১৯৭১-এ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সে বছর শুধু ২৫ মার্চ রাতেই অপারেশন সার্চ লাইট নামের হত্যাযজ্ঞে ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হত্যা করে পাক সেনা। তারপর গত ৫৪ বছরে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে।

প্রতীকী ছবি।
শেষ আপডেট: 24 August 2025 22:13
১৯৭১-এ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। সে বছর শুধু ২৫ মার্চ রাতেই অপারেশন সার্চ লাইট নামের হত্যাযজ্ঞে ২৫ হাজারের বেশি মানুষকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে হত্যা করে পাক সেনা। তারপর গত ৫৪ বছরে পদ্মা-মেঘনা-যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গিয়েছে। ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের জন্য আজও ক্ষমা চায়নি ইসলামাবাদ। রবিবার আরও একবার পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী তথা বিদেশমন্ত্রী ইসহাক দার আরও স্পষ্ট করে দিলেন ১৯৭১-এ নিয়ে তাঁরা ক্ষমা চাইবেন না। তাঁর কথায়, এসব অতীতেই ফয়সালা হয়ে গিয়েছে। নতুন করে আলোচনার সুযোগ নেই। আর সেই স্পর্ধা ভরা কথা তিনি বলেছেন বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই, যার কোনও নজির গত ৫৪ বছরে নেই।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হল, ঢাকার দাবি উড়িয়ে পাক বিদেশ তথা উপপ্রধানমন্ত্রী এই কথা বলেছেন বাংলাদেশের বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনকে সাক্ষী রেখে। ঢাকার একটি অভিজাত হোটেলে দু’জনে বৈঠক এবং একটি চুক্তি ও চারটি সমঝোতাপত্রে স্বাক্ষরের পর তিনি সাংবাদিককের এই কথা বলেন। সেই সময় তৌহিদ হোসেন পাক মন্ত্রীর পাশে ছিলেন।
পাকিস্তানের মন্ত্রীর এই মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া নতুন কিছু নয়। বস্তুত এই কারণেই শেখ হাসিনার সময়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছিল। গণহত্যার জন্য পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার দাবিতে হাসিনা সরকার বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরির কাজ চালাচ্ছিল।
আশ্চর্যের হল, পাকিস্তানের মন্ত্রীর রবিবারের সরব মন্তব্যের পর মহম্মদ ইউনুস সরকারের তরফে মৃদু প্রতিবাদ শোনা গিয়েছে। বিদেশ বিষয়ক উজদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, পাক বিদেশ মন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশ একমত নয়। বাংলাদেশ চায় ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে পাক বাহিনীর নৃশংসতার জন্য পাকিস্তান ক্ষমা চাক। আর্থিক ক্ষতিপূরণ করুক। বাংলাদেশের ওয়াকিবহাল মহলের কথায়, জোরালো প্রতিবাদ দূরে থাক, বাংলাদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে পাক বিদেশমন্ত্রীর এমন স্পর্ধা ভরা মন্তব্য ইউনুস সরকার কার্যত গিয়ে নিয়েছে।
আরও আশ্চর্যের হল পাক উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দারের এই মন্তব্যের পরও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির আমির শফিকুর রহমান তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং বৈঠক করেছেন। রবিবার রাতে দেশে ফিরে যাওয়ার আগে পাক বিদেশমন্ত্রী বিএনপি-র চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা করবেন। বিএনপির প্রথমসারির নেতারা শনিবারই ইসহাক দারের সঙ্গে দেখা করেছেন। শনিবার দুপুরে পাক বিমান বাহিনীর বিশেষ বিমানে দু’দিনের সফরে ঢাকা পৌঁছান ইসহাক দার।
’৭১-এর গণহত্যার জন্য ক্ষমা চাওয়ার দাবি নসাৎ করায় অনেকেই ভেবেছিলেন ঢাকায় বিক্ষোভের মুখে পড়বেন পাক বিদেশমন্ত্রী এবং তাঁর মন্তব্যের প্রতিবাদে সৌজন্য সাক্ষাতের কর্মসূচি বাতিল করবেন খালেদা জিয়া। কিন্তু সে সব কিছু হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকার ও তাঁদের সহযোগী দলগুলি পাক বিদেশমন্ত্রীর আতিথেয়তায় কোনও খামতি রাখছে না।
পাকিস্তানের মন্ত্রী রবিবার ঢাকায় বলেন, ১৯৭৪ এবং ২০০০ সালে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিবাদের ফয়সালা হয়ে গিয়েছে। নতুন করে এ নিয়ে আলোচনার অবকাশ নেই। যদিও বাংলাদেশের বক্তব্য, মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যার জন্য পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবে।
বাংলাদেশের আরও দাবি, ১৯৭৪ সালের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের পাওনা ৪.৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অভ্যন্তরীণ মূলধন সৃষ্টি, বৈদেশিক ঋণ নিষ্পত্তি এবং বৈদেশিক আর্থিক সম্পদ ধরে রাখার অনুমিত হিসাবের ভিত্তিতে এটি নির্ধারণ করা হয়।
বাংলাদেশ সরকার আরও প্রায় ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দাবি করে আসছে বিগত বহু বছর যাবত। তাদের বক্তব্য, ১৯৭০ সালের নভেম্বরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ/সংস্থা অনুদান দিয়েছিল। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় সেই অর্থ ঢাকার স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের শাখায় জমা ছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগে সেই অর্থ স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানের লাহোর শাখায় স্থানান্তরিত করা হয়। সেই টাকা ফেরানোর দাবিও বাংলাদেশ লাগাতার উত্থাপন করে যাচ্ছে।
তাছাড়া সওয়া তিন লাখের বেশি পাকিস্তানি বাংলাদেশের ১৪টি জেলার ৭৯টি শিবিরে অবস্থান করছে। তাদের পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি করে যাচ্ছে ঢাকা। এই সব দাবিতে কর্ণপাত করছে না ইসলামাবাদ। লক্ষণীয় হল, সেই দাবি পাশে ঠেলে রেখে ইউনুস সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে গলাগলি শুরু করেছে। গত বছর ৫ অগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে দু-দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে বলে দাবি করেছে ঢাকা ও ইসলামাবাদ।