হঠাৎ স্ট্রোক (Stroke), একাধিক জটিল অস্ত্রোপচার আর দীর্ঘ রিহ্যাব (Rehab)— জীবনে ফেরার (Stroke Recovery) অনুপ্রেরণামূলক গল্প ব্রান্টের।

স্ট্রোকের পর জীবনে ফেরা।
শেষ আপডেট: 27 January 2026 17:40
দ্য ওয়াল ব্যুরো: বরফের প্রান্তরে শখের আইস হকি খেলতেন তাঁরা। প্রবল লড়াই করে এক একদিন এক একটা গেম জিততেন এক একজন। যদিও দাম্পত্যে কোনও লড়াই ছিল না। স্বামী স্ত্রীর চেয়েও বেশি তাঁরা ছিলেন, বন্ধু। তবে সেই বন্ধুদম্পতি ব্রান্ট ও ডন দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি, এই বরফমাঠের মাইরে, জীবনের সবচেয়ে বড় লড়াইয়ের মুখে পড়তে হয় তাঁদের। ৪০ বছর বয়সি ব্রান্টের আচমকা স্ট্রোক (Stroke) হওয়ার পরে ঠিক এটাই ঘটে যায়। অকুল পাথারে পড়েন স্ত্রী ডন। দু’জনেই এয়ারোস্পেস ও ডিফেন্স সংস্থায় কাজ করেন।
২০২৪ সালের এপ্রিল মাস। এক সোমবার সকালে ঘুম ভেঙেই ব্রান্ট বুঝতে পারেন, তাঁর ঘাড় আর চোয়ালে অস্বাভাবিক ব্যথা। আগের দিনই ফ্লোরিডার কোরাল স্প্রিংসে ফ্লোরিডা প্যান্থার্স আইস ডেনে একটি রিক্রিয়েশনাল হকি ম্যাচ খেলেছিলেন। খেলতে গিয়ে আর এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে ধাক্কাও লাগে। কিন্তু তখন বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি।
তাই ব্যথা নিয়েই স্ত্রী ডনের সঙ্গে কলোরাডো যাওয়ার সফরে বেরিয়ে পড়েন ব্রান্ট। ওয়ার্ক ট্যুর ছিল দুজনেরই। কিন্তু দিন যত এগোয়, ব্যথা তত বাড়তে থাকে। ডনের কথায়, সপ্তাহের শেষে পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে ব্রান্ট আর বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত শুক্রবার তাঁরা ফ্লোরিডার ওয়েস্টনে নিজেদের বাড়িতে ফিরে আসেন।
ডন বলেন, “শনিবার সকালে উঠেও একেবারেই ভাল বোধ করছিল না ও। আমি তখন কাপড় কাচছিলাম। হঠাৎই ও আমার ওপরেই লুটিয়ে পড়ল। মুখটা হাঁ হয়ে বেঁকে গিয়েছিল। জ্ঞান ছিল, কিন্তু কথা বলতে পারছিল না, যেন অন্য জগতে চলে গিয়েছে।”
তখনই ডন বুঝে যান, দেরি করলে বিপদ। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান তিনি। চিকিৎসকেরা জানান, এটা স্ট্রোকের লক্ষণ। ব্রান্টকে আইসিইউ-তে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা করে জানা যায়, তাঁর ক্যারোটিড আর্টারিতে, অর্থাৎ ঘাড়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালির দেওয়াল ছিঁড়ে গেছে। এই রক্তনালিই ঘাড়, মুখ আর মস্তিষ্কে রক্ত পৌঁছে দেয়।
এর ফলেই ব্রান্টের ট্রানজিয়েন্ট ইসকেমিক অ্যাটাক বা টিআইএ হয়েছিল অর্থাৎ মস্তিষ্কের একটি অংশে সাময়িকভাবে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিউরো বিশেষজ্ঞ ডক্টর মুবার্শির পারভেজ জানান, টিআইএ একধরনের স্ট্রোকের মতো সমস্যা হলেও সাধারণত এক দিনের মধ্যেই সেরে যায়। তবে এটি ভবিষ্যতে বড় স্ট্রোকের সতর্ক সংকেত।
ব্রান্টকে রক্ত পাতলা করার ওষুধ দেওয়া হয় এবং কয়েক দিন হাসপাতালে রেখে পর্যবেক্ষণ করা হয়। তবে যেদিন তাঁর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার কথা ছিল, সেদিন ভোরেই পরিস্থিতি ফের বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে। তাঁর ক্যারোটিড আর্টারি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং রক্ত জমাট বেঁধে সেই ক্লট মস্তিষ্কে পৌঁছে যায়। ফল হয় বড় স্ট্রোক।
