ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের চমকপ্রদ জয়! বাংলাদেশ কি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে সরে গিয়ে মৌলবাদের পথে হাঁটছে? উঠছে বড় প্রশ্ন।

ছবি: এআই
শেষ আপডেট: 13 September 2025 12:05
এ-বঙ্গে যখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনের পর দিন নির্বাচন হচ্ছেই না তখনই ও-বঙ্গে হয়ে গেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (Dhaka University) কেন্দ্রীয় ছাত্র-সংসদের (Chhatra Shibir) নির্বাচন। এই নির্বাচনটিকে অনেকেই বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনের একটি মহড়া হিসেবে দেখছিলেন। সেদিক থেকে দেখতে গেলে এই নির্বাচনের (Bangladesh Politics) গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। বলতে বাধা নেই অনেককেই আশ্চর্য করে, নির্বাচনে জয়লাভ করেছে জামাতের ছাত্র সংগঠন, ছাত্রশিবির। নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে কিছু কিছু অভিযোগ উঠেছে সত্যি, তবে মোটের ওপর এই নির্বাচনের ফলাফল সকলে মেনেই নিয়েছেন।
ছাত্রশিবিরের এই বিপুল জয় সম্ভব হল কীভাবে? যে কোনো ভোট জিততে গেলেই সাংগঠনিক শক্তি এবং পরিকল্পনা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এই দুই ক্ষেত্রেই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ (বাগছাস)-এর খামতি ছিল বলে অনেকেই নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পর মতামত দিয়েছেন। এই খামতির ফলেই ছাত্রদল ও বাগছাস শিক্ষার্থীদের কাছে তাদের কর্মপরিকল্পনা সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে পারেনি। অনেকেই বলেছেন ছাত্রশিবিরের প্রার্থীদের তুলনায় ছাত্র ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাম সংগঠন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচার পদ্ধতি ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। অনলাইন প্রচারেও শিবির অনেকখানি এগিয়েছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, “ছাত্রশিবির একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন। এই সংগঠনের ছেলেরা ক্যাডারভিত্তিক ছাত্ররাজনীতি করে, এটাই তাদের ঐতিহ্য। শিবিরের ছেলে-মেয়েরা নানামুখী পড়াশোনা করে, তাদের একাডেমিক ক্যারিয়ারে সাফল্য ঈর্ষণীয়, যা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করে। এদের বেশির ভাগেরই আচরণ ভালো। শিবিরের ছেলেদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের খবর তেমন একটা পাওয়া যায় না। তাই শিক্ষার্থীদের কাছে ছাত্রশিবিরের প্রতি ‘পজিটিভ ইমেজ’ তৈরি হয়েছে”। তিনি এটিও বলেছেন যে, ছাত্রশিবির সাধারণ শিক্ষার্থীদের আর্থিক, পড়ালেখা, কোচিংসহ নানাভাবে সহযোগিতা করে। এই কাজ ছাত্রদল ও বাম ছাত্রসংগঠনগুলো খুব একটা করে না।
এই কারণগুলির প্রত্যেকটি শিবিরের জয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতেই পারে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সবসময়ই চাঁদা এবং জুলুমবাজি একটি বড়ো ইস্যু হয়ে যায় বৈকি। একইভাবে কেরিয়ার-সচেতন শিক্ষার্থীদের পাশে যে-ছাত্র সংগঠন দাঁড়াবে, ছাত্রছাত্রীরা যে তাদের দিকে অনেকখানি হেলে পড়বে, তাও সত্যি।
১৯৮৯-৯০ সালে ডাকসু নির্বাচনে জিএস পদে বিজয়ী হয়েছিলেন জাসদ ছাত্রলীগ সমর্থিত প্রার্থী ড. মুশতাক হোসেন। তাঁর মতে, “দখলবাজি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে ছাত্রদলের শপথকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিশ্বাস করেনি। সারা দেশে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা এ ধরনের কাজেই লিপ্ত। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্রচলিত রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করে নতুন ধারার রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে রাজনৈতিক দল গঠন করেছে, তারা সেই পুরোনো রাজনৈতিক অপকৌশল ব্যবহার করেই নিজেদের দলকে শক্তিশালী করার পথে হেঁটেছে। তারাও দেশের বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও ‘মব সন্ত্রাস’ করেছে। এর ফলে দেশবাসীর পাশাপাশি ছাত্রসমাজও তাদের প্রতি হতাশ হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতি ছাত্রসমাজের অনুকূল মনোভাব থাকলেও এত বিশালসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীদের সমর্থনকে সংগঠিত করার মতো কাঠামো তাদের ছিল না। স্বতন্ত্র পরিচয়ে সেটা সম্ভবও নয়। তারপরও কোনো কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট চমকে দেওয়ার মতো ছিল, যেটা আগে দেখা যায়নি।” এই কথাগুলিও ফেলে দেওয়ার নয়। গত এক বছরের বাংলাদেশ এই কথাগুলির অনেকগুলির সত্যতাই প্রমাণ করেছে। হোসেন আরও একটি যুক্তি দিয়েছেন যা অতীব প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, “স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত যেসব রাজনৈতিক শক্তি সরকার পরিচালনা করেছে, তাদের প্রতি ছাত্রসমাজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ছাত্রসমাজ এতটাই বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে যে, ছাত্রশিবিরের মতো ধর্মভিত্তিক, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী সংগঠনকেও তারা নেতৃত্বের সুযোগ দিতে চেয়েছে। এ ছাড়া বিগত দিনে ক্যাম্পাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে আওয়ামীপন্থী ছাত্রলীগের অত্যাচার-নির্যাতনমূলক কর্মকাণ্ড সংগঠনটিকে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা ঘৃণাভরে দেখার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের দোহাইকেও অকার্যকর করে দিয়েছে।”
লক্ষ করলে দেখা যাচ্ছে যে, ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এবং মুশতাক হোসেন দুজনেই মেনে নিয়েছেন যে, ছাত্রশিবির একটি আদ্যন্ত ধর্মভিত্তিক ছাত্র সংগঠন। প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধিতা করে থাকে এই ছাত্র সংগঠনটি। এই রকম একটি ছাত্র সংগঠনের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ক্ষমতা দখল করা একদিক থেকে অশনিসংকেত নয় কি?
