ল্যানসেটের সমীক্ষা বলছে, গত তিন দশকে ভারতে স্তন ক্যানসারের প্রকোপ দ্বিগুণের বেশি। কেন বাড়ছে ঝুঁকি, কীভাবে করবেন প্রতিরোধ?

শেষ আপডেট: 5 March 2026 14:01
দ্য ওয়াল ব্যুরো: গত তিন দশকে ভারতে স্তন ক্যানসারের (Breast Cancer) প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। ল্যানসেট জার্নালের (Lancet) সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, ১৯৯০ সালের তুলনায় এখন দেশে এই রোগের সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। শুধু ভারত নয়, বিশ্বজুড়েই স্তন ক্যানসারের হার বাড়ছে, আর ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সমীক্ষার তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৩ লক্ষ নতুন স্তন ক্যানসারের রোগী ধরা পড়েছে। একই বছরে এই রোগে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৬.৭ লক্ষ মানুষের। গবেষকদের অনুমান, যদি এই প্রবণতা একইভাবে চলতে থাকে, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫ লক্ষে পৌঁছতে পারে, আর মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হতে পারে ১১ লক্ষের কাছাকাছি।
ভারতের ক্ষেত্রেও ছবিটা খুব আশাপ্রদ নয়। ১৯৯০ সালের তুলনায় এখন নতুন রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। উদ্বেগের বিষয় হল, আগের তুলনায় এখন কমবয়সি মহিলাদের মধ্যেও স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। গত কয়েক দশকে মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এসেছে। দেরিতে সন্তান নেওয়া, কম সন্তান জন্ম দেওয়া, স্তন্যদান কমে যাওয়া, স্থূলতা, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, তামাক ও অ্যালকোহল— এসবই ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি। ফলে আরও বেশি নারী সেই বয়সে পৌঁছচ্ছেন, যখন স্তন ক্যানসারের সম্ভাবনা বাড়ে।
তবে কিছু আশার কথাও রয়েছে। উন্নত দেশগুলিতে সচেতনতা, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং আধুনিক চিকিৎসার ফলে মৃত্যুহার তুলনামূলকভাবে কমেছে। কিন্তু উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলিতে এখনও অনেক ক্ষেত্রেই রোগ ধরা পড়ে দেরিতে। ফলে চিকিৎসা কঠিন হয়ে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, প্রাথমিক পর্যায়ে স্তন ক্যানসার ধরা পড়লে তা অনেক ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য। তাই সচেতনতা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৪০ বছর পার হলে মহিলাদের নিয়মিত ম্যামোগ্রাফি পরীক্ষা করা উচিত। পাশাপাশি মাসে একবার নিজে নিজে স্তন পরীক্ষা (Breast Self Examination) করা জরুরি। স্তনে কোনও অস্বাভাবিক পরিবর্তন বা উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
১) আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে স্তনের দিকে সোজা তাকিয়ে দেখুন, তার আকারে কোনওরকম অস্বাভাবিকতা চোখে পড়ছে কী?
২) দু’ হাত মাথার উপর তুলে দেখুন কোনও পরিবর্তন চোখে পড়ছে কিনা। তারপর হাত দুটো হিপের উপর রেখে কনুই সোজা করে আরও ভাল করে দেখুন কোনওরকম অস্বাভাবিকতা নজরে আসছে কিনা।
৩) স্তনের পাঁচটি ভাগ আছে, আপার ইনার, লোয়ার ইনার, আপার আউটার, লোয়ার আউটার আর সেন্ট্রাল। তিনটি আঙুল দিয়ে ভাল করে স্তন পরীক্ষা করে দেখুন কোনও অংশে ফোলা লাগছে কিনা।
৪) স্তনের চারপাশের অংশও ভাল করে পরীক্ষা করে দেখুন। কোনওরকম মাংসপিণ্ড তৈরি হলে সতর্ক হতে হবে। বগলের আশেপাশে পিণ্ড, ফোলা বা ব্যথা থাকলে সতর্ক হতে হবে।
৫) স্তনবৃন্ত থেকে কোনও ক্ষরণ হলেও সাবধান হতে হবে। স্তনের চামড়ায় কোনও ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে, যেমন কুঁচকে যাওয়া, গর্ত হয়ে যাওয়া, কালশিটে পড়া, ঘা হওয়া, তাহলেও সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে।
প্রতি মাসে একবার করে নিজেই পরীক্ষা করুন।
স্তনে বা বগলে গাঁট অনুভব হওয়া, স্তনের আকার বা আকৃতিতে হঠাৎ পরিবর্তন, নিপল থেকে রক্ত বা অস্বাভাবিক তরল বের হওয়া, অথবা স্তনের ত্বকে টান পড়া, গর্তের মতো ডিম্পলিং বা কমলালেবুর খোসার মতো চেহারা—এই ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অনেকটাই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত ব্যায়াম করা, সুষম ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং তামাক বা অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা—এই অভ্যাসগুলি স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
বিশিষ্ট সার্জিক্যাল অঙ্কোলজিস্ট ডাঃ শুভদীপ চক্রবর্তী বলেন, “বিশ্বজুড়ে স্তন ক্যানসারের বাড়তি প্রবণতা আমাদের জন্য স্পষ্ট সতর্কবার্তা। সচেতনতা বাড়ানো, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় এবং সহজলভ্য চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে জরুরি। এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।”