Date : 14th Apr, 2026 | Call 1800 452 567 | info@thewall.in
পয়লা Weather: বৈশাখে ঘামঝরা আবহাওয়া! দক্ষিণবঙ্গে তাপপ্রবাহের হলুদ সতর্কতা, আবার কবে বৃষ্টি?হরমুজ ঘিরে ফেলল মার্কিন সেনা! ইরানের 'শ্বাসরোধ' করতে ঝুঁকির মুখে আমেরিকাও, চাপে বিশ্ব অর্থনীতি'ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করা যাবে না', আইপ্যাক ডিরেক্টরের গ্রেফতারিতে বিজেপিকে হুঁশিয়ারি অভিষেকেরভোটের মুখে ইডির বড় পদক্ষেপ! কয়লা পাচার মামলায় গ্রেফতার আইপ্যাক ডিরেক্টর ভিনেশ চান্ডেলমহাকাশে হবে ক্যানসারের চিকিৎসা! ল্যাবের সরঞ্জাম নিয়ে পাড়ি দিল নাসার ‘সিগনাস এক্সএল’সঞ্জু-রোহিতদের পেছনে ফেলে শীর্ষে অভিষেক! রেকর্ড গড়েও কেন মন খারাপ হায়দ্রাবাদ শিবিরের?আইপিএল ২০২৬-এর সূচিতে হঠাৎ বদল! নির্বাচনের কারণে এই ম্যাচের ভেন্যু বদলে দিল বিসিসিআইWest Bengal Election 2026 | হার-জিত ভাবিনা, তামান্না তো ফিরবেনা!সুস্থ সমাজ গড়াই লক্ষ্য: শহর ও মফস্বলে স্বাস্থ্য শিবিরের মাধ্যমে সাধারণের পাশে ডিসান হাসপাতালWest Bengal Election 2026 | আবেগের বশেই ‘হুমকি’ দিই শুভেন্দু ‘অপেরা’ করলে পারত!

বিত্তশোভিত বাংলার ইতিবৃত্ত ‘লক্ষ্মীপুরুষ’: বাণিজ্য-বিমুখ বাঙালির অতীতদর্শনের আয়না

লেখার পাশাপাশি রেখায় সজ্জিত। প্রচুর ছবি। কোনওটা স্কেচ, কোনওটা ফোটগ্রাফ। সবমিলিয়ে পুঞ্জীভূত তথ্যের সমাহার নয়, অনিন্দ্যসুন্দর গ্রন্থনির্মাণ সদ্যপ্রকাশিত ‘লক্ষ্মীপুরুষ’। 

বিত্তশোভিত বাংলার ইতিবৃত্ত ‘লক্ষ্মীপুরুষ’: বাণিজ্য-বিমুখ বাঙালির অতীতদর্শনের আয়না

বই: লক্ষ্মীপুরুষ

রূপক মিশ্র

শেষ আপডেট: 4 February 2026 10:45

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাণিজ্যে প্রাচীন বাংলার ইতিহাস উজ্জ্বল। ব্যবসাতেই লক্ষ্মীর বসত—উল্লেখ প্রবাদে। প্রাচীন বঙ্গে (খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকে গুপ্ত ও পাল আমল) যার গৌরব সমৃদ্ধ করে তোলেন সুবর্ণবণিক, গন্ধবণিক, তাম্বুলী ও মোদক শ্রেণির ব্যবসায়ীরা। যাঁরা রেশম, মসলিন, রত্ন ও পান-সুপারির ব্যবসা করতেন। পুণ্ড্রবর্ধনের বণিকরা মসলিন ও হীরা বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত। তাম্রলিপ্ত ও চন্দকেতুগড় বন্দরের মাধ্যমে প্রাচীন বাংলার বণিকরা দূরদেশে বাণিজ্যের নেতৃত্ব দেন। সুবর্ণবণিকরা প্রাচীন বাংলায় সোনা আমদানি-রপ্তানিতে অত্যন্ত প্রভাব বিস্তার করেন। গন্ধবণিক ও তাম্বুলীরা জড়িত ছিলেন সুগন্ধি দ্রব্য, মশলা এবং পান-সুপারি ব্যবসার সঙ্গে।

