লন্ডনের হোটেলে মহম্মদ ইউনুস (Md Yunus) ও তারেক জিয়ার (Tarek Zia) বৈঠক ঘিরে নানা মহলে প্রশ্ন, আলোচ্য বিষয় নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব এবং ফলাফল ঘিরে সন্দেহ বিরাজ করছে।

মহম্মদ ইউনুস, শেখ হাসিনা।
শেষ আপডেট: 15 June 2025 14:39
লন্ডনের হোটেলে মহম্মদ ইউনুস (Md Yunus) ও তারেক জিয়ার (Tarek Zia) বৈঠক ঘিরে নানা মহলে প্রশ্ন, আলোচ্য বিষয় নিয়ে স্বচ্ছতার অভাব এবং ফলাফল ঘিরে সন্দেহ বিরাজ করছে। তবে এই বৈঠক বাংলাদেশের রাজনীতিতে, বিশেষ করে আওয়ামী লিগের (Awami League) অন্দরে একটি ধারণা আপাতত মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে। দেশে, দেশের বাইরে অবস্থানকারী এই দলের নেতাদের অনেককেই আমি বলতে শুনেছি, ‘ওরা (বিএনপি ও সরকার পক্ষ) নিজেরা, নিজেরা মারামারি করে মরবে।’ লন্ডনের বৈঠক প্রমাণ করল, আওয়ামী লিগের ওই নেতাদের ভাববাদী ধারণা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।
আমি বাংলাদেশের রাজনীতির সামান্য পর্যবেক্ষক। আমার ঠিক উল্টোটা মনে হত। যে কারণে দ্য ওয়াল-এ আমার ভিডিওগুলি যাঁরা নিয়মিত দেখেন, লেখাপত্র পড়েন তাঁরা আশাকরি অনুধাবণ করেছেন, আমি সম্ভবত দু’দেশের মিডিয়ায় একমাত্র সাংবাদিক যে লাগাতার এই প্রশ্ন তুলে গিয়েছি, কেন অম্তর্বর্তী সরকার সম্পর্কে মানুষের জনআকাঙ্ক্ষা জনঅসন্তোষে পরিণত হওয়ার পরও বিএনপি-র গর্জনের তুলনায় বর্ষণ কম। আমি বলতে চেয়েছিলাম, দু-পক্ষ তলে তলে বোঝাপড়া করে চলছে।
আবার একথাও ঠিক, ইউনুসকে ঘিরে তৈরি হওয়া শক্তিবলয় নতুন দেশ গড়ার নামে ৭১-এর শিকড় উপরে ফেলতে উদ্যোগী, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে ইসলামিক খিলাফত প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর, তাদের মোকাবিলায় বিপরীত মেরুর দুই দল বিএনপি ও আওয়ামী লিগের বোঝাপড়ার রাস্তা অনুসন্ধানের কথাও আমি বলেছি।
এই উপমহাদেশে এমন বোঝাপড়ার দৃষ্টান্ত অসংখ্য। পাকিস্তানে পিপিপি এবং মুসলিম লিগ (নওয়াজ) একত্রে সরকার চালাচ্ছে। ভারতে কংগ্রেস ও বামপন্থীরা, যাঁরা পরস্পরকে চিরশত্রু মনে করত, তারাও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঠেকাতে কাছাকাছি এসেছে। এমনকী বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার দল একাধিকবার অভিন্ন ইস্যুতে পাশাপাশি হেঁটেছে।
আমার মনে হয় না বাংলাদেশে তেমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে। মহম্মদ ইউনুস ও তারেক জিয়ার বোঝাপড়া দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা কম, এমনকী অচিরেই ভেঙে যেতে পারে, কারণ তাঁদের করমর্দণের মধ্যে কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শ নেই। এই সন্ধি আসলে আমেরিকার স্বার্থরক্ষায় তাদেরই নির্দেশিত পথে হল। সেই কারণে লন্ডনে ইউনুস-তারেক বৈঠক ভবিষ্যতে, এমনকী অদূর ভবিষ্যতেই ভেঙে যাওয়া অসম্ভব নয়। ইউনুস আসলে বিএনপির রাস্তায় নামা আটকাতে তারেকের সঙ্গে কোলাকুলি সেরে এলেন। বিএনপির জন্য লন্ডন ইভেন্ট ঐতিহাসিক ভুল প্রতিপন্ন হবে যখন ভোটের আগে মহম্মদ ইউনুস ঝুলি থেকে নতুন নতুন মার্কিন এজেন্ডা সামনে আনবেন।
বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতি এবং একত্রে সাংবাদিক বৈঠক করে বিএনপি-র কর্মী-সমর্থকদের সামনে নির্বাচন নামক মুলো ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে মূলত ‘লন্ডন ডায়লগের’ রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দেখাতে। দেড়ঘণ্টার বৈঠকে শুধুই ভোট নিয়ে কথা হল, ভাবার কোনও অবকাশ নেই। দেশের ভোট নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা এবং বিএনপি নেতার বৈঠকটি যেভাবে বিদেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত হল তাতে তাঁদের স্বার্থরক্ষা হলেও হতে পারে, কিন্তু ধুলোয় মিশল দেশের সম্মান। দেশের থেকে দল বড়, সেই বার্তাই উঠে এই বৈঠকটি থেকে। মহম্মদ ইউনুস তাঁর উপর অর্পিত মার্কিন অ্যাসাইনমেন্ট মেনে কাজ করতে গিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মর্যাদা ধূলিসাৎ করলেন দ্বিতীয় একটি দেশে গিয়ে বিএনপি নেতার সঙ্গে দর কষাকষি, ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারার বৈঠকটি করে, যে নেতা কিনা দুর্নীতিতে অভিযুক্ত হওয়ায় দেশ ছেড়ে লন্ডনে আশ্রয় নিয়েছেন।
তারেক জিয়াই বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী, এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে তেমন একটি ন্যারেটিভ আরও জোরদার হল বটে, স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা লন্ডনে গিয়ে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করায়। দেড় ঘণ্টার বৈঠকে তাঁদের বোঝাপড়া কতদূর গড়িয়েছে ধীরে ধীরে তা স্পষ্ট হবে। তবে দিন পনেরো আগেও বিএনপি যে নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের পদত্যাগ দাবি করেছিল, বৈঠকে তাঁর আগাগোড়া উপস্থিতি প্রমাণ করে নিছক নির্বাচন নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাহিদা মেটাতে মিলিটারি করিডর দেওয়া এবং চট্টগ্রাম বন্দর সহ একাধিক সরকারি স্থাপনা বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়েও বিএনপি নেতার সম্মতি আদায় করে নিয়েছেন ইউনুস। বিনিময়ে তিনি এপ্রিলের পরিবর্তে ফেব্রুয়ারিতে ভোট করার শর্তাধীন আশ্বাস দিয়েছেন। তারেক জিয়ার অতীত কীর্তিকলাপ নিয়ে ঢাকার আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রদূতের গোপন রিপোর্টের ভিত্তিতে মার্কিন প্রশাসনের বিএনপি নেতাকে নিয়ে আপত্তিগুলি প্রত্যাহারে নিশ্চয়ই সহায়তার আশ্বাস দিয়ে থাকবেন ইউনুস।
ঢাকার এক সাংবাদিক বন্ধু জেনেছেন, বৈঠকে তারেক জিয়া প্রধান উপদেষ্টাকে বলেছেন, আমরা সরকার গড়ার পর আপনিও আমাদের সঙ্গে থাকবেন। জানা যাচ্ছে, দুই শিবিরের বোঝাপড়াগুলি হল, তারেক জিয়া প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ইউনুস। জামাতের শীর্ষ নেতা শফিকুর রহমান শেষ পর্যন্ত উপরাষ্ট্রপতি হতে রাজি হবেন, নাকি বিরোধী দলনেতার পদে বসতে চাইবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়। যেমন বিএনপি-র একাংশ খালেদা ও তারককে সামনে রেখে বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কা মডেল দেখতে আগ্রহী। অর্থাৎ খালেদা জিয়া প্রেসিডেন্ট, তারেক প্রধানমন্ত্রী। তিন দশক আগে শ্রীলঙ্কায় মেয়ে ও মা যথাক্রমে চন্দ্রিকা কুমারতুঙ্গা এবং সিরিমাভো বন্দরনায়েক দুই শীর্ষ পদে বসেছিলেন।
