২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে কীভাবে প্রতিফলিত হবে? দিল্লি কি তখন পাশের দেশে একটি জামায়াত-গরিষ্ঠ সরকারকে মোকাবেলা করবে?

শেষ আপডেট: 13 September 2025 16:26
এটা অধিকাংশ ভারতীয়র মনে সামান্যই প্রভাব ফেলতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক পূর্বাভাস। বাংলাদেশে দুই প্রধান রাজনৈতিক দল— আওয়ামী লিগ (Awami League) (বর্তমানে নিষিদ্ধ) ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP) (বিএনপি)—এই উভয় দলের প্রতি মানুষের মধ্যে হতাশা ক্রমশ বাড়ছে। অনেকেই যারা উভয় দলকেই প্রত্যাখ্যান করতে চান, তারা ক্রমশ জামায়াতে ইসলামির দিকে ঝুঁকছেন। তারা কোনও উগ্রপন্থী বা ইসলামি মৌলবাদী নয়, বরং এই কারণে জামায়াতের দিকে যাচ্ছেন যে জামায়াত এখনও সেই দুর্নীতি ও দুর্ব্যবস্থাপনার দায়ে দাগযুক্ত নয়, যা সঠিক হোক বা ভুল, প্রধান দুই দলের সঙ্গে জড়িত বলে গণ্য করা হয়। এই পরিস্থিতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে কীভাবে প্রতিফলিত হবে? দিল্লি কি তখন পাশের দেশে একটি জামায়াত-গরিষ্ঠ সরকারকে মোকাবেলা করবে?'
এক্স পোস্টে লিখেছেন শশী তারুর। কংগ্রেসের তিরুবনন্তপুরমের সাংসদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (Dhaka University) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ, সংক্ষেপে ডাকসু'র সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে এই মন্তব্য করেছেন। শশী বাংলাদেশের রাজনীতির নিবিড় পর্যবেক্ষক ভারতীয় রাজনীতিকদের একজন। বাংলাদেশের একটি কাগজে তাঁর কলম প্রকাশিত হয়।ডাকসুর ফল নিয়ে বাংলাদেশেও বিস্তর লেখালেখি হচ্ছে। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (Dhaka University) সেই পাকিস্তান আমল থেকে ওপারের রাজনীতির অন্যতম নির্ধারক শক্তি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মও হয়েছে বলা চলে এই ক্যাম্পাসে।
অনেকেই শশীর পুরো বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। আবার প্রত্যাখানও করছেন না। বিশেষ করে ডাকসু'র ভোটে সবাইকে অবাক করে দিয়ে জামায়াতে ইসলামির ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবির যে বিপুল জয় হাসিল করেছে তা রীতিমতো বিস্ময়কর। যদিও এই নির্বাচনে আওয়ামী লিগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লিগ ছিল না। হাসিনা সরকারের পতনের পর এই ছাত্র সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, সবচেয়ে বেশি সময় ডাকসু যাদের দখলে ছিল। ডাকসু'র ভোটে তাই ইসলামি ছাত্র শিবিরের প্রধান প্রতিপক্ষ ছিল বাংলাদেশের আর এক সাবেক শাসক দল বিএনপি'র ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল। শিবির শুধু সম্পাদকমণ্ডলীর ১২টি পদের নয়টি জিতেছে তাই-ই নয়, বিপুল মার্জিনে জয়লাভ করেছে।বাংলাদেশের জন্মের ৫৪ বছরে এই প্রথম স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামির ছাত্র সংগঠন ডাকসু দখল করল। যদিও স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য আজ পর্যন্ত দলটি ক্ষমা চায়নি।এমন একটা শক্তি য়ে তলে তলে পড়ুয়াদের মনে জায়গা করে নিতে পেরেছে, তা ওই ছাত্র সংগঠনেরও কল্পনার বাইরে ছিল। এক বছর আগে যে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে লাখ লাখ ছাত্র-জনতা রাস্তায় নেমে এসে হাসিনা সরকারের পতন ঘটায় ডাকসু'র ভোটে তারাও বিন্দুমাত্র সুবিধা করতে পারেনি।
ডাকসু'র এই নির্বাচন হল ছয় বছরের মাথায়। আর নামজাদা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে তিরিশ বছর পর। শেখ হাসিনার সরকার ঢাকা সহ বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ছাত্র ভোট বন্ধ রেখেছিল। এই সুযোগে আওয়ামী লিগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলিগ বিনা নির্বাচনে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে রাজত্ব চালিয়ে যাচ্ছিল। গত বছর অভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতনের পর শিক্ষাঙ্গনের দখল নেয় বিএনপির ছাত্রদল। তাদের দাদাগিরি, চাঁদাবাজির কারণে অধিকাংশ ছাত্র শিবিরকে বেছে নিয়েছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল সব মহল। তবে মনে রাখতে হবে অভ্যুত্থানের আগে জানাই ছিল না যে ঢাকা সহ সব শিক্ষাঙ্গনে জামাতের ছাত্র শিবিরের ইউনিট আছে। এতটাই গোপনে কাজ করছিল ওই সংগঠন। এখন প্রশ্ন হল, ওপারের ছাত্র ভোটের ফল কি সীমান্তের এপারে কোনও প্রভাব ফেলতে পারে? কতগুলি বিষয় বিবেচনায় রাখলে এপারে প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়ার নয়।