কিন্তু এরপরই ধাপে ধাপে চূড়ান্ত অবক্ষয়৷ গুরুত্বপূর্ণ কারণ প্রাকৃতিক৷ ভাগীরথী ও সরস্বতী নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং পলি জমার ফলে বিখ্যাত তাম্রলিপ্ত (বর্তমান তমলুক) বন্দর নাব্যতা হারানোয় বড় বড় সামুদ্রিক জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করতে পারত না। যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় আঘাত হানে৷ এ ছাড়া গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর বাংলায় দীর্ঘকাল অরাজকতাজনিত (মাৎস্যন্যায়) রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ নষ্ট হয়৷ পরবর্তীকালে পাল ও সেন আমলে সমাজ অনেকটা কৃষিনির্ভর ও সামন্ততান্ত্রিক হয়ে পড়ায় ব্যবসায়িক পুঁজির বদলে ভূমিনির্ভর অর্থনীতি গুরুত্ব পায়৷ যার জেরে বণিকদের প্রভাব কমতে শুরু করে৷

কিন্তু ঔপনিবেশিক আমলে বদলে যায় অঙ্ক। বিদেশি শক্তির আধিপত্যের মধ্যেও বাঙালিরা নিজেদের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে এক অভাবনীয় অর্থনৈতিক পুনরুত্থান ঘটিয়ে ফেলেন। বাণিজ্যের পুরনো ধারা ভেঙে আধুনিক পুঁজিবাদের পথে বাঙালি উদ্যোক্তাদের এই যাত্রার মূল কারিগর ছিলেন কয়েকজন কিংবদন্তি উদ্যোগপতি। তাঁদের মধ্যে নির্বাচিত কয়েকজন যুগপুরুষের কথা বর্ণিত হয়েছে ‘লক্ষ্মীপুরুষ’ গ্রন্থে৷ লেখক বিশিষ্ট সাংবাদিক অশোক বসু। গবেষণা, তথ্যসংগ্রহ, গ্রন্থনা ও পরিবেশনায় পাপড়ি দাস ও শিপ্রা সেনগুপ্ত৷ প্রকাশক পিসি চন্দ্র গ্রুপ ও দে'জ পাবলিশিং।

ইতিহাস বলে, কোম্পানি আমলে ব্রিটিশদের পাশাপাশি ফরাসি ও মার্কিন বণিকদের পদচারণা শুরু হলে বাঙালিরা 'মুৎসুদ্দি' বা 'বেনিয়ান' (মধ্যস্থতাকারী) হিসেবে ব্যবসায় প্রবেশ করেন। এই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে নিজস্ব শিল্প গড়ে তুলতে সহায়তা করে। তাঁদের অন্যতম রামদুলাল দে সরকার (১৭৫২-১৮২৫)। বাংলার প্রথম কোটিপতি বা 'মিলিয়নেয়ার'। ভারত-আমেরিকা সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান মধ্যস্থতাকারী। মার্কিন বণিকদের আস্থা এতটাই ছিল, যে তারা নিজেদের জাহাজের নাম রেখেছিলেন রামদুলালের নামে। আধুনিক পেনসন ব্যবস্থা এবং কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (CSR) পথিকৃৎও তিনি। এহেন বর্ণময় জীবনের সংঘর্ষময় কাহিনি গল্পচ্ছলে লেখা প্রথম অধ্যায়ে৷

