর এবং দলিত বর্ণগুলির বিপুল শক্তিসঞ্চার হয়েছিল (এবং জঙ্গলমহল ও ডুয়ার্সে আদিবাসীরাও সংহত হয়েছিলেন)—সেকথা তুলনায় কম-আলোচিত৷ ওই সময় বামপন্থী রাষ্ট্রজীবী ভদ্রলোকের শক্তিক্ষয়ের একটা বড় কারণ ছিল সমাজের নিম্নবর্ণের উত্থান। বামপন্থীদের বিপর্যয়ের পিছনে একটা উপাদান ছিল কমিউনিস্ট ভদ্রলোক-চালিত বর্ণ-সমবায়ের ফাটল।’ শুধুই পাশ্চাত্যের তাত্ত্বিক প্রস্থানে এই ‘চোখ’ তৈরি হওয়া অসম্ভব৷
একই তির্যকতায় অন্তর্দৃষ্টিমূলক প্রবন্ধ ‘সন্ন্যাসীর মন-২’, যেখানে রামকৃষ্ণ মিশন ও ভারত সেবাশ্রমের দর্শন ও কর্মের তুল্যমূল্য আলোচনা বিধৃত৷ মিল: দুই সংঘেই বীর্যচিন্তায় প্রবল গুরুত্ব আরোপ৷ অমিল: দ্বন্দ্ববাদে। রামকৃষ্ণ মিশনে যেখানে সংঘাতের শিকড় পূর্ব বনাম পশ্চিমের, ভারত সেবাশ্রমে সেটাই বদলে যায় হিন্দু-মুসলিমে৷ ‘উদ্বাস্তুর মন’ প্রবন্ধে আলাপন শুধুই প্রথাগত দেশভাগের ট্রমা নিয়ে কথা বলেননি, তর্ক তুলেছেন ‘ভাগাভাগির নেশা’ নিয়েও৷ হাংরি আন্দোলন, নকশাল আন্দোলনের ‘পিতৃমাতৃঘাতী ক্রোধে'র কারণ কি তলায় সুপ্ত দেশভাগের দু:খ নয়? সর্বব্যাপী ভাঙনের নেশা আর আত্মার মৃত্যুবোধও কি দেশভাগজনিত?—পাঠকের কৌতূহল ও বিস্ময়কে যুগপৎ উদ্দীপ্ত করবে এ ধরনের সওয়াল৷
তালিকা আর লম্বা করতে চাইছি না। আশা করব, পাঠক বুঝে গেছেন, এই গ্রন্থ তথ্যের পুঞ্জ আর তত্ত্বের মেদকে বিশ্লিষ্ট করে ‘অ-ভাবনীয়’ যুক্তির পথ ধরে বাঙালির বহুবর্গীয় মনের ছানবিন চালিয়েছে৷ লেখকের নজর তেরছা, পরিবেশনের পন্থা এতদিনের বাঁধা সড়ক বেয়ে এগয়নি বলেই হয়তো একটা ঝাঁকুনি দিতে পারে। কিন্তু সেই কম্পন পাঠশেষে মনোরম এবং অবশ্যই জরুরিও বটে। ‘পুনঃপাঠ’ আর ‘নিবিড় পাঠে'র ব্র্যান্ডিংয়ের ফাঁদে পড়ে সমাজদর্শনের গড্ডলিকার চিরচেনা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে নিবিড়তর মেধার তন্তুটিকে খুঁজে পেতে চাইলে ‘বাঙালির মন’ আধুনিক বাঙালি পাঠকের অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত৷
বাঙালির মন
লেখক: আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রকাশক: দে'জ পাবলিশিং
দাম: ৪০০ টাকা