ডাকসুর নির্বাচনে ছাত্র শিবিরের বিজয়ী হওয়ার পক্ষে যে-সমস্ত যুক্তি দুই অধ্যাপক হাজির করেছেন, সেগুলিকে খারিজ না-করেই নিয়মিত বাংলাদেশ যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি কথা বলতে ইচ্ছে করছে। গত কয়েক বছর ধরে, বাংলাদেশে যে সামগ্রিকভাবে মৌলবাদী চেতনা বিস্তার লাভ করেছে, তা মেনে নিতে হবে। বিগত কয়েক বছরে কবি-লেখক বন্ধুদের অনেককেও মাঝে মাঝেই তীব্র সম্প্রদায়িক মন্তব্য করতে দেখেছি। সমাজের এগিয়ে থাকা অংশের মানুষেরই যদি এই চেতনা হয়, তাহলে বাকি অংশের মানুষের চেতনা কী হতে পারে তা নিশ্চিত আন্দাজ করা যায়। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে ইচ্ছে হচ্ছে। বছর দশেক আগে আমার অগ্রজ বন্ধু অমল আকাশের সঙ্গে ট্যাক্সিতে ঘুরছিলাম ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। ভাষার প্রতি বাংলাদেশের নিম্নবিত্ত মানুষের মনোভাব কী, তা বুঝতে দশ জন ট্যাক্সিচালককে আমরা প্রশ্ন করেছিলাম, কোন ভাষাটা শেখানো এখন বাংলাদেশে জরুরি বলে মনে হচ্ছে আরবি নাকি বাংলা? আটজনের উত্তর ছিল আরবি। বাংলা ভাষার প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা তাদের কথাবার্তায় দেখিনি। একজন ট্যাক্সিচালক আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কী করি। ‘কবিতা লিখি’ বলায় তিনি বলেছিলেন, “আপনে তো গুনাহ করেন”। এটাই নিশ্চয়ই গত কয়েক বছরের বাংলাদেশের একমাত্র চিত্র ছিল না। কিন্তু, অন্যতম চিত্র তো ছিলই। কাজেই ধর্মভিত্তিক একটি ছাত্র সংগঠনের ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া একেবারেই কাকতালীয় কোনো ঘটনা নয়। শেখ হাসিনাও আসলে নামে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও, ধর্মীয় মৌলবাদের প্রতি নরম দৃষ্টিভঙ্গিই নিয়েছিলেন, দূর থেকে তাঁর আমলের বাংলাদেশকে দেখে একথাও বারবার মনে হয়েছে। আর একটি কথাও সত্যি যে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ক্ষমতা বজায় রাখার কৌশল হিসেবে ব্যবহারের অপচেষ্টাও বাংলাদেশে তাঁর আমলে হয়েছে। এই নির্বাচনে সেই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে একটি মত উঠে এসেছে যে, একথাও সত্যি।
কিন্তু, ডাকসুর নির্বাচনে শিবিরের জয়কে দু-হাত তুলে সমর্থন করার মতো কোনো কারণ রয়েছে কী? যেমন, নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হওয়ার পরেই ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, শিবিরের ছাত্র নেতারা এক সমজ্ঞে স্লোগান দিচ্ছে, ‘হিজাব হিজাব’। এরপর তাহলে কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের হিজাব পরে আসা বাধ্যতামূলক হতে চলেছে?
মনে রাখা প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অপব্যবহার এক কথা আর মুক্তিযুদ্ধকে বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অস্বীকার করা আর এক কথা। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে মুছে দিয়ে বা সেই চেতনাকে অস্বীকার করে আজ যদি বাংলাদেশের ছাত্রসমাজ নতুন বাংলাদেশ গঠন করতে চায় তাহলে নিশ্চিতভাবেই বাংলাদেশ পিছনের দিকে হাঁটাতে শুরু করবে। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি এমন এক বাংলাদেশের জন্ম দিতে পারে যা আমাদের কাছে হবে নতুন, অজানা এবং হয়তো বা ভীতিপ্রদও।