হলিউড অভিনেতা মাইকেল ডগলাসের এক সাক্ষাৎকারে উঠে আসে HPV ও ওরাল সেক্সের মাধ্যমে মুখের ক্যানসারের সম্ভাবনা। কী বলছে গবেষণা ও চিকিৎসকেরা?

শেষ আপডেট: 18 March 2026 13:08
দ্য ওয়াল ব্যুরো: মুখ ও গলার ক্যানসার (Head and Neck Cancer) নিয়ে নতুন করে বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছিল একটি সাক্ষাৎকার। সেই সাক্ষাৎকারে নিজের অসুস্থতার কথা খোলাখুলি বলেছিলেন হলিউড অভিনেতা মাইকেল ডগলাস (Michael Douglas)। তাঁর বক্তব্য, মুখের ক্যানসারের কারণ হিসেবে তিনি সন্দেহ করেছিলেন এইচপিভি সংক্রমণ (HPV Infection), যা সম্ভবত ওরাল সেক্সের মাধ্যমেই তাঁর শরীরে প্রবেশ করেছিল।
এই মন্তব্যই একসময় বিশ্বজুড়ে আলোচনার ঝড় তোলে এবং মুখ ও গলার ক্যানসার, যৌনস্বাস্থ্য ও এইচপিভি নিয়ে নতুন করে সচেতনতার দরজা খুলে দেয়। মনে করিয়ে দেয়, পুরুষদেরও এই সংক্রমণ হতে পারে এবং তাঁদেরও ভ্যাকসিন নেওয়া জরুরি।
ভারতে এই সংক্রমণে ক্যানসারে সংখ্যা ইতিমধ্যেই উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালে দেশে প্রায় ১৫ লক্ষ ক্যানসার রোগীর নথিভুক্ত হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে গলা ও মুখগহ্বরের ক্যানসার বড় অংশ জুড়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের মধ্যে মুখগহ্বরের ক্যানসারের সংখ্যায় ভারত শীর্ষে। সাধারণভাবে এই ক্যানসারের প্রধান কারণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে তামাক ও অ্যালকোহলকে ধরা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় HPV (Human Papillomavirus)-এর ভূমিকা নিয়েও আলোচনা বাড়ছে।
২০১৩ সালে ব্রিটিশ সংবাদপত্র The Guardian-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ক্যানসারের অভিজ্ঞতা নিয়ে সরাসরি কথা বলেছিলেন মাইকেল ডগলাস। তখনই জানা যায়, ২০১০ সালের অগাস্টে তাঁর স্টেজ-৪ গলা ক্যানসার ধরা পড়ে। তখন পরিস্থিতি প্রায় প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছিল।
সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, দীর্ঘদিন ধূমপান ও মদ্যপানের জন্য তিনি কি অনুতপ্ত—কারণ সেটিই তাঁর ক্যানসারের কারণ হতে পারে বলে অনেকেই মনে করেছিলেন।
কিন্তু তাঁর উত্তর ছিল অন্যরকম। তিনি বলেন, “আমি খুব নিশ্চিত না হলেও, এই ধরনের ক্যানসার আসলে HPV ভাইরাসের কারণে হয়, যা অনেক সময় ওরাল সেক্সের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে।” তাঁর এই মন্তব্যই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করে।
ডগলাস জানান, কয়েক মাস ধরে তাঁর মুখের ভিতর অস্বস্তি হচ্ছিল। কিন্তু বিভিন্ন চিকিৎসক তাঁকে শুধু ওষুধ দিয়েই চিকিৎসা করছিলেন।
পরে তিনি কানাডার মন্ট্রিয়লে এক বন্ধুর পরামর্শে আর একজন চিকিৎসকের কাছে যান। সেখানেই করা হয় বায়োপসি পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় ধরা পড়ে একটি বড় টিউমার।
ডগলাসের কথায়, “আমার জিভের গোড়ায় বাদামের মতো একটি বড় টিউমার ছিল, যা আগে কোনও ডাক্তারই দেখতে পাননি।”
এরপর শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ চিকিৎসা। টানা আট সপ্তাহ ধরে কেমোথেরাপি ও রেডিয়েশন থেরাপি নিতে হয় তাঁকে। চিকিৎসার ফলে তাঁর মুখের ভেতরের অংশ বা প্যালেট পুড়ে গিয়েছিল বলেও তিনি জানান।
চিকিৎসার সময় তাঁকে ফিডিং টিউব ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হলেও তিনি সেটি নিতে চাননি। তিনি বলেন, “খুবই কঠিন সময় পেরিয়েছি। কেমোথেরাপি শরীরের ভালো জিনিসগুলোকেও নষ্ট করে দেয়। আমি ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম।”
তবে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা সফল হয়। সাক্ষাৎকারের সময় তিনি জানিয়েছিলেন, দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি ক্যানসারমুক্ত ছিলেন। এর পরেও নিয়মিত ছ'মাস অন্তর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতেন।
