দশকের পর দশক ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের ধারাই বদলে দিয়েছেন এই কিংবদন্তি। তবে তাঁর এই দীর্ঘ সাফল্যের যাত্রাপথে এমন অনেক মোড় রয়েছে যা হয়তো সাধারণ শ্রোতাদের কাছে আজও অজানা।

আশা ভোঁসলে
শেষ আপডেট: 12 April 2026 16:04
দ্য ওয়াল ব্যুরো: ভারতীয় সঙ্গীত জগতের এক অত্যন্ত উজ্জ্বল নক্ষত্র তিনি। যাঁর কণ্ঠের জাদুতে বুঁদ হয়ে রয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কখনও ‘দম মারো দম’-এর সেই মাদকতা, কখনও ‘পিয়া তু আব তো আজা’-র চঞ্চলতা, আবার কখনও ‘ইন আঁখো কি মস্তি’-র সেই ধ্রুপদী আবেদন - বহুমুখী প্রতিভায় তিনি নিজেকে আসীন করেছেন অনন্য উচ্চতায়। তিনি আশা ভোঁসলে (Asha Bhosle)।
শনিবার বিকেলে মুম্বাইয়ের লোধা আবাসন সংলগ্ন তাঁর নিজস্ব বাসভবনে থাকাকালীনই শারীরিক অস্বস্তি বোধ করেন কিংবদন্তি গায়িকা। তাঁর বাড়ির পরিচারিকা লক্ষ্য করেন যে, আশা ভোঁসলে হঠাৎ সংজ্ঞা হারিয়েছেন। তড়িঘড়ি পরিবারের সদস্যরা তাঁকে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসক প্রতীত সামদানির তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। দিনভর লড়াই চলার পর, রবিবার এপ্রিল দুপুরের দিকে হাসপাতাল থেকে আসে সেই দুঃখের খবর। তিনি আর নেই (Asha Bhosle Death)।
দশকের পর দশক ধরে ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের ধারাই বদলে দিয়েছেন এই কিংবদন্তি। তবে তাঁর এই দীর্ঘ সাফল্যের যাত্রাপথে এমন অনেক মোড় রয়েছে যা হয়তো সাধারণ শ্রোতাদের কাছে আজও অজানা।
১০ বছর বয়সেই জীবনযুদ্ধ শুরু
আশা ভোঁসলের সঙ্গীত জীবনের শুরুটা হয়েছিল নেহাতই বাধ্যবাধকতায়। ১৯৪৩ সালে মাত্র ১০ বছর বয়সে মারাঠি ছবি ‘মাজহা বাল’-এর জন্য তিনি প্রথম গান রেকর্ড করেন। বাবার অকালপ্রয়াণের পর পরিবারের আর্থিক হাল ধরতে বড় দিদি লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খুব অল্প বয়সেই পেশাদার গায়িকা হিসেবে যাত্রা শুরু করতে হয়েছিল তাঁকে।
গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস
২০১১ সালে আশা ভোঁসলেকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা শিল্পী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস। ১৯৪৭ সাল থেকে হিসাব করলে ২০টিরও বেশি ভারতীয় ভাষায় প্রায় ১১ হাজারেরও বেশি একক, দ্বৈত এবং কোরাস গান গেয়েছেন তিনি। সঙ্গীত জগতের ইতিহাসে এই সংখ্যা কার্যত অতুলনীয়।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে গ্র্যামি মনোনয়ন
ভারতীয় গায়িকাদের মধ্যে আন্তর্জাতিক স্তরে সফল হওয়ার নজির আশার ঝুলিতেই প্রথম জমা হয়। ১৯৯৭ সালে আলি আকবর খানের সঙ্গে তাঁর ‘লিগ্যাসি’ অ্যালবামটি এবং ২০০৬ সালে ক্রোনোস কোয়ার্টেটের সঙ্গে ‘ইউ হ্যাভ স্টোলেন মাই হার্ট’ অ্যালবামটি বিশ্ববিখ্যাত গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডের জন্য মনোনীত হয়েছিল।
ক্রিকেট তারকার সঙ্গে গান
গানের জগতে সীমানা মানতে চাননি তিনি কোনওদিনই। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার প্রাক্তন ফাস্ট বোলার ব্রেট লি-র সঙ্গেও গলা মিলিয়েছেন আশা। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সময় ব্রেট লি-র লেখা ‘ইউ আর দ্য ওয়ান ফর মি’ গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। এই জুটি ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক মহলে সাড় ফেলে দেয়।
দাদাসাহেব ফালকে ও পদ্মবিভূষণ
দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি স্বরূপ অজস্র সম্মান পেয়েছেন তিনি। ২০০০ সালে ভারত সরকার তাঁকে চলচ্চিত্র জগতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে’ পুরস্কারে ভূষিত করে। এর ঠিক আট বছর পর ২০০৮ সালে তত্কালীন রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাটিলের হাত থেকে তিনি দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ‘পদ্মবিভূষণ’ গ্রহণ করেন।
বিদেশে নিজের রেস্তোরাঁ চেইন
সঙ্গীতের পাশাপাশি রান্নার প্রতিও অগাধ টান ছিল আশার। সেই ভালবাসাকেই পেশাদার রূপ দিয়েছেন তিনি। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত, বাহারিনের পাশাপাশি বিলেতের বার্মিংহাম বা ম্যাঞ্চেস্টারের মতো শহরেও রমরমিয়ে চলছে তাঁর রেস্তোরাঁ ‘আশা’স’। মূলত উত্তর ভারতীয় খাবারের সঙ্গে ঘরোয়া স্বাদ মিশিয়েই ভোজনরসিকদের মন জয় করছেন তিনি।
মাদাম তুসোর মিউজিয়ামে স্থান
দিল্লির মাদাম তুসো মিউজিয়ামে আশা ভোঁসলের একটি পূর্ণাবয়ব মোমের মূর্তি রয়েছে। মিউজিক জোনে মাইকেল জ্যাকসনের মতো বিশ্ববিখ্যাত তারকাদের মূর্তির পাশেই রাখা হয়েছে তাঁকে। ১৫০টিরও বেশি নিখুঁত পরিমাপ এবং কয়েক হাজার ছবির রেফারেন্স নিয়ে তৈরি করা হয়েছে এই প্রাণবন্ত মূর্তিটি।
নিজের কণ্ঠের বৈচিত্র্য এবং অদম্য প্রাণশক্তি দিয়ে আজও বিশ্ব সঙ্গীতের ইতিহাসে এক অপরিহার্য নাম আশা ভোঁসলে। কেবল ভারত নয়, আন্তর্জাতিক সংগীতের ইতিহাসেও তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।