একজন আশাকর্মীর স্বপ্ন, অজানা এক লোভের ফাঁদ, আর তার পরিণতি। এই ঘটনার মাধ্যমে আরও একবার সামনে এল সাইবার প্রতারণার ভয়াবহ রূপ।

পুষ্পলতা
শেষ আপডেট: 20 June 2025 18:52
দ্য ওয়াল ব্যুরো: লটারির লোভে প্রায় সর্বস্ব খুইয়ে ফেললেন মধ্যপ্রদেশের এক আশা কর্মী। অপহৃতও হলেন। লটারির টাকা পেতে এতোটা মরিয়া হয়ে উঠলেন যে শেষ পর্যন্তও প্রতারকদের ভাল মানুষই মনে করলেন। পরিবার-পরিজন কারও কথা মানতে নারাজ তিনি। শুধু একটাই কথা, লটারির টাকা নিয়েই ছাড়বেন। গোটা ঘটনা আস্ত সিনেমার চেয়েও কম।
ঘটনার সূত্রপাত একটা ফোন দিয়ে। মধ্যপ্রদেশের জবলপুর জেলার একটি গ্রামের স্বাস্থ্য পরিষেবার কাজে যুক্ত পুষ্পলতার কাছে একটা ফোন আসে মার্চে। এক অজানা বিদেশি নম্বর। উল্টোদিক থেকে জানানো হল তিনি লটারি জিতেছেন। পুরস্কারে মিলবে হীরের গয়না, সোনার বিস্কুট আর ১০ লক্ষ টাকা। তবে এই এত কিছু পেতে গেলে আগে লাগবে ‘প্রসেসিং ফি।’
এমন ফোন আমাদের কাছেও অনেক আসে। আমি আপনি হয় ফোন ধরি না, না হয় ধরি না। কিন্তু এক্ষেত্রে ফোনটা ধরেছিলেন প্রৌঢ়া। সেখানেই পাল্টে যায় তাঁর জীবন। প্রথমে সামান্য টাকা দিয়ে শুরু, তারপর একটার পর একটা গল্প। কখনও কুরিয়ার আটকে যাওয়া, কখনও আধার কার্ড ধরা পড়া, কখনও পুলিশি ঝামেলার ভয়। ভয় আর আশার টানাপোড়েনে পুষ্পলতা দিয়ে ফেললেন মোট ৪ লক্ষ টাকা।
যার দিন আনতে পান্তা ফুরোয়, তিনি নিজে তো দিতে পারলেন না। দিলেন ধার দেনা করে। কাউকে কিছু জানাতে পর্যন্ত নিষেধ করেছিল প্রতারকরা, না হলে নাকি লটারি বাতিল হয়ে যাবে। টাকা দেন কিন্তু মেলে না লটারির পুরস্কার। আশায় আশায় বসেছিলেন তিনি।
২৩ এপ্রিল মায়ের বাড়িতে যান। ২৬ এপ্রিল বলেন বারগি যাচ্ছেন। তারপর থেকেই নিখোঁজ। ৪মে থানায় নিখোঁজ ডায়েরি হয়। কিন্তু তখনও কেউ ভাবতে পারেননি, তিনি স্বেচ্ছায় প্রতারকদের খপ্পরে পড়ে শহর থেকে শহরে ঘুরছেন।
জবলপুর থেকে মুম্বই, সেখান থেকে সুরাত, তারপর দিল্লি, একটার পর একটা স্টেশনে কাটিয়েছেন রাত, খাবার জুটেছে লঙ্গর থেকে, ফোন করেছেন অন্যের মোবাইল চেয়ে। মাঝেমাঝে খুঁজে পেয়েছেন অল্প কাজ, সেখান থেকে রোজগার করা টাকাও পাঠিয়েছেন প্রতারকদেরই।
পরে শুরু হয় নাটকীয় নতুন অধ্যায়। পুষ্পলতাকে দিয়ে ভিডিও করানো হয়। চোখে জল, গলায় ভয়ের সুর, বলা হয় তাঁকে অপহরণ করা হয়েছে। ভিডিও পাঠানো হয় তাঁর স্বামীকে। দাবি করা হয় আরও ২ লক্ষ টাকা না দিলে দেহ কেটে জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হবে।
এই ভিডিও দেখেই আতঙ্কিত হয়ে পরিবারের সদস্যরা পৌঁছন হাইকোর্টে। দায়ের হয় হেবিয়াস করপাস মামলা। আদালতের নির্দেশে তৈরি হয় চারটি পুলিশ টিম। অবশেষে একটি ফোন কলের সূত্র ধরে গ্রেটার নয়ডা থেকে উদ্ধার করা হয় পুষ্পলতাকে।
উদ্ধারের পর দেখা যায়, মানসিকভাবে ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছেন তিনি। কাঁপছেন, ঘোরের মধ্যে আছেন এবং তখনও বিশ্বাস করেন কোনও একদিন পুরস্কার তিনি পাবেনই। তদন্তকারী আধিকারিক সিএসপি অঞ্জুল মিশ্র জানান, ওঁকে কাউন্সেলিং করানো হচ্ছে। এখনও বিশ্বাস করেন প্রতারকরা খারাপ নয়, কোনও বড় পরিকল্পনার অংশ ছিলেন উনি।
পুষ্পলতার পরিবারের এক সদস্য বলেন, 'আমরা বারবার ওঁকে বুঝিয়েছি, কিন্তু বিশ্বাস করাতে পারিনি। নিজের ফোন ছেড়ে মেয়ের ফোন দিয়ে টাকা পাঠিয়েছেন। আমাদের সংসারেই খাবার জোটে না, সেখান থেকেও পাঠিয়েছে টাকা।'
সাইবার তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতারণার এই চক্র বিদেশি আইপি থেকে চলেছে। দেশের বাইরে অবস্থিত সার্ভার থেকে এসেছে অপহরণের ভয় দেখানো ভয়াল অডিও মেসেজ। তবে সংশ্লিষ্ট দেশ সহযোগিতা করছে না, ফলে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করাও কঠিন হচ্ছে।
একজন আশাকর্মীর স্বপ্ন, অজানা এক লোভের ফাঁদ, আর তার পরিণতি। এই ঘটনার মাধ্যমে আরও একবার সামনে এল সাইবার প্রতারণার ভয়াবহ রূপ। পুলিশের অনুরোধ, অজানা নম্বর থেকে আসা পুরস্কারের প্রতিশ্রুতিতে ভুলেও যেন কেউ পা না দেন। যে স্বপ্ন কখনও বাস্তব হয় না, তা যে খুব সহজেই দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠতে পারে, তা পুষ্পলতার জীবনই আজ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।