কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে আধুনিক ছোটগল্পের ভাষা ও প্রকরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলে উজ্জ্বল সিনহার গল্পসংকলন ‘নিরুদ্দিষ্ট’।

উজ্জ্বল সিনহার নতুন বই ‘নিরুদ্দিষ্ট’
শেষ আপডেট: 27 January 2026 22:05
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে মাথায় একটা প্রশ্ন প্রায়শই ঘুরপাক খায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জমানায় কীভাবে লেখা উচিত ‘আধুনিক ছোটগল্প’? কী হবে ভাষা? কেমন দাঁড়াবে তার প্রকরণ? বিষয়বস্তু কি শুধু সমসাময়িকতাকেই স্পর্শ করবে? নাকি অতীত, বিগত, প্রাচীন যা কিছু—উপাদান হিসেবে আসবে সবই? ‘ক্রেভিং’, ‘প্রম্পট’, ‘গ্যাসলাইটিং’, ‘হুক আপে’র প্রজন্ম কি ‘মুলোবাঁশের লাঠি’ বোঝে? ‘মেদুর, গলে গলে পড়া, ঘি-রঙের জোৎস্না নেমে আসছে…’—পড়তে পড়তে অবচেতনে একটা আধচেনা শিহরণ খেলে যায়? ‘তুলতুলে সোহাগ’, ‘কাঁসার থালায় জুঁইফুলের মতো ভাত’—গোছের উপমা দেওয়াটা কি লেখকের পণ্ডশ্রম? পাঠক হারানোর ভয় কাজ করে না?
উজ্জ্বল সিনহার সাম্প্রতিকতম বই, গল্প সংকলন ‘নিরুদ্দিষ্ট’, পড়তে বসে সওয়ালগুলো জাগছে যখন, তখনই বরাভয় জোগান প্রমথ চৌধুরী। ‘সাহিত্যের উদ্দেশ্য সকলকে আনন্দ দেওয়া, কারো মনোরঞ্জন করা নয়। এ দুয়ের ভিতর যে আকাশ-পাতাল প্রভেদ আছে, সেইটি ভুলে গেলেই লেখকেরা নিজে খেলা না করে পরের জন্যে খেলনা তৈরি করতে বসেন। সমাজের মনোরঞ্জন করতে গেলে সাহিত্য যে স্বধর্মচ্যুত হয়ে পড়ে, তার প্রমাণ বাংলাদেশে আজ দুর্লভ নয়।’—বক্তব্যে সমস্ত উত্তর লুকিয়ে। সমসাময়িকতা আর আধুনিকতা এক নয়। একদিকে সময়ের গন্ধ, দাগছোপ মিশে৷ অন্যদিকে কালের স্তর উত্তীর্ণ করার শক্তি। উজ্জ্বল সিনহার গল্পগুলি সমসাময়িকতা, ভৌগোলিকতা—সবকিছুর সীমা ডিঙিয়ে এক অখণ্ড আততির জন্ম দেয়৷
ধরা যাক ‘বাজখেকো’-র কথা। হরিহরকে গ্রামের লোকেরা এই নামে ডাকে। ঝড়বৃষ্টির সময় সে গিয়ে দাঁড়ায় ধু-ধু মাঠের মাঝখানে। মনেপ্রাণে চায় বাজ ধেয়ে আসুক ওর দিকে। সেঁধিয়ে যাক মগজে। গগনভেদী বজ্র গিলে খায় হরিহর৷ তাই নাকি ‘পালটে গিয়ে অমন সুন্দর হয়েছে চেহারাটা’!
লোকশ্রুতি, গুজব এখানে মোটিফ৷ তুলনীয় না হলেও মনে পড়তে বাধ্য মহাশ্বেতা দেবীর ‘ঝোড়ো সাধু’, হাসান আজিজুল হকের ‘তৃষ্ণা’ কিংবা ‘শকুন’৷ বিচিত্র অ্যানেকডোট অস্ত্র৷ পাঠকের মনোযোগ টানার। কিন্তু সেটা আলম্বন মাত্র। আসল গন্তব্য, গভীরতর সত্যের দিকে যাত্রা। হরিহরের আত্ম-অনুভূতি, মনের চোরাকুঠুরিতে আলো ফেলাই মূল অন্বিষ্ট। একদিকে লটারিতে কোটি টাকা জেতার পর অদ্ভুত দুশ্চিন্তা, প্রথমবারের জন্য মাথায় বাজ ভেঙে পড়া, অত বড় টাকা কে ভাঙিয়ে দেবে ভেবে বুকচাপা ভয় জাঁকিয়ে বসা, অন্যদিকে কৃষ্ণবর্ণ উত্তাল মেঘ দেখে কৃষ্ণপ্রেমে বিভোর হয়ে ছুটে চলার বাসনা—দুইয়ের টানাপড়েনে গল্পের শেষে নাতির হাত ধরে হরিহরের হেঁটে চলা ঘনিয়ে আনে ইঙ্গিতময় সমাপ্তি।
‘সাঁঝরসে'র পটভূমিও গ্রামবাংলা। কিন্তু এই গল্পটি পুরোদস্তুর ‘অ্যাটমোস্ফেরিক’। কাব্যিক ঢঙে লেখা। কিন্তু এলায়িত নয়৷ বরং, স্নায়ুতে তরঙ্গ তোলে জলাশয় থেকে বিনিদ্রায় ভোগা মাছের অকারণ ঘাই মারার আওয়াজ, তালকানা গুবরেপোকার একটানা আর্তনাদ৷ রৌদ্রের তেজ নয়, ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলা-র দিকে পাঠককে টেনে নিয়ে গিয়েছিলেন জীবনানন্দ। তুল্য ইন্দ্রিয়বিপর্যাসের এক অদ্ভুত আলেখ্য এই গল্প৷ হাতেগোনা সংলাপ, মাত্র দুজন চরিত্র, কী সামান্য-সরল প্লট অথচ অস্তিত্বের কী গহন চৌহদ্দিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন লেখক!
সুখপাঠ্য আখ্যান ‘যাতায়াত’। বিষয়বস্তু নগর জীবন। ছেড়ে যাওয়া আবার ফিরে আসার নাগরিক উচাটন। সংকলন যেহেতু, তাই প্লটে প্রত্যাশিত বৈচিত্র্য মজুত। একদিকে ‘খাসি’-তে প্রবৃত্তি, রিপু আর চিরন্তন অনুভূতির দ্বন্দ্ব, অন্যদিকে ‘বৈতরণী'-তে একাকীত্ব, ‘উড়োচিঠি’-তে অস্তিত্বের সংকট জীবন্ত। কিন্তু সব মিলিয়ে দেখলে একটি লেখাও অভিজ্ঞতা-বিচ্ছিন্ন নয়৷ ইতোপূর্বে প্রকাশিত উজ্জ্বলের দুটি উপন্যাস ‘কালোদিঘি’ ও ‘উজানযাত্রা’-য় যে আত্মজৈবনিকতা উপাদান হিসেবে এসেছে, তারই প্রলম্বিত বিস্তার এই সদ্যপ্রকাশিত ছোটগল্প সংকলন। যে পাঠক আখ্যানে কুক্ষিগত সময়ের বদলে চিরন্তন মানবরসের সন্ধান করেন, ‘নিরুদ্দিষ্ট’ তার প্রত্যাশিত গন্তব্য হওয়া উচিত৷
’নিরুদ্দিষ্ট’
উজ্জ্বল সিনহা
প্রকাশক: দে'জ পাবলিশিং
অলংকরণ: পৌলমী গুহ
দাম: ২৯৯ টাকা