এখন এমন একটা সময় হয়ে দাঁড়িয়েছে, খাওয়া, ঘুম, উৎসব— সব কিছুতেই যেন ‘প্রয়োজন’ হয়ে উঠছে নেশা। না হলেই শুরু হয়ে যাচ্ছে ‘উইথড্রয়াল’ বা প্রত্যাহারজনিত সমস্যাও।

শেষ আপডেট: 30 March 2026 19:10
দ্য ওয়াল ব্যুরো: সভ্যতা যত আধুনিক হচ্ছে, সময় যত এগোচ্ছে, ততই যেন আজকাল কম বয়সে নেশার প্রবণতা বাড়ছে। কাজের চাপ, নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই, আর্থসামাজিক টানাপড়েন— সব মিলিয়ে অনেকেই ডুবে যাচ্ছেন এই কু-অভ্যাসে। কেউ কেউ আবার না বুঝেই শুরু করেন অল্পস্বল্প, তারপর একসময় এমন জায়গায় পৌঁছন, যেখানে নেশা ছাড়া আর থাকা যায় না। অর্থাৎ, আসক্তি তৈরি হলে স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কঠিন হয়ে পড়ে।
এখন এমন একটা সময় হয়ে দাঁড়িয়েছে, খাওয়া, ঘুম, উৎসব— সব কিছুতেই যেন ‘প্রয়োজন’ হয়ে উঠছে নেশা। না হলেই শুরু হয়ে যাচ্ছে ‘উইথড্রয়াল’ বা প্রত্যাহারজনিত সমস্যাও।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেশা খারাপ— এ কথা সকলেই জানেন। কিন্তু জানলেই কি সবাই ছাড়তে পারেন? মাঝেমধ্যে পার্টি বা আড্ডায় সীমিত নেশা এক জিনিস, কিন্তু প্রতিদিন মদ্যপান বা গাঁজার নেশায় আসক্ত হওয়া সম্পূর্ণ আলাদা ও বিপজ্জনক। আসক্ত হয়ে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, বেরিয়ে আসার পথও কঠিন হয়ে যায়। তাই শুরুতেই সতর্ক হওয়া জরুরি।
এ শহরের জেনারেল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. শ্যামাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “নেশা করা খারাপ—এ কথা আমরা সবসময় বলি। কিন্তু আরও ভয়ঙ্কর হল প্রতিদিন নেশা করা। এতে ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মানুষ মারাত্মক বিপদের সম্মুখীন হতে পারে। আবার দীর্ঘদিন ধরে নেশার প্রভাব থাকলে, ব্যক্তি অনেক সময় অসংলগ্ন আচরণও করেন।”
তিনি আরও জানান, নেশাগ্রস্ত ব্যক্তির রিফ্লেক্স বা প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা কমে যায়। বিশেষ করে মদ্যপান বা গাঁজার নেশার পর, সেই সময় বা পরের দিন পর্যন্ত শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে না। ফলে হঠাৎ কোনও পরিস্থিতি সামলাতে সমস্যা হয়।
যাঁরা রোজ নেশা করেন, তাঁদের হার্ট ও ফুসফুসের প্রতিক্রিয়াশক্তি ধীরে ধীরে কমে যায়। হঠাৎ কোনও দুর্ঘটনা, আতঙ্ক, প্যানিক, মানসিক চাপ, সাঁতার কাটার সময় অস্বস্তি বা ট্র্যাভেলের সময় সমস্যা— এই সব পরিস্থিতিতে তাঁরা আর পাঁচজনের মতো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। সামান্য বিপদও বড় হয়ে ওঠে। ফলে জীবনহানির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ধরা যাক, যদি কখনও জলে ডুবে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে যিনি নেশা করেন না, তিনি যেভাবে যুঝতে পারবেন বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দম ধরে রাখতে পারবেন, নিয়মিত নেশা করা ব্যক্তি তা পারবেন না। অনেক আগেই স্নায়বিক ও শারীরিকভাবে শিথিল হয়ে যাবেন।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. অরিন্দম বিশ্বাস জানান, “যাঁরা নিয়মিত নেশা করেন, তাঁদের মধ্যে স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেক বেশি। ধমনিগুলো ধীরে ধীরে সরু হয়ে যায়, রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়, রক্তচাপ বাড়ে। দীর্ঘদিন নেশা করলে লিভারের ক্ষতি হয়, হেমারেজিক স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাড়ে, এমনকি হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, কী ধরনের নেশা করা হচ্ছে তার উপরেও নির্ভর করে শারীরিক পরিস্থিতি। মদ, গাঁজা বা ধূমপান— প্রতিটির প্রভাব আলাদা হলেও, দীর্ঘমেয়াদে সবই শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর।
আরও এক বড় বিপদ হল, যারা নিয়মিত নেশা করেন, হঠাৎ বন্ধ করে দিলে দেখা দেয় ‘উইথড্রয়াল সিম্পটমস’। যেমন—হাত-পা কাঁপা, খিঁচুনি, অস্থিরতা, মেজাজের পরিবর্তন। মদ্যপানের ক্ষেত্রে দেখা দিতে পারে ‘অ্যালকোহলিক সিজার’, যা মৃগীরোগের মতো লক্ষণ তৈরি করে। ধূমপান ছাড়লে অতিরিক্ত খিদে, রাগ, অস্থিরতা বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিষয়গুলি অনেকেই গুরুত্ব দেন না। বর্তমানে অনেকের কাছে সেলিব্রেশন মানেই নেশা—এই ধারণা থেকেই সমস্যা শুরু। তাই সামাজিক অনুষ্ঠানে গেলেও নেশা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করা উচিত।
নেশা করে গাড়ি চালানো, সাঁতার কাটা বা উত্তেজনাপূর্ণ কাজ করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। মানসিক চাপে একা বসে নেশা করাও বড় ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। তার বদলে মানসিক চাপ কমানোর জন্য ঘোরাঘুরি, প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকা, নিয়মিত ব্যায়াম—এসব অনেক বেশি কার্যকর। কারণ রোজ নেশা করার ফলে কখন, কীভাবে বিপদ ঘটে যাবে, তা আগে থেকে বোঝা যায় না। অনেক সময় দেখা যায়, সামান্য পরিস্থিতিতেও শরীর আর লড়াই করতে পারে না। হয়তো একটু সচেতন থাকলে বা শরীর সুস্থ থাকলে বিপদ এড়ানো যেত—কিন্তু তা আর সম্ভব হয় না।
প্রতিদিনই আমরা হঠাৎ মৃত্যুর খবর শুনি—যার অনেকটাই জড়িয়ে থাকে এই ধরনের জীবনযাপনের সঙ্গে। তবুও সচেতনতার অভাব থেকেই যায়।