এসেছে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের জীবন ইতিহাস৷ দেখতে গেলে প্রথম আধুনিক বাঙালি শিল্পপতি। ১৮৩৪ সালে 'কার, ঠাকুর অ্যান্ড কোম্পানি' গড়ে তোলেন, বাঙালির প্রথম যৌথ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কয়লা খনি (বেঙ্গল কোল কোম্পানি), জাহাজ চলাচল, চা বাগান এবং ব্যাংকিং শিল্পে তিনি কীভাবে বাংলার আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তার সুলিখিত বিবরণ বাঙালি পাঠককে প্রাণিত করবে।

মতিলাল শীল (১৭৯২-১৮৫৪), যাঁকে কলকাতার 'রথচাইল্ড' বলা হত, তিনি নীল, রেশম এবং চালের ব্যবসায় অঢেল সম্পদ অর্জন করেন। ভারতের প্রথম জীবন বীমা কোম্পানি এবং 'ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া' প্রতিষ্ঠায় তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। শিক্ষাবিস্তারেও অবদান অপরিসীম। মতিলালের ধাপে ধাপে ‘লক্ষ্মীপুরুষ’ হয়ে ওঠার প্রায় সিনেম্যাটিক বিবরণ গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে।

একই রকম যত্নে লিখিত রাজেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের (১৮৫৪-১৯৩৬): ইতিহাস। আধুনিক কলকাতার স্থপতি তিনি। 'মার্টিন অ্যান্ড কোম্পানি'র ছায়ায় ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল এবং হাওড়া ব্রিজের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনার সঙ্গে যুক্ত৷ এ ছাড়াও 'মার্টিন লাইট রেলওয়ে' এবং 'ইস্কো' (IISCO) ইস্পাত কারখানা তৈরির মাধ্যমে আনেন ভারী শিল্পে বিপ্লব।

সুখপাঠ্য অধ্যায় বটকৃষ্ণ পাল (১৮৩৫-১৯১৪)।  বাংলার ওষুধ শিল্পের পথিকৃৎ। 'বি. কে. পাল অ্যান্ড কোম্পানি' প্রতিষ্ঠা করে দেশীয় ভেষজ ও আধুনিক অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের মেলবন্ধন ঘটান। তাঁর তৈরি 'এডওয়ার্ডস টনিক' ম্যালেরিয়া নিরাময়ে সেই সময় বিপ্লব এনেছিল।

আরেক সফল, যুগন্ধর উদ্যোগপতি আলামোহন দাশ (১৮৯৫-১৯৬৯)। হাওড়ার শিল্পনগরী 'দাসনগরে'র প্রতিষ্ঠাতা৷ 'ইন্ডিয়া মেশিনারি কোম্পানি' স্থাপন করে দেখিয়েছিলেন, বাঙালিরাও ভারী যন্ত্রপাতি তৈরি করতে পারে। তুলা, পাট এবং ব্যাংকিং শিল্পেও তাঁর বিশেষে অধিকার ছিল।

এমনই নির্বাচিত সাতজন ব্যাবসায়ীর জীবনের অনুপম রেখাচিত্র এই গ্রন্থ৷ লেখার পাশাপাশি রেখায় সজ্জিত। প্রচুর ছবি। কোনওটা স্কেচ, কোনওটা ফোটগ্রাফ। সবমিলিয়ে পুঞ্জীভূত তথ্যের সমাহার নয়, অনিন্দ্যসুন্দর গ্রন্থনির্মাণ সদ্যপ্রকাশিত ‘লক্ষ্মীপুরুষ’। যা হাতে তুলে নিলে ইতিহাসবিস্মৃত যে-বাঙালি বাণিজ্য-বিমুখ বলে ধিক্কৃত, তাদের কাউকে পেশাবদলে, কাউকে পেশাগ্রহণে প্রাণিত করবে।

‘লক্ষ্মীপুরুষ’
অশোক বসু
পি সি চন্দ্র গ্রুপ, দে'জ পাবলিশিং 
প্রচ্ছদ: পিএমজি পাবলিকেশনস্‌ 
দাম: ৭০০ টাকা


```