যদিও বিএনপি এবং ইউনুসের স্বপ্নপূরণের পথে অনেক ‘যদি’, ‘কিন্তু’-র মীমাংসা হওয়া জরুরি। জামাত এবং ইউনুসের অলিখিত দল এনসিপি-র চাহিদা মতো বিএনপি জাতীয় সংসদে আসন ছাড়তে রাজি হবে কিনা, তাঁদের পরিকল্পনা মতো শাসকের সমর্থনে জিতে বিরোধী আসনে বসার বাসনা পূরণ হবে কিনা, এখনই বলা মুশকিল। ভোট আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির গোড়ায় হচ্ছে ধরে নিলেও বলতে হয় পরিস্থিতি উল্টে যাওয়ার জন্য আগামী আট-সাড়ে আট মাস বেশি যেমন নয়, উপেক্ষা করার মতো কমও নয়।
কানাডার প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাঁক্রোর পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমার প্রধান উপদেষ্টা মহম্মদ ইউনুসের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করলেন। আমার ধারণা, আওয়ামী লিগকে এক কলমের খোঁচায় একপ্রকার নিষিদ্ধ করে দেওয়া, নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার হরণ, ওই দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে জেলে পুরে রাখা, মব ভায়োলেন্স, শত শত সাংবাদিককে জেলে আটকে রাখা, হাজার হাজার সাংবাদিকের চাকরি কেড়ে নেওয়া, উপদেষ্টাকে অস্বস্তিকর প্রশ্ন করায় চাকরি খেয়ে নেওয়ার ঘটনাগুলি নিয়ে আন্তর্জাতিক দুনিয়া আগামী দিনে সরব হবে। ইউনুসের মধ্যস্থতায় বিএনপি-জামাত-এনসিপির বোঝাপড়ার প্রতিবাদে অনেক দলের নির্বাচন বয়কটও অসম্ভব নয়। তখন আওয়ামী লিগকে ছাড়া নির্বাচনের বৈধতার প্রশ্নটি আরও জোরালো হতে বাধ্য। ফলে লন্ডনের বৈঠক ঘিরে ক্ষমতার একমুখী মেরুকরণের যে কৃত্রিম বাতাস বইয়ে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়েছে, শেষ পর্যন্ত তা কতদিন বহমান থাকবে বলা মুশকিল।
আমার পর্যবেক্ষণ বলে, ইউনুস-তারেক অঙ্ক না মেলার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ, পরিস্থিতি না বুঝে যে তরুণ ও যুব সমাজ এবং গরিব-মধ্যবিত্ত নাগরিক শেখ হাসিনাকে হটাতে তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানে শামিল হয়েছিলেন, তারা এতদিনে বুঝে গিয়েছেন, বিগত দশ মাসে সবচেয়ে বেশি প্রতারিত তারাই। এই নীতিনিষ্ঠ জনগণ এখন চোখের সামনে তারা দেখছেন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের নামে কীভাবে ক্ষমতা ভাগাভাগির খেলা শুরু হয়েছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন অস্বীকার করে কীভাবে ভোটকে প্রহসনে পরিণত করার চেষ্টা চলছে। সব মিলিয়ে দিন যত গড়াবে, আওয়ামী লিগের জন্য পরিস্থিতি অনূকূল হতে পারে।