ডক্টর পারভেজ সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রোপচার করে মস্তিষ্ক থেকে সেই ক্লট বের করেন। এরপর ক্যারোটিড আর্টারিতে স্টেন্ট বসিয়ে রক্ত চলাচল আবার স্বাভাবিক করা হয়।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। স্ট্রোকের কারণে মস্তিষ্কের আক্রান্ত অংশে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এই অবস্থাকে বলা হয় হেমোরেজিক স্ট্রোক। তখন ফের আর এক নিউরোসার্জন ব্রান্টের মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করেন। রক্তক্ষরণ থামাতে তাঁর মাথার খুলির একটি বড় অংশ সাময়িকভাবে খুলেও ফেলতে হয়। পরে সেই জায়গায় থ্রিডি প্রিন্টেড একটি কৃত্রিম অংশ বসানো হয়েছে।
এই সময় ব্রান্টকে কয়েক দিন কৃত্রিম কোমাতেও রাখা হয়। তবে চিকিৎসকেরা নিশ্চিত ছিলেন না, তিনি কোমা থেকে উঠে নিজে নিজে শ্বাস নিতে পারবেন কিনা, হাঁটতে পারবেন কিনা, কথা বলতে বা খেতে পারবেন কিনা। ডনকে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্যও মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছিল।
ডন বলেন, “আমি সেটা বিশ্বাস করিনি। আমি জানতাম, ও খুবই শক্ত মানুষ। ও কিছুতেই হার মানবে না।”
সত্যিই ধীরে ধীরে সেই শক্তির প্রমাণ দেন ব্রান্ট। প্রায় তিন সপ্তাহ হাসপাতালে থাকার পর তাঁকে একটি রিহ্যাব সেন্টারে পাঠানো হয়। সেখানে এক সপ্তাহ ধরে তিনি ফিজিক্যাল থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি আর স্পিচ থেরাপি নেন।
শেষ পর্যন্ত তিনি বাড়ি ফেরেন—নিজে শ্বাস নিতে পারেন, হাঁটতে পারেন, খেতে পারেন।
ডনের কথায়, “ওর সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল কথা বলা।” স্ট্রোকের কারণে অ্যাফাসিয়ায় আক্রান্ত হন ব্রান্ট। এর ফলে কথা বলা, পড়া আর লেখার ক্ষমতা কমে যায়। এখনও তিনি নিয়মিত স্পিচ থেরাপি নিচ্ছেন। ধীরে ধীরে উন্নতিও হচ্ছে।
এ ছাড়া স্ট্রোকের প্রভাবে তাঁর বাঁ চোখে রক্তক্ষরণ হয়, ফলে দৃষ্টিশক্তিও কিছুটা কমে গিয়েছিল। তবে সেটাও ধীরে ধীরে সেরে উঠছে।
আজ ব্রান্টের জীবন প্রায় স্বাভাবিক। তিনি আবার কাজে ফিরেছেন। এমনকী ধীরে ধীরে আবার হকি খেলার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।
ডন বলেন, “এমন কিছু যে হঠাৎ ঘটে যেতে পারে, সেটা আমরা কোনও দিন ভাবিনি। ব্রান্ট খুবই ফিট আর সক্রিয় ছিল। তাই তাঁর যে শরীরের কোনও সমস্যা হতে পারে, সেটা আমরা কখনওই ভাবিনি।”
যদিও ঠিক কী কারণে তাঁর ক্যারোটিড আর্টারিতে এই সমস্যা হয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ডক্টর পারভেজ জানান, এই ধরনের স্ট্রোক তুলনামূলকভাবে কম বয়সিদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়।

ডক্টর পারভেজ বলেন, “ব্রান্ট যেভাবে সেরে উঠেছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তাঁর স্ত্রী আর আমাদের রিহ্যাব টিম ওঁকে সব সময় মানসিক জোর দিয়েছে—এটাই সবচেয়ে বড় কারণ।”