পশ্চিমবঙ্গে ২০১৭ সাল থেকে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কোনও নির্বাচিত ছাত্র সংসদ নেই্। ২০২০-তে যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি এবং রবীন্দ্র ভারতীতে ছাত্র সংসদের ভোট হয়েছিল বটে।সেগুলিরও মেয়াদ ফুরিয়ে গিয়েছে। তবে মাস কয়েক আগে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছাত্র সংসদ ভোট হয়েছে। বলতে গেলে একমাত্র সেখানেই নির্বাচিত ছাত্র সংসদ আছে।বাকি জায়গায় তৃণমূলের ছাত্র সংগঠন টিএমসিপি-র অনির্বাচিত নেতাদের খবরদারি চলছে বলে অভিযোগ। কসবা আইন কলেজে ছাত্রীকে গণধর্ষণের অভিযোগে পুলিশ টিএমসিপির নেতাদের বিরুদ্ধেই চার্জশিট দিয়েছে। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টাকা-পয়সাজনিত অনিয়মেও নাম জড়িয়েছে টিএমসিপির। অথচ ক্যাম্পাসগুলিতে তাদের কোনও কর্মসূচি নেই। নানা ইস্যুতে বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলি আন্দোলন করলেও টিএমসিপি কার্ষত হাত গুটিয়ে আছে।যদিও সম্প্রতি সংগঠনের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী তারা বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে পালন করে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়াও তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন।
গত বছর এই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর সভাতেই পুজোর পর ছাত্র ভোট করার কথা ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। দলের তরফে বলা হয়েছিল ছাত্র সংসদগুলির ৫৫ শতাংশ আসন ছাত্রীদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। তারপর আরও একটা প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী চলে গেল, ভোটের নামগন্ধ নেই। এখম বিধানসভা ভোটের আগে আর সে সুযোগও নেই। রাজ্য সরকার কেন ভোট করাচ্ছে না, তা নিয়ে নানা কারণ শোনা যায়। মূল কারণ দুটি বলে মনে করা হচ্ছে। এক. অবাধ ভোট হলে টিএমসিপি শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। দুই. ভোট হলে শাসক দলের ছাত্র সংসদের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে চলে আসবে। তখন ছাত্রদের বিক্ষুব্ধ অংশ সরকারের বিরুদ্ধেও মুখ খুলতে পারে, এমন আশঙ্কা দলে আছে। একান্ত আলোচনায় তৃণমূল এবং টিএমসিপি'র বহু নেতা ছাত্র ভোট না করানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ডাকসু'র ভোটের ফল জানার পর তাঁদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তাঁরা মনে করছেন, চাকরি দুর্নীতি সহ নানা অভিযোগ ছাত্র সমাজের মধ্যে কতটা প্রভাব তৈরি করেছে এক বছর আগে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করিয়ে নিলে তা বোঝা যেত। ক্ষত মেরামত করা সহজ হত। ভোট না হওয়ায় পড়ুয়াদের মন পড়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। খাতায়-কলমে বিজেপির কোনও ছাত্র সংগঠন নেই। বিদ্যার্থী পরিষদ সরাসরি আরএসএস পরিচালনা করে। এই সংগঠন চলে ভিন্ন ধারায়। ছাত্র সংসদ দখল নিতে না পারা পর্যন্ত ক্যাম্পাসে উপস্থিতি তারা তেমন জানান দেয় না। কাজ করে গোপনে এবং মূলত ক্যাম্পাসের বাইরে। ফলে পশ্চিমবঙ্গে বিদ্যার্থী পরিষদ কতটা শক্তিশালী জানার সুযোগ তেমন নেই। তবে ডাকসু'র ভোটে জামাতের ছাত্র সংগঠনের চমকপ্রদ ফলাফলের মতোই ২০২০-তে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে দ্বিতীয় স্থান দখল করে অবাক করে দিয়েছিল বিদ্যার্থী পরিষদ। বামপন্থীদের গড় বলে পরিচিত দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়েও যেমন বিদ্যার্থী পরিষদ এখন বড় শক্তি। বাংলার কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে টিএমসিপির নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ এসএফআই-সহ বাম ছাত্র সংগঠনগুলি কতটা কাজে লাগাতে পারবে সেটাও দেখার।
ওপারে গত বছর হাসিনা সরকারের পতনের পর জানা যায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে জামাত ও তাদের ইসলামি ছাত্র শিবির। যদিও কোটা বিরোধী আন্দোলন এবং গণ-অভ্যুত্থানের সময় তারা প্রকাশ্যে আসেনি। আর পাঁচটা সরকার বিরোধী কর্মসূচির মতো ওই আন্দোলনের এপিসেন্টার ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। গণ-অভ্যুত্থানের তেরো মাসের মাথায় সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ এখন জামাতের ছাত্রদের দখলে। আওয়ামী লিগের ছাত্র সংগঠন এই ভোটে না থাকলেও জামাত-শিবিরের জয়ের দায় শেখ হাসিনাও ঝেড়ে ফেলতে পারবেন না। ছাত্র ভোট না করিয়ে তিনি সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিকে প্রকারান্তরে গোপনে শাখা-প্রশাখা মেলতে সাহায্য করেছেন। বিনা নির্বাচনে বছরের পর বছর ছাত্র সংসদ ভোগ-দখল করার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে ছাত্রলিগ ও আওয়ামী লিগকে। ডাকসু'র নির্বাচনের ফলাফল থেকে এই উপমহাদেশের সব দল ও সরকারেরই শিক্ষা নেওয়ার আছে। সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল, বাংলাদেশের মতো এপারেও যেন কোনও মৌলবাদী, ধর্মান্ধ শক্তি আর মাথা তুলতে না পারে।