দিন কয়েক আগে আমাকে ঢাকার এক সনামধন্য, গুণি সাংবাদিক, যিনি শেখ হাসিনার সময়ে সরকারের কুনজরে পড়েছিলেন এবং আওয়ামী লিগের ঘোর নিন্দুক, এমন একাধিক নেতা বলেছেন, তথাকথিত গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দশ মাসে আওয়ামী লিগের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ-অসন্তোষ একশো থেকে কমে দশে নেমে এসেছে। সেই সঙ্গে তাঁরা আক্ষেপ করেছেন, আওয়ামী লিগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরাও সাহস অর্জন করে অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের হল, তাঁদের নেতৃত্ব দেওয়ার কেউ কেউ। সেই দূরদর্শী সাংবাদিকের কথায়, ‘আওয়ামী লিগের ফসল জমিতে পড়ে থেকে পচে যাচ্ছে। কাটার লোক নেই।’
আমার মতে, মাত্র দশ মাসে পরিস্থিতির গুণগত পরিবতর্ণ হওয়ার কারণ দুটি। এক. ইউনুস জমানার অনাচার এবং বিএনপির আন্দোলন বিমুখ থাকা। দুই. মুক্তিযুদ্ধ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলিকে পদে পদে অবমাননা। আম আদমি আকাশকুসুম প্রত্যাশা করে না। তারা মন্দের ভাল সন্ধান করে। ইউনুসের দশ মাসে তাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। যে কারণে রব উঠেছে, ‘হাসিনাই ভাল ছিল।’
প্রশ্ন হল, শেখ হাসিনার দল কি এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে প্রস্তুত। আমার মতে, দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন বাতিলের সিদ্ধান্ত আওয়ামী লিগের জন্য তেমন কঠিন এবং নতুন পরিস্থিতি নয়। অতীতে এমন পরিস্থিতি তারা একাধিকবার মোকাবিলা করেছে। এক নেতার কথায়, ‘আমরা কখনও আন্দোলনের কাছে হারিনি, হেরেছি ষড়যন্ত্রের কাছে।’ আমি সেই নেতাকেও বলেছি, অতীতের তুলনায় এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। গণঅভ্যুত্থান সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র হলেও সেটি সংঘঠিত হয়েছে আওয়ামী লিগের পনেরো বছরের শাসনামলের কিছু অপকৃতির বিরুদ্ধে। কিন্তু বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের পুরনো এই দলটির নেতারা তা কতটা উপলব্ধি করেন সে বিষয়ে আমার সংশয় আছে।
যেমন আমি হাসিনার দলের অনেক নেতাকে ১৯৭১ আর ২০২৫-কে এক পঙতিতে রেখে ছেলেমানুষের মতো বলতে শুনেছি, ‘মনে রাখবেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ কিন্তু ভারত থেকে পরিচালিত হয়েছিল।’ অর্থাৎ তাঁরা মনে করেন, এবারও ভারত সরকার কিছু একটা করবে। গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা অনেক নেতার কথা শুনে মনে হয়েছে, তাঁরা বিশ্বাস করেন, ভারতীয় বাহিনী শেখ হাসিনাকে অচিরেই গণভবনে পৌঁছে দিয়ে আসবে। আমার মনে হয়, এই ভ্রান্ত ধারণা ত্যাগ করে আওয়ামী লিগ নেতাদের কাঁটা চামচ ছেড়ে নিজের হাতে খাওয়া প্র্যাকটিস শুরু করা দরকার। সেই সঙ্গে সমমমা দল, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, যেমন জাকের পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট, ওয়াকার্স পার্টি এবং উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর মতো সাংস্কৃতিক ফ্রন্টে যোগাযোগ আরও বাড়ানো দরকার। কারণ, রাজনীতি এখন আর আওয়ামী লিগ বনাম নন-আওয়ামী লিগ নয়, রাজনীতির মেরুকরণ স্পষ্ট, সংঘাত মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বনাম বিপক্ষের শক্তির।