প্রয়াত খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে তারেক রহমান কি ভারত-বিরোধিতার পুরনো পথেই হাঁটবেন, নাকি কৌশল বদলাবে বিএনপি? জোর জল্পনা রাজনৈতিক মহলে।

তারেক জিয়া ও মোদী
শেষ আপডেট: 30 December 2025 10:50
খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ থাকাকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করে বার্তা দিয়েছিলেন। জবাবে নরেন্দ্র মোদী এবং ভারতের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছিল খালেদার দল বিএনপি। খালেদা পুত্র তথা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক জিয়া তখনও লন্ডনে রাজনৈতিক নির্বাসনে ছিলেন।
মায়ের শারীরিক অবস্থা অতি সাধারণ সংকটজনক হয়ে পড়লে গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক দেশে ফিরে আসেন। মঙ্গলবার সকালে খালেদা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার সময় ঢাকার হাসপাতালে তাঁর সজ্জার পাশেই ছিলেন তারেক। মায়ের মৃত্যুর পর এখন তারেকই সরকারিভাবে বিএনপি'র শেষ কথা হয়ে উঠলেন। অবশ্য খালেদার অসুস্থতা বাড়তে থাকায় অনেক আগেই তারেক দলের হাল ধরেছেন।
বাংলাদেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী খালেদার তিনবারের কার্যকাল যে যে কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে তার মধ্যে অন্যতম হলো ভারত বিরোধী অবস্থান। তার সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক অনেক সময় তলা নিচে থেকেছে। কোন কোন সময় সে সম্পর্ক রুটিন যোগাযোগে পরিণত হয়েছিল।
একদিকে ভারতের বক্তব্য ছিল খালেদা শাসনে বাংলাদেশে ভারত বিরোধী জঙ্গি গোষ্ঠী গুলি আশ্রয় প্রশ্রয় পাচ্ছে এবং তারা ভারতের ভূখণ্ডে নানান ধরনের নাশকতা মূলক কাজ করে চলেছে। ভারত এমনকি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জঙ্গি গোষ্ঠীগুলির তালিকাও একাধিকবার খালেদা সরকারের হাতে বেশ করে যেমনটি নয়া দিল্লি বারে বারে করেছে ইসলামাবাদের সঙ্গে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকদের মতো খালেদাও কখনও ভারতের অভিযোগকে গুরুত্ব দিতে চাননি।
ভারতের সঙ্গে খালেদার সরকারের সম্পর্ক বৈরিতাতে পরিণত হয় ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে দশ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের পর। তদন্তে জানা যায় পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই থেকে ওই অস্ত্র চট্টগ্রামে এনেছিল ভারতের উত্তর পূর্বের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলিকে সরবরাহ করার জন্য। সেই থেকে খালেদার সরকার এবং বিএনপি'র সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ক্রমে তলানিতে পৌঁছায়। এমনকি এক পর্যায়ে পরিস্থিতি এতটাই ছড়ানো হয়ে ওঠে যে ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশ সফরে গেলে তৎকালীন বিরোধী নেত্রী খালেদা জিয়া শেষ মুহূর্তে কর্মসূচি বাতিল করেন। ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেননি। ভারত সরকার এই সিদ্ধান্তকে রাষ্ট্রের প্রতি অবমাননা বলেই বরাবর দেখে এসেছে। ভুল বুঝতে পেরে খালেদা পরবর্তী সময়ে নরেন্দ্র মোদী সরকারের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টা করলেও তা বেশি দূর এগোয়নি। খালেদা যতদিন সক্রিয় ছিলেন লাগাতার অভিযোগ করে গিয়েছেন শেখ হাসিনার সরকারকে বারে বারে ক্ষমতায় আনার পেছনে ভারতের অবদান ছিল। সেই অভিযোগ নিয়ে লাগাতার প্রচার চালিয়ে গিয়েছে বিএনপি।
এখন নতুন একটি নির্বাচন আসন্ন বাংলাদেশে। ১২ ফেব্রুয়ারি সে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লিগকে অংশ নিতে দেওয়া হচ্ছে না। ওই দলের নেত্রী শেখ হাসিনাও দেশে নেই। তিনি ভারতের আশ্রয় প্রার্থী।
অন্যদিকে নানা সূত্র থেকে পাওয়া খবরে জানা যাচ্ছে তারেক জিয়া স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং আসন্ন নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে তাঁর পাশে থাকার বিষয়ে ভারত সরকার নরম মনোভাব নিয়েছে। উল্টোদিকে তারেক ও ভারত সম্পর্কে তাঁর দলের অবস্থানের পরিবর্তন আনছেন বলে রাজনৈতিক মহল মনে করছে।
বাংলাদেশে কত বছর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ভারত সরকার বলে আসছে তারা এ দেশে একটি নির্বাচিত সরকারের অপেক্ষায় রয়েছে। সভাপতি নয়া দিল্লির কর্তারা সিদ্ধান্ত করেছেন, বাংলাদেশের আগামী দিনে যারা সরকার গড়বে ভারত সরকার তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক রেখে চলবে।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশের যা পরিস্থিতি তাতে আওয়ামী লিগকে ছাড়া নির্বাচনে বিএনপি'র সরকার গড়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা সম্ভাবনা বেশি। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করলে তারেক জিয়া প্রধানমন্ত্রী হবেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ভারতের ঘোষিত অবস্থান অনুযায়ী তারক প্রধানমন্ত্রী হলে তাঁর সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলে কাজ করতে আগ্রহ দেখাবে নয়া দিল্লি।
একাধিক সূত্রে খবর তারেককে এই ব্যাপারে নয়া দিল্লির তরফে পর্যাপ্ত আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। কোন কোন মহল বলছে তারেক প্রধানমন্ত্রী হলে শেখ হাসিনা যাতে দেশে ফিরে যেতে পারেন সে ব্যাপারে ভারত সরকার তার সঙ্গে আলোচনার সূচনা করবে। সেই আলোচনার প্রাক শর্ত হবে হাসিনাকে সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করার সুযোগ দিয়ে তাকে মামলা মুক্ত করা। ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত মাসে হাসিনাকে মানবতা বিরোধী অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে ফাঁসির আদেশ দিয়েছে। অন্তর্ভুক্তি সরকার বারে বারে হাসিনাকে ফেরত চেয়ে চাপ তৈরি করতে।
নয়া দিল্লির কূটনৈতিক মহলের খবর, তারেকের হাত ধরে বিএনপির সঙ্গেও কুসম্পর্ক গড়ে তুলতে নয়া দিল্লি এখন থেকে মনস্থির করে রেখেছে। অন্যদিকে পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে তারেক ও তার মায়ের সময়ের ভারত বিরোধী কঠোর অবস্থান থেকে দলকে সরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন। এই ব্যাপারে লক্ষ্যণীয় হলো খালেদা জিয়া যত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে গিয়েছেন ততই বিএনপির ভারত বিরোধী সুর নরম হয়েছে। এখন দেখার তারেক প্রধানমন্ত্রী হন কিনা এবং তিনি ভারত সম্পর্কে তার মায়ের জুতোতেই পা গলান নাকি নিজেই নতুন রাস্তা তৈরি করে নেন।