বিশ্বের বহু গবেষণায় দেখা গেছে, গলা ক্যানসারের একটি বড় অংশ HPV সংক্রমণের সঙ্গে যুক্ত। আমেরিকার রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র CDC-র তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকায় গলা ক্যানসারের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই HPV-জনিত।
HPV ভাইরাসের ২০০-রও বেশি ধরন রয়েছে। এর মধ্যে অনেক ধরনের সংক্রমণ যৌন সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়াতে পারে এবং তা যৌনাঙ্গের পাশাপাশি মুখ ও গলাতেও সংক্রমণ ঘটাতে পারে।
ওরাল সেক্স বা ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে ভাইরাসটি মুখে প্রবেশ করলে সেটিকে oral HPV infection বলা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শরীর নিজেই এই সংক্রমণ দূর করে দেয়। তবে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ভাইরাসটি দীর্ঘদিন শরীরে থেকে যেতে পারে এবং পরে ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গবেষণা বলছে, এই সংক্রমণ পুরুষদের মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ এবং মহিলাদের মধ্যে প্রায় ৩.৬ শতাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়। বয়স্কদের মধ্যে এর প্রবণতা তুলনামূলক বেশি।
HPV-জনিত গলা ক্যানসারের কিছু সাধারণ লক্ষণ হল—
কানে ব্যথা
দীর্ঘদিন গলা ব্যথা
ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া
গিলতে সমস্যা বা ব্যথা
কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়া
দীর্ঘদিন কাশি
অকারণে ওজন কমে যাওয়া
চিকিৎসকদের মতে, রোগটি যদি প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়ে, তবে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই।
আমেরিকার University of Texas MD Anderson Cancer Center-এর তথ্য অনুযায়ী, HPV-জনিত গলা ক্যানসার দ্রুত ধরা পড়লে ৯০ শতাংশেরও বেশি রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।
HPV সংক্রমণ নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগের প্রেক্ষিতে চিকিৎসকেরা HPV টিকাকরণের ওপরও জোর দিচ্ছেন। এই টিকা মূলত জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য পরিচিত, তবে এটি প্রজনন অঙ্গের আরও কিছু ক্যানসার এবং HPV-জনিত অন্যান্য ক্যানসারের ঝুঁকিও কমাতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ৯ থেকে ২৬ বছর বয়সিদের টিকা নেওয়া উচিত। ২৭ থেকে ৪৫ বছর বয়সিরাও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে টিকা নিতে পারেন।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—HPV টিকা নতুন সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে, কিন্তু ইতিমধ্যেই শরীরে থাকা সংক্রমণকে সারাতে পারে না। তাই চিকিৎসকেরা সাধারণত পরামর্শ দেন, ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার আগেই টিকা নেওয়া সবচেয়ে কার্যকর।
কলকাতার অ্যাপোলো হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট সার্জিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট ডক্টর শুভদীপ চক্রবর্তীর মতে, এইচপিভি সংক্রমণের ক্যানসারই একমাত্র ক্যানসার যেটা ভ্যাকসিন দিয়ে প্রতিরোধ সম্ভব। তার জন্য দরকার সময় থাকতে সঠিক সচেতনতা। এইচপিভি-ক্যানসার লজ্জার নয়, চিকিৎসায় দেরি এবং মৃত্যু -- এটা বরং বেশি লজ্জার।
এই ক্যানসার একজনের শরীর থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়েও পড়তে পারে। কারণ HPV ভাইরাস সার্ভিক্সে প্রভাব ফেলে। এমনকি মায়ের যদি এই ভাইরাসের সংক্রমণ থাকে, তাহলে নর্মাল ডেলিভারির সময়ে বাচ্চাও সংক্রমিত হতে পারে। সার্ভিক্যাল ক্যানসার যৌন সঙ্গমের মাধ্যমে সঙ্গীর শরীরে ছড়াতে পারে, 'স্কিন টু স্কিন কনট্যাক্ট' এই ক্যানসারের ক্ষেত্রে একটা বড় কারণ। ওরাল সেক্সও তেমনই একটা কারণ, যার ফলে নারীসঙ্গীর সার্ভিক্স থেকে পুরুষসঙ্গীর মুখে-গলায় এই ভাইরাস সংক্রমিত হতে পারে।
তাঁর কথায়, "অনেকেই ভাবেন, এইচপিভি সংক্রমণে কেবল মেয়েদের জরায়ুমুখে ক্যানসার হয়। কিন্তু সেটা সত্য নয়। এই সংক্রমণ পুরুষদেহেও ছড়াতে পারে। এই কারণেই ছেলে ও মেয়ে সকলেরই এই ভ্যাকসিন অবশ্যই নেওয়া উচিত। আমি আমার নিজের ছেলেকে ইতিমধ্যেই ভ্যাকসিন দিয়েছি, মেয়ের ৯ বছর হলে তাকেও দেব।"